গোপালগঞ্জের কাজুলিয়ায় বিল অঞ্চলের মানুষ হাঁস পালন করে জীবিকার উন্নয়নে নতুন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর “একটি বাড়ি-একটি খামার প্রকল্প” এসব সংগ্রামী মানুষের দুর্দশা লাঘবে নতুন করে স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছে।মূলত বছরের পর বছর ধরে সদর উপজেলার কাজুলিয়া ইউনিয়নের পিঠাবাড়ী, শেওড়াবাড়ী, বিল বাজুনীয়া এলাকার মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রাম করতেন। কেউ থেকে শাপলা, শামুক সংগ্রহ করে, মাছ ধরে এবং সেসব বিক্রি করে সংসার চালাতেন। কিন্তু তারপরও বিশাল একটি জনগোষ্ঠিকে বছরের প্রায় অর্ধেক সময় কর্মবিমূখ হয়ে বেকার জীবনযাপন করতে হতো। কারণ ওই এলাকায় বছরে মাত্র একটি ফসল উৎপাদিত হয়। অঘ্রায়ণ মাস থেকে জৈষ্ঠ্য মাস পর্যন্ত কৃষি কাজ হয়। এছাড়া বছরের বাকি সময় বিলের অধিকাংশ জমি পানির নীচে থাকে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, প্রধান মন্ত্রীর “একটি বাড়ি-একটি খামার প্রকল্প” এর অওতায় ওই ইউনিয়নের ৯টি ওয়ার্ডে ৯টি গ্রাম উন্নয়ন সমিতি গড়ে তোলা হয়। প্রত্যেক সমিতিতে রয়েছেন ৬০ জন সদস্য। এরমধ্যে ৪০ জন নারী ও ২০ জন পুরুষ সদস্য রয়েছেন। প্রত্যেক মাসে প্রতি সদস্য ২০০ টাকা করে সঞ্চয় জমা করেন। পাশাপাশি প্রত্যেক সদস্যের অনুকূলে সরকার উৎসাহ বোনাস হিসেবে আরো ২০০ টাকা প্রদান করেন। কাজুলিয়া ইউনিয়নের ৯টি সমিতিতে ব্যক্তি সঞ্চয়, উৎসাহ বোনাস ও ঘূর্ণয়মান ঋন তহবিল মিলে ইতোমধ্যে ৫৪ লাখ টাকার একটি তহবিল সৃষ্টি হয়েছে। যা উঠান বৈঠকের মাধ্যমে সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ি ঋণ হিসেবে দেওয়া হয়। সমিতির ৪শ ৬৮ জন সদস্যের মধ্যে অধিকাংশ সদস্যই ঋণ নিয়ে হাঁস পালন শুরু করেন। এতে লাভবানও হচ্ছেন তারা। এক সময় তাদের দুর্দশা দূর হবে এবং স্বল্প সময়ের মধ্যে এ হাঁস পালন করে তারা অর্থনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন বলে এলাকার মানুষ মনে করছেন।পিঠাবাড়ী গ্রামের অনিমা মন্ডল (৩৫) জানান, গত ৬ মাস ধরে তিনি একশ হাঁস পালন করছেন। প্রতিদিন তিনি ২০-২৫ টা ডিম পান। স্থানীয় বাজারে এক হালি ডিম ৩০ টাকায় বিক্রি করছেন। এতে প্রতিদিন ১৫০-১৮০ টাকা আয় করেন।তিনি বলেন, বিলে বর্তমানে খাবার কম। বর্ষা মৌসুমে হাঁসগুলো পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক খাবার পাবে। তখন প্রতিদিন তিনি কমপক্ষে ৭০-৮০টা ডিম পাবেন। পাশাপাশি বাড়িতে ডিম ফুটিয়ে তিনি হাঁসের বাচ্চা ফুটাচ্ছেন। প্রতিটি বাচ্চা তিনি ৩০-৩৫ টাকা দরে বিক্রি করছেন। এতেও বেশ লাভবান হচ্ছেন। সমিতি থেকে কিছু টাকা ঋন নিয়ে তিনি হাঁস পালন শুরু করেছেন। আগে স্বামীর সঙ্গে জমিতে কাজ করতেন। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করেও সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হতো। এখন স্বামীও তাকে সাহায্য করছেন। হাঁস পালন করে তিনি এখন অনেক আত্ম বিশ্বাসী হয়ে উঠেছেন। তিনি মনে করেন এভাবেই তিনি তার ভাগ্যের চাকা ঘুরাতে পারবেন।