দেশজুড়ে

বিপর্যয়ের মুখে পোলট্রি শিল্প

বাচ্চার দাম বৃদ্ধি, খাদ্যপণ্য ও ওষুধের দাম বৃদ্ধি, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবহন ব্যবস্থা, অব্যবস্থাপনা, আড়ৎদারদের হাতে ডিমের বাজার জিম্মি ও ব্যাংকঋণের অপ্রতুলতাসহ নানা কারণে একের পর এক বন্ধ হয়ে যাচ্ছে গাজীপুরের পোলট্রি খামারগুলো। বিশেষ করে ক্ষুদ্র খামারিরা এখন অস্তিত্ব সঙ্কটে। গত আট বছরে জেলার কয়েক হাজার খামার বন্ধ হয়ে গেছে। এ পেশায় জড়িত খামারিদের অনেকেই বর্তমানে বিকল্প ব্যবসার সন্ধান করছেন। পোলট্রি খামারি, ব্যবসায়ী এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব চিত্র পাওয়া গেছে।সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, দেশের সবচেয়ে বেশি পোলট্রি খামার রয়েছে গাজীপুরে। বিশেষ করে দেশের অধিকাংশ বড় খামার দেখা যায় গাজীপুর সদর, শ্রীপুর, কাপাসিয়া ও কালীগঞ্জে। এছাড়া এখানে রয়েছে অনেক হ্যাচারি। এখান থেকে বাচ্চা উৎপাদন করে সারা দেশের খামারগুলোয় সরবরাহ করা হয়। কিন্তু জেলায় নতুন করে এ ব্যবসায় কেউ বিনিয়োগ করছেন না, বরং পুরনোরাই এ ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে অন্য পেশার সন্ধানে রয়েছেন। যারা কোনোমতে টিকে আছেন, তারাও কয়েক বছর ধরে লাভের মুখ দেখছে না। আবার বড় ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়ার ভয়ে তারা খামার বন্ধ করতেও পারছেন না।গাজীপুর সদর প্রাণিসম্পদ অফিস সূত্রে জানা গেছে, জেলায় বর্তমানে নিবন্ধনকৃত ৩ হাজার ১২২টি ডিম উৎপাদনের লেয়ার মুরগির খামার রয়েছে। মাংস উৎপাদনের জন্য ব্রয়লার মুরগির খামার রয়েছে ২ হাজার ৪১৬টি। মুরগির বাচ্চা উৎপাদনের হ্যাচারি রয়েছে ১৩টি ও হাঁসের খামার রয়েছে ২১৭টি। এছাড়া অনিবন্ধত আরো কয়েক হাজার খামার রয়েছে।পোলট্রি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০০৭ সালে এ জেলায় প্রায় ৮ হাজার পোলট্রি খামার ছিল। বর্তমানে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজারে। এর মধ্যেও বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে অনেক খামার। বিশেষ করে ক্ষুদ্র খামারগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। খামারিরা জানান, বর্তমানে তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় রয়েছে কিছু দেশি এবং বিদেশি বড় কোম্পানির মনোপলি ব্যবসার কারণে। এসব কোম্পানির কারণেই তারা ব্যবসা গুটিয়ে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। মনোপলির সঙ্গে জড়িত এসব বড় কোম্পানির অধিকাংশই প্রথমে ওষুধ নিয়ে মাঠে নামলেও বর্তমানে তারা নিজেরাই বাচ্চা উৎপাদন, লেয়ার ও ব্রয়লার মুরগির খামার, পোলট্রি ফিড উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ এবং পোলট্রি ফিডের কাঁচামাল ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। ফলে তাদের কাছ থেকে বাচ্চা, ওষুধ, খাদ্য কিনে খামারিরা উৎপাদিত ডিম বা মুরগি লাভজনক দামে বিক্রি করতে পারছে না। উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় এসব কোম্পানি নিজেদের খামারের ডিম ও মুরগি কম দামে বিক্রি করতে পারে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শ্রেণির খামারিদের উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় বাজারে তারা টিকে থাকতে পারছে না।