সাতক্ষীরার উপকূলে লবণাক্ত জমিতে ভুট্টা চাষে সাফল্য
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার আটুলিয়া ইউনিয়নের হাওয়ালভাঙি গ্রামে দীর্ঘদিনের পতিত লবণাক্ত জমিতে পরীক্ষামূলক চাষে সফলতা পেয়েছেন স্থানীয় কৃষক শিলা রাণী ও রুহুল আমিন। ১০ মাত্রার লবণাক্ততা সম্পন্ন প্রায় ৩ একর জমিতে ভুট্টা, বিনাধান-১০ ও ব্রিধান-৯৯ চাষ করে এলাকায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছেন। এলাকায় প্রথমবারের মতো ডিবলিং পদ্ধতিতে (কৃষি জমিতে নির্দিষ্ট গভীরতায় ও দূরত্ব বজায় রেখে ছোট গর্ত করে বীজ বা চারা রোপণ করা) ভুট্টা চাষ করা হয়।
স্থানীয়ভাবে জানা গেছে, উপকূলীয় এ অঞ্চলের কয়েক হাজার বিঘা জমি আমন মৌসুমের পর মিঠাপানির অভাবে বছরের বড় একটি সময় পতিত থাকতো। লবণাক্ততার কারণে বোরো বা রবি মৌসুমে ফসল উৎপাদন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতো। তবে বিএআরসির অর্থায়নে এবং সাতক্ষীরার বিনা উপকেন্দ্রের বাস্তবায়নে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সহায়তায় লবণসহনশীল ফসলের পরীক্ষামূলক চাষ শুরু হওয়ায় সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে।
এ সাফল্যকে কেন্দ্র করে ২৫ এপ্রিল বিকেলে হাওয়ালভাঙি গ্রামে মাঠ দিবস অনুষ্ঠিত হয়। বিনার বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মিলন কবীরের সঞ্চালনায় এতে স্থানীয় কৃষক, কৃষি কর্মকর্তা, গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সিএসও ও পার্টনার প্রোগ্রামের ফোকাল পয়েন্ট ড. মো. হারুনুর রশীদ। তিনি বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ত জমিকে উৎপাদনের আওতায় আনতে পারলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। এ ধরনের উদ্যোগ কৃষিখাতে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।’

বিশেষ অতিথি সাতক্ষীরার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘কৃষকদের মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি পৌঁছে দিতে পারলেই এমন সাফল্য আসবে। আমরা চাই মডেলটি পুরো শ্যামনগরসহ উপকূলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ুক।’
পার্টনার প্রোগ্রামের পিএসও ও ওয়ার্কিং সায়েন্টিস্ট ড. মো. জামাল উদ্দীন বলেন, ‘লবণসহনশীল জাত ও সঠিক ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ব্যবহার করলে অনাবাদি জমিও উৎপাদনশীল করা সম্ভব। এটি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় একটি কার্যকর কৌশল।’
শ্যামনগর উপজেলা কৃষি অফিসার ওয়ালিউল ইসলাম বলেন, ‘স্থানীয় কৃষকদের আগ্রহ এখন অনেক বেড়েছে। আমরা নিয়মিত পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা দিয়ে এ উদ্যোগকে আরও সম্প্রসারণের চেষ্টা করছি।’
সভাপতির বক্তব্যে বিনা উপকেন্দ্র সাতক্ষীরার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘ধান কাটার পরের জমিতে কোনো চাষ না দিয়ে ডিবলিং পদ্ধতিতে চারা রোপণ করা যায়। ফলে কৃষকের অতিরিক্ত খরচ হয় না। ভুট্টা, বিনা সরিষা ও বিনাধান-১০-এর মতো লবণসহনশীল জাত উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এর মাধ্যমে পতিত জমিকে চাষের আওতায় আনা সম্ভব।’

কৃষক শিলা রাণী বলেন, ‘আগে এ জমিতে কিছুই হতো না। এখন ভুট্টা আর ধান ভালো ফলন দিচ্ছে। আমরা খুব আশাবাদী। তাছাড়া ভুট্টা চাষের জন্য ডিবলিং পদ্ধতি ব্যবহার করায় জমিতে অতিরিক্ত খরচ হয়নি।’
কৃষক রুহুল আমিন বলেন, ‘লবণাক্ততার কারণে জমি ফেলে রাখতে হতো। এখন বিজ্ঞানীদের সহায়তায় চাষ করে লাভবান হচ্ছি। যদি এভাবে সহায়তা পাই, তাহলে আরও বেশি জমিতে চাষ করবো।’
মাঠ দিবসে উপস্থিত অন্য কৃষকেরাও এ উদ্যোগের প্রশংসা করেন। ভবিষ্যতে লবণ সহনশীল ফসল চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেন। বক্তারা বলেন, ‘উপকূলীয় অঞ্চলের লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের চাষ সম্প্রসারণের মাধ্যমে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে কৃষকদের আয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
আহসানুর রহমান রাজীব/এসইউ