দেশ-বিদেশে ২০টি পুরস্কার পেয়েছেন ড. সাইফুল

রাকিব খান রাকিব খান , শেকৃবি প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০২:৩১ পিএম, ১৮ জুলাই ২০১৯

বাংলাদেশের প্রাণিচিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় পরিচিত মুখ ড. কে বি এম সাইফুল ইসলাম মিরাজ। তিনি একাধারে শিক্ষক, গবেষক এবং চিকিৎসক। বর্তমানে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) মেডিসিন অ্যান্ড পাবলিক হেলথ বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। শেকৃবিতে যোগদানের আগে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএলআরআই) ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ছিলেন।

প্রাণিচিকিৎসার সব শাখায় তার পদচারণা থাকলেও বিশেষ আগ্রহ পোষাপ্রাণির প্রতি। তাই নিজ উদ্যোগেও পোষাপ্রাণির মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে অনবরত সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। প্রতিষ্ঠা করেছেন দেশের সবচেয়ে বড় পোষাপ্রাণির ক্লিনিক। যাবতীয় কর্মকাণ্ড নিয়ে সম্প্রতি জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাকিব খান-

বর্তমান প্রেক্ষাপটে পোষাপ্রাণির চাহিদা ও সম্ভাবনা কেমন দেখছেন?
ড. সাইফুল: পোষাপ্রাণির চাহিদা ও সম্ভাবনার কথা বলতে গেলে এককথায় বলতে হয় চমৎকার। দিনের পর দিন এর চাহিদা বাড়ছে। পোষাপ্রাণির সংজ্ঞা এখন অনেকটা পরিবর্তিত হয়েছে। আজকাল পোষাপ্রাণিকে কেউ আর পশু কিংবা প্রাণি হিসেবে দেখে না বরং তাকে পরিবারের সদস্য হিসেবেই মূল্যায়ন করে। পোষাপ্রাণি এখন সঙ্গী হিসেবে বিবেচিত হয়। তার সাথে ভাবের আদান-প্রদান হয়। ফলশ্রুতিতে এদের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে এবং বাড়বে।

saiful

পোষাপ্রাণির চাহিদা বাড়ার কারণ কী বলে মনে করেন?
ড. সাইফুল: বাংলাদেশে পোষাপ্রাণির চাহিদা আবহমান কাল থেকেই আছে। আমাদের দেশে আগে রাজপরিবার, জমিদার কিংবা বনেদি পরিবারে হাতি-ঘোড়া পালনের চল ছিল। সেগুলোও কিন্তু পোষাপ্রাণি হিসেবেই ছিল। তবে বর্তমানে ছোট ছোট প্রাণি যেগুলো ঘরে লালন-পালন করা যায়, সেগুলো পালনের দিকে মানুষের ঝোঁক বেশি। আগে মানুষ শখের বশে প্রাণি পুষলেও এখন মানুষ সঙ্গী হিসেবেই পুষতে পছন্দ করে। কারণ হিসেবে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন অন্যতম। আগে একান্নবর্তী পরিবারে মানুষের সঙ্গীর অভাব হতো না। সেই একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে ছোট ছোট পরিবার সৃষ্টি হওয়ায় মানুষ এখন সঙ্গী চায়। ফলে নিঃসঙ্গতা ঘোচাতে, প্রফুল্ল থাকতে পোষাপ্রাণি অন্যতম সঙ্গী।

দেশে কোন কোন পোষাপ্রাণির চাহিদা বেশি?
ড. সাইফুল: দেশে বর্তমানে কুকুর ও বিড়ালের চাহিদা বেশি। তবে এরমধ্যে বিড়ালের চাহিদা বেশি। বিড়াল আকারে তুলনামূলক ছোট, তাই সুবিধাও বেশি। এছাড়া খরগোশ, ইঁদুর, গিনিপিগ, কচ্ছপ, অ্যাকুরিয়াম ফিশ ও সাপ, সালামান্দারসহ বেশকিছু প্রজাতির পাখিও চোখে পড়ার মতো। এরা ঘরের শোভা বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে।

