ফিচার

কার্টুন এঁকে নাসিফ আহমেদের বিশ্বজয়

সম্প্রতি আন্তর্জাতিক দুটি প্রদর্শনীতে বাংলাদেশের কার্টুনিস্ট নাসিফ আহমেদের কার্টুন নির্বাচিত হয়েছে। প্রদর্শনী দুটির প্রথমটি হলো ‘ফার্স্ট ওয়েল্ট হেইম্যাট ইন্টারন্যাশনাল কার্টুন কন্টেস্ট এক্সিবিশন ২০১৯’। যা জার্মানির দক্ষিণ-পশ্চিম অঙ্গরাজ্য বেডেন উটেমবার্গে অনুষ্ঠিত হয়। এ প্রদর্শনীর বিষয়বস্তু ‘যুদ্ধ ও মানবতা’। এ শিরোনামের অধীনে যুদ্ধ, গণহত্যা, শরণার্থী, মানবতাবিরোধী অপরাধ এমন অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সেখানে ৮২টি দেশের কার্টুন থেকে ১৫০টি কার্টুন চূড়ান্ত পর্যায়ে নির্বাচিত হয়। যার মধ্যে নাসিফের কার্টুনটিও স্থান পায়। তার কার্টুনের শিরোনাম ‘চ্যারিটি’। যার বিষয়বস্তু হলো ‘লোক দেখানো দয়াদাক্ষিণ্যতা’।

দ্বিতীয় প্রদর্শনীটি হলো ‘সেকেন্ড কেবু ল্যাম্পুন ফেস্টিভ্যাল কার্টুন এক্সিবিশন ২০১৯’। যা ফিলিপাইনের কেবু সিটিতে অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১৬ মার্চ এ প্রদর্শনী উদ্বোধন করা হবে। চলবে ২২ মার্চ পর্যন্ত। এ প্রদর্শনীতে দুটি ক্যাটাগরি রয়েছে- স্টুডেন্ট ক্যাটাগরি ও অ্যাডাল্ট ক্যাটাগরি। এদের ভেন্যুও আবার আলাদা। স্টুডেন্ট ক্যাটাগরির ভেন্যু- ইউনিভার্সিটি অব কেবু, মেইন ক্যাম্পাস। আর অ্যাডাল্ট ক্যাটাগরির ভেন্যু- হ্যান্ডুরো পিজ্জা, হোয়াইট গোল্ড। এখানেও নাসিফের ছবিটি অ্যাডাল্ট ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত হয়।

নাসিফের কার্টুন যেন মুক্তপ্রাণের স্বাধীন প্রকাশ। অধ্যবসায় ও স্বীয় মেধাশক্তিতে তিনি তার কর্মে বৈচিত্র্য ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। বিষয়কে প্রাধান্য দিয়ে তিনি তার শিল্পকর্মের আঙ্গিক ও শিল্পভাষা নির্ধারণ করেন। তার প্রতিটি কার্টুনে ব্যক্তবার্তা সুস্পষ্ট ও অকপট। সরলতা তার শিল্পকর্মের অলঙ্কার, যার মাধ্যমে তিনি সাধারণ মানুষ ও শিল্পীর চিন্তার মাঝে মিলবন্ধনের প্রয়াস পান।

এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আন্তর্জাতিক পরিসরের এসব প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করে এবং সেখানে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পেরে আমি গর্বিত। এক হাজার শব্দ দিয়ে যা প্রকাশ করা যায় না, একটি ছবিতে তা বোঝানো সম্ভব।’

বর্তমানে অনেক সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে কার্টুন ছাপা হয় তার। ব্যক্তির বৈশিষ্ট্যাবলী বিশেষত রাজনীতিবিদদের ভাবমূর্তিকে বিচিত্র ভঙ্গিমায় ব্যাঙ্গাত্মক করে তুলে ধরা হয়। বিশ্বে রাজনীতি, যুদ্ধবিগ্রহ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক বৈষম্য প্রভৃতি বিষয়ে কার্টুনের সরব উপস্থিতি সর্বজনগ্রাহ্য। কাজেই দুর্বোধ্য কোনো বিষয়কে সর্বসাধারণ্যে সাবলীলভাবে উপস্থাপনে কার্টুনের ভূমিকা অপরিসীম।

> আরও পড়ুন- স্কাউটিংয়ে রাষ্ট্রপতি অ্যাওয়ার্ড পেলেন রাকিব

শিল্পী হিসেবে চাওয়া-পাওয়ার বিষয়ে নাসিফ বলেন, ‘কাজ করে কি পেলাম তা আমার কাছে মূখ্য নয়। মানুষের জন্য কিছু করে যেতে পারলাম কি-না সেটাই মূখ্য। তাছাড়া অর্জনের হিসাব-নিকাশ এখনই শুরু করলে জীবনমান উন্নয়নের গতি মন্থর হতে পারে। তাই বেশিকিছু চিন্তা না করে সবসময় বর্তমানকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। অতীত কিংবা ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর সময় এখনও হয়নি। আমার বিশ্বাস বর্তমানের ভালো কাজগুলোই আমার বলিষ্ঠ অতীত ও ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সহায়ক হবে।’

