দেশজুড়ে

শীতলক্ষ্যার বালু নদীতে চাঁদা আদায়ের মহোৎসব

দেশের ছোট-বড় সব নদীতে চলছে নীরব চাঁদাবাজি। এসব চাঁদাবাজির অন্যতম হলো বালু উত্তোলন। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা নদীতে বালু চাঁদাবাজি খন্ডচিত্র মাত্র। বর্ষা মৌসুমে এসব নদীতে চলে হাজার হাজার বাল্কহেড ও ট্রলার। তবে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজি চলে বালু নদীতে। শুকিয়ে থাকা ডেমরা থেকে বেরাইদ, টঙ্গী যাবার রুটটি বর্ষার পানিতে হয় সচল। পূর্বাচল উপশহরের আশপাশে রয়েছে বেশ কয়েকটি হাউজিং সাইট। এ সাইটগুলোতে দিনরাত বালু ভরাটের কাজ চলে। শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা থেকে ট্রলার দিয়ে নিয়ে আসা হয় এ বালু। প্রতিদিন মেঘনার ৭/৮ টি স্পটে ড্রেজিং চলে। প্রতিদিন কয়েক লাখ সিএফটি বালু পাওয়া যায় এসব স্পট থেকে। মেঘনা নদীর ব্রীজের নিচে, মুন্সিগঞ্জের ঘাটের দিকেও রয়েছে কয়েকটি ড্রেজিং প্রকল্প। স্পটগুলো থেকে বালুভর্তি ট্রলার নদীর ওপর দিয়ে এসে পৌঁছায় এসব হাউজিংয়ে। বালু নদীর বুকে প্রতিদিন কয়েক হাজার ট্রলার। আর প্রতিটি  ট্রলারকে গন্তব্যে যাওয়ার পথে দিতে হয় চাঁদা। ট্রলার মালিকদের ভাষায় এটা লাইন খরচ। আর পুলিশ বলে নিরাপত্তা খরচ। চাঁদাবাজরা বলে ক্ষয়ক্ষতির খরচ। ট্রলার মালিকরা এ চাঁদা দিয়ে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বালু বিক্রি করার সময় এ খরচ হিসাব করেই দাম ধরে তারা। বালুভর্তি ট্রলারটি মেঘনা থেকে বালু নদী পর্যন্ত ৯টি স্পটে চাঁদা গুণতে হয়। চাঁদাবাজির এ স্পটগুলোর কাছে বালুভর্তি ট্রলারগুলো প্রধান টার্গেট। এসব ট্রলারকে কেন্দ্র করেই জমে ওঠে চাঁদাবাজদের ব্যবসা। গন্তব্যে পৌঁছাতে প্রতিটি ট্রলারকে চাঁদা বাবদ খরচ করতে হয় ২’শ টাকা। তাহলে দুই হাজার ট্রলার থেকে মোট চাঁদা ওঠে দিনে ৫০ লাখ টাকা। প্রতি মাসে মোট চাঁদা ১৫ কোটি টাকা। আর ছয় মাসের এ ব্যবসায় আয় হয় প্রায় শত কোটি টাকা। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, মেঘনা নদী থেকে বর্ষা মৌসুমে ড্রেজিং করে বালু উত্তোলন করা হয়। আর এ বালু আনা নেওয়ার কাজে প্রতিদিন কয়েক হাজার ট্রলার ব্যবহৃত হয়। এ ট্রলারগুলো বালু নদীর ডেমরা এলাকায় প্রবেশ করলে চাঁদাবাজরা ট্রলারগুলোর পিছু নেয়। কেউ চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে তাদের ওপর নির্যাতনের খড়গ নেমে আসে। প্রায় সময় ঘটে ডাকাতির ঘটনা। আর এ ডাকাতিতে নেতৃত্ব দেয় এলাকার সন্ত্রাসীরা। ট্রলার চালকরা জানায়, নারায়নগঞ্জ ৫নং ঘাট এলাকায় পুলিশ চাঁদা নেয় ট্রলার প্রতি ৫০ টাকা। কলাগাছিয়া এলাকায় নৌ-ফাঁড়ি পুলিশ চাঁদা নেয় ১০০ টাকা। শীতলক্ষ্যা ও বালু নদীর সংযোগস্থলে ডেমরা ব্রীজের নিচে ছোট ট্রলার ৫০০ টাকা, মাঝারি ও বড় ট্রলার প্রতি ৭০০ টাকা হারে চাঁদা আদায় করা হয়। বালু নদীর ইটখোলা নামক স্থানে আদায় করা হয় ৩০০ টাকা থেকে ৫০০ টাকা। ফকিরখালী নামকস্থানে ২০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করা হয়। বেরাইদ নামক এলাকায় আদায় করা হয় ৫০০ টাকা করে। শুধু ডাকাতিই নয় চলে দিনে দুপুরে ডাকাতি। রিয়েন এন্টারপ্রাইজের মালিক মর্তুজ বলেন, লাখ লাখ টাকা খরচ করে আমরা ট্রলার বানায়। এরপরও আবার ঘাটে ঘাটে দিতে হয় চাঁদা। তার কথার সঙ্গে তাল মিলিয়ে হালিম মিয়া জানান, টাকা না দিলে তারা মারধর করে।বিআইডব্লিউটি`র উপ-পরিচালক আলমগীর কবির বলেন, নদী ইজারার ক্ষেত্রে বাল্কহেড, বলগেট ও ট্রলারের মালামাল লোড-আনলোড এবং তীরে ভিড়ানো হলে নির্ধারিত পরিমাণে টাকা আদায় করা যাবে। অন্যথায় টাকা আদায় করা যাবে না। রূপগঞ্জ থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহমুদ হাসান বলেন, পুলিশের চাঁদাবাজির বিষয়টি মিথ্যা। রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লোকমান হোসেন বলেন, চাঁদাবাজির কোনো অভিযোগ আমি পাইনি। তবে কেউ অভিযোগ দিলে অবশ্যই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নারায়নগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজী (বীরপ্রতীক) বলেন, চাঁদাবাজদের কোনো ঠাঁই নেই। বালু নদীতে এর আগে দলের লোকেরা চাঁদাবাজিতে নেমেছিল। খবর পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ পাঠিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়। মীর আব্দুল আলীম/এআরএ/পিআর