১০ হাজার অর্কিড সংগ্রহ করেছেন রানা

জাগো নিউজ ডেস্ক
জাগো নিউজ ডেস্ক জাগো নিউজ ডেস্ক
প্রকাশিত: ১২:২৬ পিএম, ০৩ জানুয়ারি ২০২৩

 মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

অর্কিডে তার সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান। ১০ কাঠা জায়গাজুড়ে প্রায় ৫৮৯ প্রজাতির ১০ হাজারেরও বেশি অর্কিড তার সংগ্রহে। মাসে অর্কিড বিক্রি করেই আয় ৩০ হাজার টাকা। দেশে বাণিজ্যিকভাবে অর্কিড বাগান করে হাতেগোনা যে কয়েকজন সফলতার মুখ দেখেছেন, তাদেরই একজন মোহাম্মদ নুরুল হক রানা।

ছোটবেলা থেকেই বাগান করেন রানা। শখেই কিছু অর্কিড বাগানে তুলেছিলেন। পরে এক রকম তার প্রেমেই পড়ে যান। রানার কাছে অর্কিডের যত্নআত্তি সহজ মনে হয়েছে। তাই বলে ৫৮৯ প্রজাতির অর্কিড কেন? এ ব্যাপারে রানা বলেন, ‘মূলত বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড সংগ্রহ করতে আমার ভালো লাগে। ফেসবুকে অন্যের কাছে আছে, কিন্তু আমার কাছে সে প্রজাতির অর্কিড নেই। এমনটা দেখলে জেদে চেপে যায়। সংগ্রহ করার জন্য চেষ্টা করি।’

নার্সারি, অনলাইন এমনকি প্রকৃতি থেকে তিনি অর্কিড সংগ্রহ করেছেন। ঠকেছেনও অনেক। তবু থেমে থাকেনি বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড সংগ্রহ। অবশ্য অর্কিড বিশ্বের গাছপালার মধ্যে অন্যতম বৃহত্তম পরিবার। অর্কিডের বিভিন্ন প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৩০ হাজারেরও মতো। অর্কিড প্রজাতিগুলো একে অপরের থেকে অনেক বেশি পৃথক।

jagonews24

দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রজাতির অর্কিড যাদের সংগ্রহে আছে, রানা তাদের মধ্যে একজন। দুজন কর্মচারী তার অর্কিডগুলো দেখভাল করেন। রাজধানীর কদমতলী থানার রায়েরবাগের খানকা শরীফ এলাকায় রানার বাগান। এখানে যেমন অর্কিডপ্রেমীরা কিনতে আসেন। দেখতেও আসেন অনেকে। অর্কিডের এমন বৃহত্তর আয়োজন নজর কেড়েছে সবার।

ভালো লাগে বলেই নয়। দেশ থেকে অর্কিডের নানা প্রজাতি বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে রানার খুব চিন্তা। তিনি বলেন, ‘নির্বিচারে গাছ কেটে ফেলার জন্য অর্কিড বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। আমি তাই অর্কিড সংগ্রহ করে বেশি বেশি চারা উৎপাদন করছি। যেন কোনো প্রজাতিই ষোলোআনা বিলুপ্ত না হয়।’

২০১৮ সালে বাণিজ্যিকভাবে অর্কিডের উৎপাদন শুরু করার মাত্র ৬ মাসের মাথায় তিনি লাভের মুখ দেখেন। ভারত, মায়ানমার থেকে তিনি অর্কিড আমদানি করেন। তবে উৎপাদন এবং অনেক বেশি প্রজাতি সংরক্ষণে তার আগ্রহ বেশি। তিনি অর্কিড সংগ্রহ এবং উৎপাদন বেশি করেন। বিক্রি যা হয়, তা মন্দ নয়। ৩০০-৫,০০০ টাকার অর্কিড পাওয়া যায় তার কাছে। বিশ্বস্ত ক্রেতা, বাগানি হিসেবে তার পরিচিতি কম নয়।

jagonews24

দেশের অর্কিডকেন্দ্রিক ‘অর্কিড সেল অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বিডি’, ‘গ্রাউন্ড অর্কিড হবিস্ট বাংলাদেশ’, ‘ইন্ডোর প্ল্যান্ট সোসাইটি’। এ তিনটি গ্রুপের অ্যাডমিন তিনি। নিজের পেজের নাম ‘অর্কিড সোর্স’। পেজগুলোর মাধ্যমে তিনি অনলাইনে বিক্রি করেন। রানা গাছ ভালোবাসেন। ভালোবাসাটাই তার কাছে প্রধান। সে কারণে অসংখ্য প্রজাতির অর্কিড অনেক দাম দিয়ে তিনি সংগ্রহ করেছেন।