জানা গেছে, পোল্ট্রির রাজধানী খ্যাত গাজীপুরে এক সময় দেশের অর্ধেক ডিম ও মাংস উৎপাদন হত। ক্রমাগত লোকসানের কারণে কয়েক হাজার পোল্ট্রি গুটিয়ে ফেলা হলেও এখনও দেশের এক চতুর্থাংশ ডিম ও মাংস উৎপাদন হচ্ছে গাজীপুরে। খোঁজ নিয়ে  জানা গেছে, আশির দশকে গাজীপুরে ব্যাপক হারে পোলট্রি ফার্ম গড়ে উঠে। শুরুতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পোল্ট্রি ফার্মগুলো গড়ে ওঠলেও এ শিল্পে ব্যক্তিগত বিনিয়োগও বৃদ্ধি পায়। এসময়  গাজীপুরেই গড়ে ওঠে প্রায় ১৮ হাজার পোল্ট্রি ফার্ম। দীর্ঘ দুই দশক নির্বিঘ্নে ব্যবসা চলে। কিন্তু ২০০৩ ও ২০০০৪ সালে ভিয়েতনাম এবং থাইল্যান্ডে বার্ড ফ্লু সংক্রমণের চিত্র থেকেই আতঙ্ক ছড়ায়। তখন থেকেই পোলট্রি শিল্পে ধস নামে। ২০০৫ ও ২০০৬ সালে এ আতঙ্ক কাটিয়ে পোলট্রি ব্যবসায় আবার জোয়ার আসে। সে সময় দু’পয়সা লাভের মুখ দেখেন খামারিরা। কিন্তু ২০০৭ সালে ২৩ মার্চ সরকারি বিমান ব্রিডার ফার্মে বার্ড ফ্লু (এভিয়ান ফ্লু) ধরা পড়ার পর তা ৫১টি জেলায় বিচ্ছিন্নভাবে সংক্রমিত হয়ে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দেশের গোটা পোলট্রি শিল্প। আর যতটা না সংক্রমিত হয়েছে তার চেয়ে বেশি ছড়িয়েছে আতঙ্ক।তারপরও ধুকে ধুকে টিকে থাকা গাজীপুরের পোলট্রি ব্যবসায়ী যখন নতুন উদ্দমে ঘুরে দাড়াঁনোর চেষ্টা শুরু করে তখন ভারত থেকে ডিম আমদানি এবং বাচ্চার দাম কয়েক গুন বেড়ে যাওয়ায় ক্রমাগত লোকসান দিতে দিতে বিপর্যয়ের মুখে পরে আবারো খামার বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছেন খামারিরা। বাংলাদেশ পোলট্রি খামার রক্ষা জাতীয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক খন্দকার মো. মোহসিন জানান, মুরগির খাদ্য তৈরির কাঁচামাল ভুট্টার দাম কমলেও ফিডের দাম কখনো কমে না। এছাড়া ডিমের দাম নির্ধারণ করে ঢাকার কারওয়ান বাজারের আড়তদাররা। সে অনুযায়ী তাদের বিক্রি করতে হয়। পোলট্রি শিল্পের বর্তমান বিপর্যয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে গাজীপুর সদর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. জহিরুল ইসলাম জানান, পোলট্রি ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা প্রদান এবং ভোক্তাসাধারণকে কেমিক্যালমুক্ত মাংস ও ডিম সরবরাহ করতে সরকারের উদ্যোগে এবং এফএওর (ফুড অ্যান্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশন) সহযোগিতায় গাজীপুরের কাউলতিয়ায় শিগগিরই একটি ‘সেফ জোন প্রজেক্ট’ চালু করা হয়েছে। তিনি আরো জানান, মুরগির ডিম ও মাংস ক্রেতারাগণের কেমিক্যালমুক্ত অর্গানিক পণ্য নিশ্চিত করার জন্য এবং খামারিদের সব রকম সেবা ও পরামর্শ দিতে প্রাণী সম্পদ বিভাগের কর্মকর্তা প্রস্তুত থাকেন।এফএ/পিআর