রাজবাড়ীতে মধু সংগ্রহ করে মাসে আয় ৩ লাখ টাকা
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে বাক্সে মৌমাছি চাষ করে মাসে প্রায় ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকা আয় করছেন নারায়ণগঞ্জের বারদী এলাকা থেকে আসা মৌচাষি পল্লব রায়সহ কয়েকজন তরুণ। বছরের প্রায় ৬ থেকে ৮ মাস তারা ভ্রাম্যমাণ অবস্থায় দেশের বিভিন্ন স্থানে মৌচাষের বাক্স বসিয়ে বিভিন্ন ফুলের মধু আহরণ করেন। এতে একদিকে যেমন মধু আহরণ করে লাভবান হচ্ছেন; তেমনই মৌমাছির মাধ্যমে ফসলের পরাগায়ন ঘটায় উৎপাদন বেড়ে লাভবান হচ্ছেন চাষিরা। মৌচাষে নিজেদের থাকা-খাওয়ার খরচ ও মৌমাছির পরিচর্যা ছাড়া তেমন বাড়তি খরচ নেই। ফলে বাক্সে মৌচাষ একটি লাভজনক পেশা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।
জানা যায়, গোয়ালন্দ পৌরসভার নগর রায়ের পাড়ার সরিষা মাঠের পাশে ১১০টি বাক্স বসিয়ে মৌচাষ করছেন পল্লব রায়সহ তার সহযোগিরা। মৌবাক্স স্থাপনের ১২ থেকে ১৫ দিনের মধ্যেই নিজস্ব উপায়ে হারভেস্ট (মধু সংগ্রহ) করেন চাষিরা। রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়া থাকলে মাসে ৪ থেকে ৫ বারে ২০ থেকে ২৫ মণ মধু সংগ্রহ করেন তারা। পরে প্রতি মণ মধু ১৪ হাজার টাকায় পাইকারি বিক্রি করেন। প্রায় দুই মাস ধরে চলে সরিষা ফুলের মধু সংগ্রহ। এরপর ধনিয়া, কালোজিরাসহ বিভিন্ন ফুলের মধু আহরণ করে বছরের প্রায় ৬ থেকে ৮ মাস অতিবাহিত করেন।
গোয়ালন্দসহ জেলার বিভিন্ন এলাকাজুড়ে চাষ হয়েছে সরিষা। মাঠে মাঠে হলুদ ফুলের সমারোহে প্রকৃতি সেজেছে অপরূপ সাজে। অল্প খরচে সরিষা একটি লাভজনক চাষ। ফলে পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়াতে মাঠের পাশেই বসানো হয়েছে বাক্সে মৌমাছি। সরিষার মাঠে উড়ছে মৌমাছি এবং সরিষা ফুলে বসে করছে মধু আহরণ। খরচের তুলনায় কয়েকগুণ লাভজনক এ ভোজ্যতেল চাষ। ফলে দিন দিন বাড়ছে সরিষার আবাদ। তবে এবার কুয়াশার কারণে কিছুদিন মধু সংগ্রহ করতে পারেননি চাষিরা।

আরও পড়ুন
করোনাকালে চাকরি হারিয়ে মৌচাষে সফল শাহ আলম
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় ৫ হাজার ৮৩২ হেক্টর জমিতে সরিষা আবাদ হয়েছে। এরমধ্যে গোয়ালন্দে ২ হাজার ১৬৫, রাজবাড়ী সদরে ১ হাজার ৮৩৫, বালিয়াকান্দিতে ৯৫৭, কালুখালী ৪৭৫ ও পাংশায় ৪০০ হেক্টর জমিতে সরিষা চাষ হয়েছে। এবার ৭ হাজার ৮৭৩ মেট্রিক টন ফলন উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে। জেলায় টরি-৭, বারি ১৪, ১৫, ১৭ ও ১৮ এবং বিনা ৪, ৯ ও ১১ জাতের সরিষা চাষ হয়েছে।
স্থানীয় মো. মানিক জাগো নিউজকে বলেন, ‘এই সরিষা ফুলের মধু খুব ভালো। আমরা খেয়েছি। রোদ উঠলে মৌমাছিগুলো বাক্স থেকে বেড়িয়ে গুনগুন শব্দে মাঠে ছড়িয়ে পড়ে। দেখতে ভালো লাগে, দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই দেখতে আসেন।’
আব্দুল হালিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘গোয়ালন্দে অন্য জেলা থেকে মৌচাষিরা এসে মৌবাক্স বসিয়ে মধু সংগ্রহ করেন। এ মধু অরজিনাল হলেও কৃষকেরা ক্ষেতে অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার করায় কতটুকু নিরাপদ তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাই এ বিষয়ে কৃষি অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে কৃষকদের সচেতন করার উচিত।’

আরও পড়ুন
মাগুরায় মধু চাষে বাবা-ছেলের বাজিমাত
মৌমাছির পরিচর্যাকারী আবু হাসনাত জাগো নিউজকে বলেন, ‘আবহাওয়া ভালো থাকলে এক মাসে ৪ বার মধু সংগ্রহ করতে পারি। ৪ বারে প্রায় ২০ মণের বেশি মধু পাই। এই মধু ঢাকায় পাঠাই। ১৩-১৪ হাজার টাকা মণ বিক্রি করি। প্রায় দুই মাস সরিষা ফুলের মাঠে থাকি। এরপর কালোজিরা ও ধনিয়ার মাঠে যাবো। সেখানে প্রায় দুই মাস থাকার পর যাবো লিচুর মাঠে। তারপর আর কোনো মাঠ না থাকায় একস্থানে বসে প্রায় ৬-৭ মাস নিজস্ব উপায়ে মৌমাছিগুলো দেখাশোনা করি।’
পল্লব রায় জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের এখানে প্রায় ১১০টি মৌবাক্স আছে। ৭-৮ দিন পর পর মধু সংগ্রহ করি। এতে প্রায় ৬-৮ মণ মধু হয়। আমাদের সব মধু ঢাকায় পাঠাই। খুচরা পর্যায়ে ৬০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করি।’
রাজবাড়ী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ অফিসার গোলাম রাসূল জাগো নিউজকে বলেন, ‘জেলায় ৭ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন সরিষা উৎপাদন হবে। ৫ উপজেলায় কমবেশি চাষ হলেও গোয়ালন্দে চাষ বেশি হয়। অনেক স্থানে সরিষা ক্ষেতের পাশে মৌমাছি চাষ করা হচ্ছে। মৌমাছির কারণে সরিষা ফুলে পরাগায়নের মাধ্যমে ফসলের উৎপাদন বাড়ে। মৌচাষিরা মধু সংগ্রহ করে লাভবান হচ্ছেন। চলতি মাসের শুরুর দিকে কুয়াশার কারণে মধু সংগ্রহ কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।’
আরইউআর/এসইউ/জেআইএম