নির্মাণ কাজে কর্মরত গাইবান্ধার নারী শ্রমিকরা শ্রমের ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না। অতিরিক্ত পরিশ্রম করেও শ্রম শোষণসহ নানা বঞ্চনার শিকার হয়ে এ জেলার নারী নির্মাণ শ্রমিকরা মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। নারী শ্রমিকদের আলাদা কোনো সংগঠন না থাকায় তারা অধিকার প্রতিষ্ঠায় সংগঠিত হয়ে কার্যকর কোনো ভূমিকাও রাখতে পারছেন না। একটি রেসরকারি সংগঠন সূত্রে জানা যায়, গাইবান্ধার ৭টি উপজেলার বিভিন্ন সেক্টরে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার নারী শ্রমিক কর্মরত আছেন। এরমধ্যে গৃহপরিচারিকা এবং কৃষি সেক্টরসহ মাটি কাটার কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকদের সংখ্যা বেশি হলেও চালকল এবং নির্মাণ কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিকের সংখ্যাও কম নয়। জেলায় রাজমিস্ত্রিদের সঙ্গে যোগানদারসহ ইটের খোয়া ভাঙার কাজে নিয়োজিত নারী শ্রমিক প্রায় ২ হাজার ৭শ। তবে এ সেক্টরে কর্মরত নারীদের সংখ্যা দিনদিন বাড়ছে। এর কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে, নদীবেষ্টিত এ জেলায় অব্যাহত নদী ভাঙনে সর্বহারা ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তদুপরি এ জেলায় বৃহৎ ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্প কারখানা গড়ে না ওঠায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। এদিকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বাঁশজাত কুটির শিল্প এখন বিলুপ্ত প্রায়। ফলে এ শিল্পকর্মে নিয়োজিত প্রায় সাড়ে ৩ হাজার পেশাদার কারিগর এখন চরম দুর্ভোগের শিকার। জীবন জীবিকার প্রয়োজনে তারা তাদের পৈত্রিক পেশাও ছাড়তে পারছেন না। আবার এ পেশা আঁকড়ে ধরে খেয়ে পরে বেঁচে থাকাও কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাঁশজাত শিল্পকর্মের মধ্যে ডালি, কুলা, চালুন, ঝাঁপি, দোলনাসহ নানা নকশি শো-পিস ক্রেতাদের কাছে জনপ্রিয়। তারপরও বাঁশের তৈরি চাটাই, নকশি করা ঘরের ছাদ, ঝাটরি শলাকাসহ গৃহস্থালী কাজে ব্যবহার্য জিনিসের এখনও যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। কিন্তু পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতায় এবং অবাধ বৃক্ষনিধনের মাধ্যমে বনাঞ্চল উজাড় করে ফেলায় সুন্দরগঞ্জে ব্যাপক হারে বাঁশঝাড়ও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এছাড়া তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র নদী তীরবর্তী এলাকায় ইতোপূর্বে প্রচুর বাঁশ বন থাকলেও অব্যাহত নদী ভাঙনে বাঁশঝাড়ের সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে। ফলে বাঁশ প্রধান এ অঞ্চলে এখন বাঁশের সঙ্কট। সেজন্য বাঁশজাত শিল্পকর্মের প্রয়োজনীয় বাঁশের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন ব্যয় বহুলাংশে বাড়লেও আনুপাতিক হারে বিক্রয়মূল্য বাড়েনি। কারণ বাঁশজাত কুটিরশিল্পে নিয়োজিত হত দরিদ্র ভাঙন কবলিত ছিন্নমুল মানুষ জীবন জীবিকার তাগিদে নারী পুরুষ উভয়েই শ্রমে নিয়োজিত হতে বাধ্য হচ্ছেন। পুরুষের চেয়ে নারী শ্রমিকদের দিয়ে বেশি কাজ করানো হলেও কম মজুরি দেয়ার সুযোগ রয়েছে বলেই নির্মাণ খাতে নারী শ্রমিকদের চাহিদা অপেক্ষাকৃত বেশি। এজন্য নির্মাণ নারী শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছে। কাজে নিয়োজিত হওয়ার ক্ষেত্রে মজুরি নিয়ে মালিকদের সঙ্গে দর কষাকষির সুযোগ পান না নারী শ্রমিকরা। এজন্য তারা সমান কাজ করেও পুরুষদের চেয়ে দিন হাজিরা ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত কম পান।এছাড়া নিজ মজুরি থেকে রাজমিস্ত্রিকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট হারে কমিশন না দিলে তারা কাজের সুযোগ হারান। ফলে হাড়ভাঙা খাঁটুনি খেটেও অসহায় নারী নির্মাণ শ্রমিকরা তাদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন ঘটাতে পারছেন না। তারা দরিদ্র থেকে আরও দরিদ্রতর হচ্ছেন। সেজন্য সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বাঁশজাত কুটির শিল্পে নিয়োজিত দরিদ্র পাটনী পরিবারগুলোকে সহজ শর্তে জামানতবিহীন ঋণ সহায়তা প্রদান করা হলে এই কুটির শিল্প যেমন বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পেত, তেমনি বাঁশজাত শিল্পের কারিগররা পৈত্রিক পেশাকে উপজীব্য করে জীবন জীবিকা চালিয়ে নিতে সক্ষম হতেন। বেসরকারি সংগঠন গণউন্নয়ন কেন্দ্রের নির্বাহী প্রধান এম.আবদুস সালাম জাগো নিউজকে জানান, অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে নারী শ্রমিকদের সংগঠিত হতে হবে। এক্ষেত্রে নারী ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।অমিত দাশ/এমজেড/এমএস