‘আল্লাহ আমাদের তার অসীম দয়ায় প্রাণে রক্ষা করেছেন। নতুবা আমাদের বাঁচার কথা ছিল না। কারণ আর ২-৩ মিনিটের মধ্যে আমাকে উদ্ধার না করলে যমুনায় চিরতরে ডুবে যেতাম। ’ কথাগুলো এক নিশ্বাসে বললেন একঘণ্টা নদীতে ভেসে থেকে প্রাণে বেঁচে যাওয়া গরু ব্যবসায়ী রজব আলী (৫০)। পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আর-আতাইকুলা ইউনিয়নের কুমিরগাড়ী গ্রামের বাসিন্দা রজব আলী।
ঈদের আগে আনন্দের পরিবর্তে দুঃখ আর বেদনার বোঝা নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন ২০ জন ব্যাপারি। ট্রলারের মাঝির লোভই তাদের সর্বনাশ করেছে বলে জানিয়েছেন রজব আলীসহ অন্য গরু ব্যবসায়ীরা।
অপরদিকে নৌকায় গরু পারাপার আইনত নিষিদ্ধ বলে জানিয়েছেন পাবনার বেড়া উপজেলার আমিনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)।
তবে রোববার (২৬ জুলাই) ভোরেও নগরবাড়ী ঘাটের নৌকাঘাটে গরু পারাপার হতে দেখা গেছে। আইন অমান্য করে এসব নৌকা (ট্রলার) মালিকরা গরু পরিবহন করছেন বলে আমিনপুর থানার ওসি জানিয়েছেন।
শনিবার (২৫ জুলাই) বিকেলে সাঁথিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম কুমিরগাড়ীতে গিয়ে কথা হয় রজব আলীর সঙ্গে। তিনি জানান, শুক্রবার ভোরে তারা নছিমনে গরু বোঝাই করে নগরবাড়ী ঘাটে যমুনা পাড়ে হাজির হন। সকাল আটটার দিকে তিনিসহ অন্যান্য গরু ব্যাপারি ও ব্যাপারিদের সহযোগীরা নৌকায় ওঠেন। সংখ্যায় তারা ছিলেন মোট ৪০ জন। এর মধ্যে ব্যাপারি ছিলেন প্রায় ২০ জন।
তিনি বলেন, নৌকা (ট্রলার) বোঝাই হওয়ার পরও মাঝি গরু তুলতে থাকায় তিনিসহ কেউ কেউ প্রতিবাদ জানান। এ সময় মাঝি বলেন, কিছু হবে না। আবার কয়েকজন উদাসীন ব্যাপারি ট্রলার যে বেশি বোঝাই হচ্ছে এটাকে গুরুত্বই দেননি।
তিনি জানান, কিছু সময় ট্রলার চলার পর যমুনার তীব্র স্রোত দেখে তিনিসহ অনেকেই ভয় পেয়ে যান। অনেকে মাঝিকে ট্রলার ঘুরিয়ে আবার নগরবাড়ী নিয়ে যেতে বলেন। কিন্তু মাঝি এতে কর্ণপাত করেননি। নদীর মাঝামাঝি গিয়ে পদ্মা- যমুনার সংযোগস্থলে নদীর ভয়াবহ রূপ দেখে মাঝি নৌকা ঘোরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তা আর সফল হয়নি। স্রোতের পাঁকে পড়ে মুহূর্তে নৌকাটি (ট্রলার) ডুবে যায়। সবাই নিজের প্রাণ বাঁচাতে ব্যস্ত হয়ে যান। কেউ গরুর লেজ ধরেন আবার কেউ নৌকার চরাট (কাঠখণ্ড) ধরে ভাসতে থাকেন।
রজব আলী জানান, আসলে এত দ্রুত এ ঘটনা ঘটে যে কারো পক্ষে গরুর বাঁধন খোলা সম্ভব হয়নি। তিনি ও তার শ্যালকের ছেলে আব্দুস ছালাম ছিলেন একই গ্রামের। অন্যদের মতো তারা দু’জনও নদীতে ভাসতে থাকেন। তীব্র স্রোতে তারা কখনো ডোবেন আবার কখনো ভাসেন। এভাবে তারা প্রায় দৌলতদিয়ার কাছে চলে যান। তখন আরিচা থেকে উদ্ধারকারীরা ৩টি নৌকায় করে গিয়ে তাদের টেনে তোলেন।
রজব আলী বলেন, নৌকায় যখন আমাকে টেনে তোলা হয় তখন আমার আর জ্ঞান ছিল না। পানিতে ডুবে যাচ্ছিলাম। পরে শুনেছি শুধু দুটি হাত দেখা যাচ্ছিল। পানি খেয়ে পেট বোঝাই হয়ে গিয়েছিল। পরণে আমারসহ কারোরই জামা কাপড় ছিল না।
রজব আলী জানান, আমি একজন দরিদ্র মানুষ। আমার তিন মেয়ে। আমি ছাড়া আমার পরিবারে উপার্জনক্ষম কেউ নেই।