স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, ‘কার্টুনিস্ট হিসেবে সবক্ষেত্রেই জীবনকে সহজ করে তোলার, আমার ক্ষুদ্র কর্মের মাধ্যমে অন্যের মুখে হাসি ফোটাবার চেষ্টা করি। প্রকৃত শিল্পীর গুণাবলী অর্জন করে শিল্পজগতে স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে চাই। শিল্পীর দৃষ্টিতে জীবন ও জগৎ দর্শন আমার অভিলাস।’

নাসিফ আহমেদের জন্ম সৈয়দপুরে হলেও পৈতৃক নিবাস খুলনা। বাবা মো. জালালউদ্দিন আহমেদ অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। মা তাজরিনা আক্তার গৃহিণী। আঁকাআঁকির প্রতি আগ্রহ ছোটবেলা থেকেই। হাতের কাছে কলম, পেন্সিল পেলেই বই, খাতা, টেবিল, মেঝে কিংবা দেয়ালে ছবি আঁকা শুরু করতেন। যা খুশি তা-ই আঁকতেন নিজের মতো করে। শুরু থেকেই এক্ষেত্রে বাবা-মার উৎসাহ উদ্দীপনায় কার্পণ্য ছিল না। তার কার্টুনিস্ট হয়ে ওঠার গল্প জানতে চাইলে বলেন, ‘আমার ‘আমি’ হয়ে ওঠার গল্প মানুষকে বলার মতো কিনা জানি না। আমি আর দশজন সাধারণ মানুষের মতোই একজন। তবে ছোটবেলায় যখন আবোল-তাবোল আঁকতাম, তা দেখে বাবা-মা বলতেন, ‘বড় হয়ে তোমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলায় চান্স পেতে হবে। বড় শিল্পী হতে হবে।’ একথা আমার অঙ্কনস্পৃহা আরও বাড়িয়ে দিত। আমি মনে করি, হয়তো এ প্রেরণাই আমার কার্টুনিস্ট হয়ে ওঠার মূলমন্ত্র।’

> আরও পড়ুন- বাংলাদেশি আয়েশার বিজ্ঞানে সাফল্য

বাংলাদেশের বিখ্যাত কার্টুনিস্ট আহসান হাবীবের শিল্পকর্ম তার শিল্প জীবনে প্রেরণা জুগিয়েছে। সৌভাগ্যক্রমে তার সান্নিধ্য লাভের সুযোগ পেয়েছেন। একসময় তার সম্পাদিত স্যাটায়ার ম্যাগাজিন ‘উন্মাদে’ ২০১৩ সালে কাজ শুরু করেন। গ্রাফিক নভেলের বিষয়ে তিনি এই গুণী শিল্পীর কাছ থেকে উৎসাহ পান। যদিও তখন বাংলাদেশে এর তেমন প্রচলন ছিল না। এরপর ছয়-সাত মাসে ‘সংঘাত’ নামে একটি গ্রাফিক নভেল তৈরি করেন, যা ২০১৪ সালের একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হয়।

যেসব প্রদর্শনীতে তার শিল্পকর্ম স্থান পায় সেগুলো হলো: ‘ফার্স্ট ওয়েল্ট হেইম্যাট ইন্টারন্যাশনাল কার্টুন কনটেস্ট এক্সিবিশন ২০১৯’, তুরস্ক ও জার্মানি, ‘সেকন্ড কেবু ল্যাম্পুন ফেস্টিভাল ইন্টারন্যাশনাল কার্টুন এক্সিবিশন ২০১৯’, কেবু সিটি, ফিলিপাইন, ‘ফেমিটুন কার্টুন এক্সিবিশন ২০১৮’, দৃক গ্যালারি, ঢাকা, ‘থিঙ্ক গ্লোবাল অ্যাক্ট লোকাল ২০১৬’, ‘পরিবেশবাদী কার্টুন এক্সিবিশন পার্টিসিপেন্ট ২০১৬’, দৃক গ্যালারি, ঢাকা, ‘ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল কার্টুন এক্সিবিশন ২০১৬’, জয়নুল গ্যালারি, ঢাকা, ‘অ্যানুয়াল আর্ট এক্সিবিশন ২০১১’, জয়নুল গ্যালারি, ঢাকা।

বর্তমানে তিনি একটি দৈনিক পত্রিকার স্টাফ আর্টিস্ট। নরওয়ের পাশাপাশি টুনসম্যাগ ইন্টারন্যাশনাল অনলাইন কার্টুন ম্যাগাজিন ‘দ্রোবাক’র অথর বা কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করছেন ২০১৮ সাল থেকে। কন্ট্রিবিউটর (পলিটিক্যাল কার্টুন) হিসেবে রয়েছেন সোমালিয়ার ‘হিমাল নিউজ নেটওয়ার্কে’। এছাড়া তিনি কন্ট্রিবিউটর হিসেবে কাজ করছেন জার্মানির ‘টুনপুল’ পত্রিকায়।

-প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন আল নাহিয়ান

এসইউ/এমকেএইচ