শুধুমাত্র একটি সেতুর জন্য দুর্ভোগের শিকার কয়েকটি গ্রামে কেউ সম্বন্ধ করতে চান না। ভালো পরিবার বা ভালো জায়গায় আত্মীয়তা করা হয় না তাদের। অনেককেই বিয়ে-সাদি দেয়া বা করানোর জন্য বাসা ভাড়া নিয়ে অন্যত্র যেতে হয়। আক্ষেপ করে এসব কথা বলেছেন হবিগঞ্জের নবীগঞ্জ উপজেলার কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নের লহরজপুর গ্রামের বাসিন্দা গৃহবধূ ফাতেমা বেগম। জেলা সদর থেকে গ্রামটির দূরত্ব প্রায় ১০ কিলোমিটার। হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ সড়কের পাশেই এর অবস্থান। সড়ক থেকে এর দূরত্বও মাত্র কোয়ার্টার কিলোমিটার। অথচ যাতায়াতে বাধ সেধেছে মাত্র একটি সেতু। মাঝখানে শাখাবরাখ নদী গ্রামটিকে পৃথক করে রেখেছে। শুধু এ গ্রামই নয়, এমন অবস্থার শিকার হচ্ছেন এ ইউনিয়নেরই অন্তত ১০টি গ্রামের বাসিন্দারা। একটি সেতুই বদলে দিতে পারে এসব গ্রামের প্রায় ১৫ হাজার মানুষের জীবনচিত্র।স্থানীয়রা জানান, প্রতিনিয়তই সীমাহীন দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন তারা। অথচ প্রতিবারই প্রার্থীরা সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হন। নির্বাচিত হওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার আর কোনো খোঁজখবর রাখেন না তারা। যুগ যুগ ধরে এভাবেই চলছে। সেতুর অভাবে ওই গ্রামগুলোর প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে বাঁশের সাঁকো দিয়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। বিশেষ করে শিশু, নারী ও বৃদ্ধদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। ভয়ে অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত স্কুল-কলেজেও যাতায়াত করেন না। আর রোগী নিয়ে হাসপাতালে যাওয়া যে কত কষ্টের তা বলারই অপেক্ষা রাখে না।লহরজপুর গ্রামের বাসিন্দা বৃদ্ধ সাবু মিয়া বলেন, এ সাঁকো দিয়ে প্রায় ১০টি গ্রামের অন্তত ১৫ হাজার মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করে। ঝুঁকি নিয়ে সকলকে যাতায়াত করতে হয়। কখন যে এটি ভেঙে পড়ে। ভয়ও হয়। সব সময়ই এমপি, চেয়ারম্যান, মেম্বার নির্বাচন এলে এখানে সেতু করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্ত কাজের কাজ কিছুই হয় না। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, আমাদের দুঃখ কেউ দেখে না।মোস্তাক আহমেদ রাজু বলেন, প্রতিদিন এ সাঁকো দিয়ে কয়েকশ স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থী যাতায়াত করে। বিভিন্ন সময় অনেকেই সাঁকো থেকে নদীতে পড়ছে। বই-খাতা ভিজিয়ে সাঁতরে তীরে উঠেছে। অনেকেই আহত হয়েছে। এ ভয়ে বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে শিক্ষার্থীরা স্কুল-কলেজে যাতায়াত কমিয়ে দেয়। তিনি বলেন, আমরা শুধু শুনেই আসছি এখানে সেতু হবে। কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখি না।স্কুলছাত্র শিবলু জানায়, সাঁকোর অবস্থা নড়বড়ে। তাই ভয়ে বই নিয়ে স্কুলে যেতে মন চায় না। কৃষক ময়না মিয়া বলেন, এখানকার উৎপাদিত ধান, শাক, সবজি কোনো কিছুই বাজারে নিয়ে যেতে পারি না সেতুর অভাবে।সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কুশিয়ারা নদীর একটি শাখা ‘শাখাবরাখ’ নদী। এটি বাহুবল, হবিগঞ্জ সদর, নবীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলার হাওর দিয়ে বয়ে গেছে। এ নদীটি যেমন হাওরবাসীর সুখের সাথী তেমনি এ নদীর কারণে দুঃখেরও শেষ নেই। এ নদীর বেশির ভাগ অংশই পড়েছে নবীগঞ্জ ও বানিয়াচং উপজেলায়। যদিও বানিয়াচংবাসীর যাতায়াতে এ নদীর তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। কিন্তু নবীগঞ্জের বিভিন্ন গ্রামকে নানাভাবে ঘিরে রেখেছে এ নদী। তেমনি ওই উপজেলার কালিয়ারভাঙ্গা ইউনিয়নবাসীরও সুখ-দুঃখেরও সাথী হয়ে আছে এ নদীটি। নদীর পূর্ব পাড় দিয়ে রয়েছে হবিগঞ্জ-নবীগঞ্জ সড়ক। আর পশ্চিমে রয়েছে লহরজপুর, খলিলপুর, সৈয়দাবাদসহ অন্তত ১০টি গ্রাম। গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের শাখাবরাখ নদী পেরিয়েই জেলা ও উপজেলা সদরে যাতায়াত করতে হয়। শিক্ষার্থীদেরও প্রাইমারি স্কুল, হাইস্কুল, মাদরাসা ও কলেজে যেতে হয়। তাই যাতায়াতের জন্য এ এলাকার বাসিন্দারা নদীর উপর বাঁশ-কাঠ দিয়ে নির্মাণ করেছেন একটি সাঁকো। অন্যথায় তাদের হাওরের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শ্রীমতপুর গ্রামে নির্মিত পাকা সেতু দিয়ে পারাপার হতে হয়। এদিকে গ্রামের পাশেই রয়েছে জেলার বৃহৎ হাওর ঘুঙ্গিয়াজুরী। নদীতে সেতু না থাকায় ওই হাওরে উৎপাদিত ধান নৌকা দিয়ে বহন করতে হয়। এতে সময়, শ্রমিকের মজুরি ও দুর্ভোগ বাড়ছে। তাই জনগণের দুঃখ-দুর্দশা লাগবে সেখানে একটি পাকা সেতু নির্মাণ জরুরি বলে মনে করেন স্থানীয়রা।এমএএস/পিআর