বাংলাদেশে অঞ্চলভেদে পোষাপ্রাণির চাহিদা কেমন?
ড. সাইফুল: শহরাঞ্চল বিশেষ করে মেগাসিটিগুলোতে পোষাপ্রাণির চাহিদা ব্যাপক। শহরাঞ্চলে ক্ষুদ্র পরিবারের সংখ্যা বেশি এবং কমবেশি সবাই ব্যস্ত থাকে। অফিস থেকে বাসায় ফিরে যখন নিঃসঙ্গ মনে হয়, তখন বাসার পোষাপ্রাণিই হতে পারে ভাব বিনিময়ের একান্ত সঙ্গী। বাচ্চা থেকে বৃদ্ধ সবাই স্বাচ্ছন্দে শখের পোষাপ্রাণি নিয়েই অবসর সময় পার করতে পারেন।

saiful

সমাজের কোন শ্রেণির মানুষ আজকাল বেশি প্রাণি পুষছে?
ড. সাইফুল: সমাজের সব শ্রেণিপেশার মানুষই প্রাণি পুষতে পছন্দ করে। তবে অভিজাত শ্রেণি বিশেষ করে উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবার সাধারণত বেশি প্রাণি পুষে থাকে। ইদানিং মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারও প্রাণি পোষার দিকে ঝুঁকে পড়ছে।

পোষাপ্রাণি চিকিৎসায় প্রতিযোগিতা কেমন দেখছেন? ভবিষ্যতে অবস্থান কেমন হতে পারে?
ড. সাইফুল: এখন পর্যন্ত দেশে পোষাপ্রাণির সংখ্যার তুলনায় প্রয়োজনীয় ভেটেরিনারিয়ান বা ডাক্তারের সংখ্যা খুবই কম। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ পেশায় প্রতিযোগিতা বেশ কম। দিনের পর দিন পোষাপ্রাণির সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে। মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় পোষাপ্রাণি সেবায় নিয়োজিত ডাক্তারের সংখ্যা অনেক কম। আমি ভবিষ্যতে এ পেশার উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখতে পাই। উন্নত বিশ্বের মতো দেশেও এ পেশার কদর বাড়ছে।

এ পেশার সঙ্গে জড়িত হতে পেরে আপনি কি সন্তুষ্ট?
ড. সাইফুল: অবশ্যই সন্তুষ্ট। একসময় ইচ্ছে ছিল মানুষের ডাক্তার হব। কিন্তু তা হয়ে ওঠেনি। পরে ভাবলাম নামের আগে অন্তত ডাক্তার শব্দটা থাকুক। সেই থেকে ভেটেরিনারি সায়েন্সে পড়াশোনা করি। তবে এখন এ পেশার সাথে জড়িত হতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করি। আমার জীবনে যা কিছু অর্জন, তা এ পেশার কারণেই। এ পেশার সুবাদে বিশ্বের ১৮টি দেশ ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে। এ পেশার কারণেই দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গের সংস্পর্শ লাভের সৌভাগ্য হয়েছে। এ পেশার কারণেই সমাজের সর্বোচ্চ শ্রেণি থেকে শুরু করে নিম্নশ্রেণির সাথে কাজ করার সুযোগ ঘটেছে। আমি মনে করি, এটা এমন একধরনের পেশা যেখান থেকে সমাজের সব শ্রেণির মানুষকে সেবা দেওয়া সম্ভব। প্রাণিসেবার মাধ্যমে ভেটেরিনারিয়ানগণ মূলত মানুষেরই সেবা দিয়ে থাকেন। ভেটেরিনারিয়ানদের কাজ করতে হয় বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণি নিয়ে। তাদের রোগীরা সমস্যার কথা মুখে বলতে পারে না। ডাক্তারকে তা বুঝে নিতে হয়। তাই প্রাণিচিকিৎসকদের বলা হয় বিশ্বের শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক। তাদের অবমূল্যায়ন করার কোনো সুযোগ নেই। সারাবিশ্বে ভেটেরিনারি একটি মর্যাদাপূর্ণ পেশা।

saiful

আপনি তিনবার ‘কি অপিনিয়ন লিডার’র আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেয়েছেন। তাই পোষাপ্রাণির স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আপনার পরিকল্পনা কী?
ড. সাইফুল: পোষাপ্রাণি চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণায় আমার সংশ্লিষ্টতা বিবেচনায় পরপর তিনবার এ স্বীকৃতি পেয়েছি। পোষাপ্রাণি চিকিৎসকদের আর্ন্তজাতিক সম্মেলনে বাংলাদেশের পোষাপ্রাণি চিকিৎসা, শিক্ষা ও গবেষণার বিষয়ে মতামতের জন্য আমি নির্বাচিত হয়েছি। প্রথমবার ২০১৫ সালে ভিয়েতনামে, দ্বিতীয়বার ২০১৫ সালে ফিলিপিন্সে এবং তৃতীয়বার ২০১৬ সালে মালয়েশিয়ায় এ স্বীকৃতি পেয়েছি।