মজার বিষয় হলো, ফেসবুকে রানাকে খুঁজে পাওয়া বেশ মুশকিল। কারণ তার আইডির নাম উটপাখি রানা। তিনি কিন্তু মোটেও উটপাখি পালন করেন না। এমন অদ্ভুত নামের কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘আমার বন্ধুমহল থেকে আমাকে ক্ষ্যাপানোর জন্য এ নামে ডাকা হতো। একসময় বন্ধুদের দেওয়া এ নামে পরিচিতি পেয়ে যাই। উটপাখি নাম বাদও দিয়েছিলাম একবার। তখন দেখলাম, আমাকে কেউ আর আগের মতো চিনতে পারছেন না।

ভালো লাগলেই অর্কিড কিনতে নেই। যত্ন না জানলে গাছ বাঁচানো যায় কমই। যারা একদম নতুন। ফুল পছন্দ হলেই গাছ কিনতে চান। তারা রানার কথাগুলোয় কিছুটা আশাহত হতে পারেন। তবে উপকারের জন্য তিনি এমনটা বলছেন। রানা বলেন, ‘সামান্য কিছু দেশি অর্কিড সংগ্রহ করে সেগুলোর যত্ন নিন। যদি বাঁচাতে পারেন তবেই অর্কিডের পরিমাণ বাড়াবেন। বর্ষাকাল অর্কিড বৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে অর্কিডের পাতায় পানি জমে ছত্রাকের আক্রমণে মারা যেতে পারে। তাই অতিরিক্ত বৃষ্টি হলে সাবধানে রাখতে হবে। বর্ষাকাল শেষ হলে অর্কিডকে খাবার দিতে হয়। শুধু পানিতে অর্কিড বেঁচে থাকবে। তবে খুব একটা বৃদ্ধি পাবে না, ফুলও হতে দেরি হবে। ফুলের পরিমাণ কমে যাবে। যতটুকু যত্ন নেওয়া সম্ভব; ততটুকুই রাখুন সংগ্রহে।’

অনেক বিক্রেতা আছেন, লোকাল অর্কিড গাছ থেকে পেরে এনে কোনো মিডিয়া টপ ছাড়া, সেটিং ছাড়া যেনতেন অবস্থায় বিক্রি করেন। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আমদানি করা নতুন গাছ কেটে ২-৩ ভাগ করে কোনোরকম সেটিং করে বিক্রি করেন। এসব চ্যালেঞ্জ রানা উতরে গেছেন কোয়ালিটি এবং বিক্রয়োত্তর সেবার কারণে। ক্রেতাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েই তার কাজ শেষ হয় না। সব সময় খোঁজখবর নেন। নিজ উদ্যোগে কখন কী করতে হবে, কোন কাজটি করা যাবে না একদমই। এসব জানিয়ে দেন সময়মতো। এ জন্য অনেকে তাকে গাছের বন্ধুও বলেন।

কেমন পরিবেশ অর্কিডের পছন্দ? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অর্কিড বাতাস, বৃষ্টি আর আর্দ্রতা থেকে তাদের পুষ্টি নিয়ে থাকে। এদের সরাসরি সূর্যের আলোতে না রেখে হাল্কা আলো-ছায়ায় রাখলে ভালো হয়। স্যাঁতসেঁতে জায়গায় অর্কিড ভালো থাকে, বৃদ্ধি হয় চোখে পড়ার মতো।’

jagonews24

ভালো মিডিয়ায় অর্কিড লাগানোর কোনো বিকল্প নেই। এখানেই সৌখিন বাগানিরা সবচেয়ে বেশি ভুল করেন। মিডিয়া সঠিক হয় না বলে অর্কিড খুব তাড়াতাড়ি পচে যায়। রানার পরামর্শ, যারা অর্কিড টব সেটিং করবেন; তারা কয়লা আর ক্লেয়বল অর্কিড মিডিয়া হিসেবে ব্যবহার করবেন।

অর্কিডের প্রধান রোগ হচ্ছে পচন ধরা। এই পচন ধরা বন্ধ করতে হলে ১৫ দিন পর পর ফাঙ্গিসাইড স্প্রে করে দিতে হয়। একটানা ২-৩ দিন বৃষ্টি হলে বৃষ্টি শেষেও ফাঙ্গিসাইড স্প্রে করা জরুরি। অন্য সময় ১৫ দিন পরপর ফাঙ্গিসাইড স্প্রে করতে হয়।

বাংলাদেশে অর্কিড উৎপাদন করে তা বিদেশে রপ্তানি করা সম্ভব। তবে এ জন্য চাই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। অনেক দেশই অর্কিড রপ্তানি করে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। রানা অর্কিডের প্রজাতির সংখ্যা বাড়াবেন। আরও মানুষকে অর্কিডপ্রেমী হতে সাহায্য করবেন। এটাই তার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা।

লেখক: অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার, সেলস অপারেশন্স, ফেয়ার ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেড।

এসইউ/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।