চুয়াডাঙ্গায় তুলা চাষে নীরব বিপ্লব

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি চুয়াডাঙ্গা
প্রকাশিত: ০৩:৫৭ পিএম, ১৩ এপ্রিল ২০২৬
লাভজনক বাজারদরের কারণে চুয়াডাঙ্গায় তুলা চাষে নীরব বিপ্লব ঘটছে

দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দিগন্ত উন্মোচন করছে ‘সাদা সোনা’ খ্যাত তুলা। ক্রমবর্ধমান চাহিদা, অনুকূল আবহাওয়া এবং লাভজনক বাজারদরের কারণে চুয়াডাঙ্গায় তুলা চাষে নীরব বিপ্লব ঘটছে।

চলতি মৌসুমে জেলার দামুড়হুদা, জীবননগর, চুয়াডাঙ্গা সদর ও আলমডাঙ্গা উপজেলায় প্রায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে তুলা আবাদ হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, এটি গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, তুলা চাষে উৎপাদন খরচ তুলনামূলক কম হলেও বাজারমূল্য ভালো থাকায় কৃষকের আগ্রহ বাড়ছে। পাশাপাশি চুয়াডাঙ্গার মাটি ও আবহাওয়া তুলা চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় ফলনও সন্তোষজনক হচ্ছে।

jagonewsচুয়াডাঙ্গার মাঠ জুড়ে এখন গাছে গাছে ফুল, ফল আর সাদা তুলা ফুটে রয়েছে। দুর থেকে তুলা গাছ গুলো দৃষ্টি কাড়ছে সবার। অর্থকারী ফসল হিসাবে প্রতি বছর বিস্তৃত লাভ করছে তুলা চাষ। কৃষকদের প্রণোদনা দেওয়ায় তুলা চাষ বৃদ্ধি পেয়েছে। তুলা চাষে আধুনিকতার ছোয়া লাগলে বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে। তুলা চাষিরা মাঠ থেকে তুলা তুলতে ব্যস্ত সময় পার করছেন। এ মৌসুমে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন তুলা বিক্রি হবে ১০৫ কোটি টাকার।

এ বছর ৯৬ টাকা কেজি দরে তুলা বিক্রি হচ্ছে। তুলার বীজ প্রক্রিয়াজাত করণ করে তেল উৎপাদন সম্ভব। তুলার বাম্পার পলন হওয়ায় কৃষকদের চোখে-মুখে উচ্ছাস। তুলা উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে চাষীদের সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করছে।

তুলা অসময়ে উঠায় কৃষকরা টাকা পাচ্ছেন। পরিবারের কাজে ব্যায় ও অন্য ফসল চাষে লাগাচ্ছেন। তুলা চাষ ব্যাপক পরিসরে ছড়িয়ে দিতে পারলে আমদানি কমবে একদিক অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হবে। চুয়াডাঙ্গা জোনে তুলা ছড়িয়ে পড়ছে। অল্প খরচে লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা বেশি আগ্রহী হচ্ছেন।

চুয়াডাঙ্গায় অল্প পরিসরে ১৯৯৪ সালে তুলা চাষ শুরু হয়। এরপর থেকেই প্রতি বছর বাড়তে শুরু করে তুলা চাষ। দীর্ঘমেয়াদি ফসল হওয়ায় প্রথম দিকে কৃষকদের চাষে আগ্রহী করে তোলা সম্ভব ছিল না। নানাভাবে বুঝিয়ে এ চাষে নিয়ে আসা তুলা উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ।

jagonewsবর্তমানে বাণিজ্যিকভাবে চুয়াডাঙ্গা জোনে তুলা চাষ করছেন কৃষকরা। লাভজনক চাষ হওয়ায় কৃষকরা এ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। প্রতি মৌসুমে বৃদ্ধি পাচ্ছে তুলা চাষ। প্রতি বিঘায় তুলা চাষে ২২ হাজার টাকা খরচ হলেও লাভ হয় ৩৫ হাজার টাকা।