পিঠাবাড়ী গ্রামের স্মৃতি বিশ্বাস (৩২), অনুমতি বিশ্বাস (২৮), সীমা বিশ্বাস (৩০) ও রেখা সরকার (২৮) বলেন, আমরা নারী-পুরুষ মিলে কৃষিকাজ করি। বছরে মাত্র একটা ফসল পাই। বাকি সময় বিলে পানি থাকে। বিশেষ করে পুরুষরা ওইসময় একেবারে বেকার হয়ে যান। কেউ শাপলা ও শামুক তোলে। আবার কেউ মাছ ধরে। এতে সংসার চলে না।তারা আরো বলেন, অভাবের মধ্যেই আমাদের দিন কাটাতে হতো। এখন হাঁস পালন করছি। সমিতি থেকে আমরা টাকা ঋণ পাচ্ছি। তবে তাদের অভিযোগ, বেশি দামে হাঁসের বাচ্চা কিনতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া মাঝেমধ্যে ফিস মিলও কিনতে হয়। এতে তাদের খরচ বেড়ে যায়। গোপালগঞ্জের সরকারি একটি হাঁসের হ্যাচারি রয়েছে। ওই হ্যাচারি থেকে বাচ্চা সরবরহ করা হলে ২০ টাকা মূল্যে তারা একটি হাঁসের বাচ্চা কিনতে পারবেন। এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নেবেন বলে তাদের প্রত্যাশা।এদিকে, সম্প্রতী পিঠাবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় কাজুলিয়া ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে হাঁস সমাবেশ ও হাঁসের প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশের উদ্বোধন করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক মো. খলিলুর রহমান। এসময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মমিনুর রহমান, সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. জালাল উদ্দিন, বিআরডিবি-র উপরিচালক জয় প্রকাশ বিশ্বাসসহ সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।সমাবেশে খাকী ক্যাম্বেল, রানার এবং চীনের জিংডং ও বেইজিংসহ বিভিন্ন জাতের হাঁস প্রদর্শন করেন পিঠাবাড়ীর হাঁসের খামারীরা। এছাড়া রাজা হাঁস, হাঁসের বাচ্চা ও ডিমও প্রদর্শন করা হয় ওই প্রদর্শনীতে। বিল অঞ্চলের মানুষের আর্থ-সামজিক উন্নয়নের লক্ষ্যে ও তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করতেই মূলত ব্যতিক্রমধর্মী এ সমাবেশের আয়োজন করা হয়।বিআরডিবি গোপালগঞ্জের উপপরিচালক জয় প্রকাশ জানান, দরিদ্র জনগোষ্ঠির অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ উদ্যোগে ‘একটি বাড়ি, একটি খামার’ প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। গোপালগঞ্জের কাজুলিয়ার বিল অঞ্চলের মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনে ৯টি সমিতি গঠনের মাধ্যমে সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ি সর্বনিম্ন ১০ হাজার ও সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে। ওই ঋনের টাকা দিয়ে তারা হাঁস প্রতিপালন করে স্ববলম্বী হতে যাচ্ছেন।জেলা প্রশাসক মো. খলিলুর রহমান বলেন, “ একটি বাড়ি, একটি খামার প্রকল্প ” মানুষকে স্বাবলম্বী করার জন্য একটি উদ্যোগ। কোনো পরিবার ১’শটি হাঁস পালন করতে পারলে মাসে তার কমপক্ষে ২০-২১ হাজার টাকা আয় হবে। এতে অনেক অস্বচ্ছল পরিবারে স্বচ্ছলতা ফিরে আসবে।এফএ/এবিএস