তিনি বলেন, গরু কেনার সাধ্য আমার নেই। আমি আমার শ্যালকের ছেলে ছালামের সহকারী হিসেবে যাচ্ছিলাম। ছালামের একটি গরু ছিল। যেটির দাম প্রায় দেড় লাখ টাকা।
ব্যবসায়ী ছালাম মুঠোফোনে বলেন, আমার সংসার কোনোমতে চলে। ধার দেনা করে দেড় লাখ টাকার একটি গরু নিয়ে যাচ্ছিলাম। তাও শেষ হয়ে গেল। এখন কীভাবে আবার উঠে দাঁড়াব জানি না। আমার স্ত্রী ও একটি সন্তান রয়েছে। ঈদের আগে ঈদের আনন্দ নিয়ে বাড়ি ফেরার বদলে দেনার বোঝা নিয়ে বাড়ি ফিরেছি।
এদিকে সাঁথিয়ার গোপিনপুর গ্রামের গরুর ব্যাপারি সোবহান ফকিরের ছেলে ফজলুর রহমান জানান, জীবনটা রক্ষা হয়েছে। তবে নিঃস্ব হয়ে গেছি। আমি গরিব মানুষ। আমার ৮টি গরু ছিল। ১টি গরু প্রাণে রক্ষা পেয়েছে। আর সবগুলো ডুবে মরেছে। যেগুলোর দাম সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। আমার সবগুলো গরু কেনা ছিল। কয়েকটি গরুর নগদ দাম দিয়েছিলাম। আর কিছু বাকি করে নিয়ে গিয়েছিলাম। যমুনায় পুঁজি হারিয়ে, দেনার ভারে জর্জরিত হয়ে ফিরে এলাম।
ব্যবসায়ী ফজলু বলেন, তারা সাঁথিয়া এলাকারই ১০-১৫ জন ব্যাপারি ছিলেন। সব মিলিয়ে লোক ছিলেন তারা ৪০ জন। গরু ছিল ৪৫টি। ৪টি গরু ভেসে তীরে আসতে সক্ষম হয়। এই ৪টি গরুর মধ্যে তার ছিল একটি। অন্য একজন ব্যাপারির ছিল ৩টি গরু। বাদ বাকি সব গরু মারা গেছে।
এদিকে এ দুর্ঘটনার কথা জানলেও সব ব্যাপারির নাম বলতে পারেননি বিআইডব্লিউটিএ’র কাজীরহাট ঘাটের ইনচার্জ খালেদ মোশাররফ। তবে তিনি জানান, ট্রলার মালিক নগরবাড়ী এলাকার হায়দার চৌধুরি নামের একজন।
নগরবাড়ী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মাঈদুল ইসলাম জানান, তারা দুর্ঘটনার কথা জানলেও ব্যাপারিদের নাম ঠিকানা জানেন না। অবৈধভাবে ট্রলারগুলো কিভাবে গরু নিয়ে যায় জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান, নৌকা মালিকরা পালিয়ে পালিয়ে এসব কাজ করেন।
নগরবাড়ী ঘাট এলাকার কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রোববার (২৬ জুলাই) ভোরেও সবার চোখ এড়িয়ে গরু বোঝাাই ট্রলার নগরবাড়ী থেকে আরিচার উদ্দেশ্যে ছেড়ে গেছে। শুক্রবারের দুর্ঘটনার পর থেকে নৌকা মালিকরা কৌশল করে খুব ভোরে নৌকা ছাড়ছেন। গরু ব্যাপারিদের কাছে তাদের লোকেশন ফোনে জানিয়ে দেয়া হয়।
আমিনপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মঈনুদ্দীন আহমদ জানান, নৌকা(ট্রলারে) গরু পারাপার আইনত নিষেধ। তবে নগরবাড়ী , কাজীরহাট বিশাল চর এলাকা জুড়ে। ট্রলার মালিকরা পুলিশের নজর এড়ানোর জন্য একেক সময়ে একেক স্থান দিয়ে গরু বোঝাই করে পারাপার করে। তারা বিষয়টির উপর নজরদাড়ি বাড়িয়েছেন বলে জানান।
পাবনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ড্রাস্ট্রির সিনিয়র সহ-সভাপতি আলী মর্তুজা বিশ্বাস সনি জানান, করোনা সংকটের এ দুর্দিনে নিম্ন আয়ের মানুষ এমনিতেই আর্থিক সংকটে রয়েছেন। এখন এ ট্রলারডুবির ফলে তারা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের দিকে সরকার একটু সুদৃষ্টি দিলে তারা আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবেন।
এফএ/পিআর