দুই অর্থ বছর থেকে চুয়াডাঙ্গা জোনে তুলা চাষে কৃষকদের মাঝে প্রণোদনা দেওয়া হচ্ছে সরকারীভাবে। প্রণোদনা পেয়ে তুলা চাষে কিছুটা কম খরচ হচ্ছে কৃষকদের। যার ফলে তুলা চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

১১৫০০ জন কৃষকের মাঝে সার, বীজ, কীটনাশক, ছত্রাকনাশকসহ প্রয়োজনীয় উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। যার বাজার মূল্য প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা। হাইব্রিড জাতের হোয়াইট গোল্ড-২ ও ডিএম-৪ তুলা চাষ করায় আগের তুলনায় ফলন বৃদ্ধি, খরচ কম, রোগবালাই না হওয়ায় লাভজনক হয়েছে।

শ্রাবণ-ভাদ্র মাসের যে সময় বীজ বপনের ৫ দিনের মাথায় চারা বের হয়। তুলা ক্ষেত নিয়মিত পরিচর্যা করতে হয়। ২ মাস পর গাছে ফুল ও গুটি আসে। গুটি গুলো ৪ মাসে পুর্ণতা পেয়ে তুলা উত্তোলনের পর বিক্রি শুরু করে কৃষকরা। এরপরেও গাছ থেকে আরও ২-৩ মাস তুলা পাওয়া যায়। চুয়াডাঙ্গা জোনে এ মৌসুমে ৪১০০ হেক্টর জমিতে তুলা চাষ হচ্ছে। প্রতি মণ তুলা বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার ৮৪০ টাকায়।

আধুনিকতার ছোঁয়া লাগলে তুলা চাষে আরও বেশি আগ্রহী হবেন কৃষকরা। এ মৌসুমে প্রায় ১২ হাজার মেট্রিক টন তুলা বিক্রি হবে ১০৫ কোটি টাকার। চুয়াডাঙ্গার তুলা চাষি হারুনুর রশিদ বলেন, তুলা চাষ যদি ৪-৫ মাসে শেষ করা যেত তা হলে কৃষকরা বেশি আগ্রহী হয়ে উঠতেন। উচ্চ ফলনশীল জাতের বীজ দিয়ে তুলা চাষ সম্ভব হলে উৎপাদন বাড়তো, খরচ কম হলে লাভ আরও বেশি হত।

jagonewsআরেক তুলা চাষি হাসমত আলি জানান, মাঠ থেকে প্রতি কেজি তুলা উত্তোলন করতে খরচ হয় ১৩-১৫ টাকা। উন্নত দেশের মত মেশিন দিয়ে তুলা উত্তোলন সম্ভব হত তাহলে খরচ অনেক কম হত।

নুর হাকিম নামের চুয়াডাঙ্গার আরেকজন তুলা চাষি বলেন, ‘সরকারী প্রণোদনা বাড়ানো গেলে আরও অন্য কৃষকরা সুবিধা পেত। তারাও চাষে আগ্রাহ দেখাতেন। প্রতি বিঘায় খরচ বাদে ৩৫-৪০ হাজার টাকা লাভ হয়। এ ফসল অসময়ে উঠায় আমরা টাকা কাজে লাগাতে পারি।’

চুয়াডাঙ্গা জোনাল অফিসের প্রধান তুলা উন্নয়ন কর্মকর্তা সেন দেবাশীষ জানান, শুরুর পর থেকে এখন ভালো অবস্থায় রয়েছি। কৃষকরা নিজে থেকেই তুলা চাষে আগ্রাহ দেখান। আমরা কৃষকদের প্রণোদনাসহ সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করছি। কৃষকদের নিয়ে নিয়মিত তুলা চাষের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি। এ বছর তুলার দাম কিছুটা কম পাচ্ছে কৃষকরা গত বছরের তুলনায়। তুলা চাষ আরও বৃদ্ধি করতে পারলে আমদানি নির্ভরতা হ্রাস পাবে।

হুসাইন মালিক/কেএসকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।