সেসব সম্মেলনে ওয়ার্ল্ড স্মল অ্যানিমেল ভেটেরিনারি অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস প্রেসিডেন্টসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আগত বিশ্বের প্রসিদ্ধ পোষাপ্রাণি চিকিৎসকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের দুর্লভ সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আসলে পোষাপ্রাণি চিকিৎসায় আমরা বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে অনেক পিছিয়ে আছি। এমনকী আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত কিংবা শ্রীলংকা থেকেও আমরা পিছিয়ে। আমি স্বপ্ন দেখি, বাংলাদেশেও পোষাপ্রাণির আন্তর্জাতিক মানের চিকিৎসাসেবা প্রদানের। এজন্য বিশেষায়িত ভেটেরিনারি ক্লিনিক নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আমার দীর্ঘদিনের। যেখানে পোষাপ্রাণির এ টু জেড সেবা পাওয়া যাবে।

আপনার অন্যান্য অর্জন সম্পর্কে যদি একটু বলতেন-
ড. সাইফুল: পরিশ্রমের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পর্যন্ত ১২ বার বিভিন্ন আর্ন্তজাতিক পুরস্কার, বৃত্তি, স্বীকৃতি ও সম্মান অর্জন করেছি। পাশাপাশি নিজ দেশের সরকারসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংস্থা থেকে বৃত্তি ও সম্মাননা পেয়েছি ৮ বার। প্রথম বাংলাদেশি তরুণ বিজ্ঞানী হিসেবে ২০১১ সালে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মাইক্রোবায়োলজিক্যাল সোসাইটির জাপান সম্মেলনে অর্জন করেছি ‘এশিয়ান ইয়াং ল্যাব সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড-২০১১’। চীনের বেইজিংয়ে ২০১৪ সালে আমেরিকান সায়েন্টিফিক রিসার্চ, ওপেন এক্সেস লাইব্রেরি ও চীনের ইঞ্জিনিয়ারিং ইনফরমেশন ইনস্টিটিউট থেকে যৌথভাবে আয়োজিত বৈজ্ঞানিক সম্মেলনে পেয়েছি ‘ইয়াং রিসার্চার অ্যাওয়ার্ড-২০১৪’। পরবর্তীতে থাইল্যান্ডের পাতায়ায় ২০১৫ সালে ইন্টারন্যশনাল কনফারেন্স অন সাস্টেইনেবল অ্যানিমেল এগ্রিকালচার ফর ডেভেলপিং কান্ট্রিজ (এসএএডিসি) শীর্ষক আর্ন্তজাতিক সম্মেলনে অর্জন করেছি ‘এসএএডিসি ইয়াং সায়েন্টিস্ট অ্যাওয়ার্ড-২০১৫’।

আপনার প্রতিষ্ঠিত ‘ভেট অ্যান্ড পেট কেয়ার’ ক্লিনিকে পোষাপ্রাণির জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা আছে?
ড. সাইফুল: ঢাকার মোহাম্মদপুরের হুমায়ূন রোডে প্রায় ২৫০০ স্কয়ার ফুট জায়গাজুড়ে ‘ভেট অ্যান্ড পেট কেয়ার’র অবস্থান। বাংলাদেশের পোষাপ্রাণির অভিভাবকদের সব সুবিধা ও প্রয়োজনের কথা বিবেচনা করে ক্লিনিকটি সাজানো হয়েছে। দীর্ঘ ১৮-১৯ বছর ধরে পোষাপ্রাণির চিকিৎসাসেবার সাথে জড়িত থাকার সুবাদে ওদের নিত্যপ্রয়োজন থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদী সব প্রয়োজনের সাথে পরিচিত হওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। সে অভিজ্ঞতা থেকেই ক্লিনিকটি সাজানো হয়েছে। যাতে পোষাপ্রাণির সব প্রয়োজন আমাদের এখান থেকেই মেটানো যায়। এখানে তাদের যথাযথ রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা, রোগ প্রতিরোধ, ভ্যাক্সিনেশন, নিউট্রিশন বা পুষ্টি সম্পর্কিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর সব সুব্যবস্থা আছে। একজন নারীসহ পোষাপ্রাণির স্বাস্থ্যসেবায় অভিজ্ঞ চারজন ভেটেরিনারিয়ান এখানে প্রতিদিন সেবা দিয়ে থাকেন। দেশ-বিদেশের স্বনামধন্য পোষাপ্রাণি চিকিৎসক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সাথে আমাদের যোগাযোগ আছে। যে কারণে প্রয়োজনে মানুষের চিকিৎসার মতো ভেটেরিনারি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে আমরা পোষাপ্রাণির চিকিৎসাসেবা দিতে সক্ষম। ক্ষুদ্র সামর্থের ভেতর থেকে ব্যক্তিপর্যায়ে পোষাপ্রাণির আন্তর্জাতিক মানের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার স্বপ্ন দেখি আমরা।

এসইউ/জেআইএম