দেশজুড়ে

সঙ্কটাপন্ন মানুষের জীবন বাঁচায় ‘আত্মীয়’

‘আত্মীয়ের রক্ত দান, প্রাণের সাথে মিশুক প্রাণ’- এই স্লোগান নিয়ে চলছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘আত্মীয়’। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার এই সংগঠনটির মূল কাজ মানুষকে রক্ত দেয়া। দুই বছর আগে যাত্রা করা আত্মীয় রক্ত দিয়ে বাঁচিয়েছে সঙ্কটাপন্ন বহু মানুষের প্রাণ। তবে করোনাভাইরাসের এই সঙ্কটকালে ভিন্নসব কাজের মাধ্যমে নিজেদেরকে মানুষের আত্মার পরম আত্মীয় বানিয়েছেন সংগঠনটির সদস্যরা।

জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৭ আগস্ট আখাউড়া উপজেলার কিছু তরুণ নিবেদিত কর্মী নিয়ে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে আত্মীয়। আত্মীয়’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সমন্বয়ক সমীর চক্রবর্তীর নেতৃত্বে সমন্বয়ক শেখ দিপু, সুজন সাহা, হৃদয় দেব, এম আর আই রাকিব, সুদীপ্ত সাহা, ইমদাদ কিবরিয়া, রাকিবা হাবিব অয়ন, মমতা ঘোষ মণি, আশরাফুল ইসলাম জুবায়েদসহ ২০-২৫ জন তরুণের একটি দল সংগঠনটির কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নিরবচ্ছিন্নভাবে রক্তদানের মতো মহৎ কাজটি করছে সংগঠনটির সদস্যরা। রক্তের জন্য কেউ ফোন করলেই হাসপাতালে ছুটে যায় আত্মীয়’র রক্তদাতা। এভাবে গত দুই বছরে ৪১৭ বার রক্ত দিয়েছে আত্মীয়। এখন পর্যন্ত সংগঠনটির নিবন্ধিত রক্তদাতার সংখ্যা এক হাজার ৩৫ জন। এর বাইরেও আত্মীয়’র ডাকে সাড়া দিয়ে অনেকেই রক্ত দিয়ে থাকেন।

রক্তদানের পাশাপাশি বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডেও নিজেদের যুক্ত রেখেছেন আত্মীয়’র সদস্যরা। রক্তদানে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতে প্রতি মাসে ‘আত্মীয় আড্ডা’ নামে বিশেষ আয়োজন করা হয়।

সংগঠনটির দ্বিতীয় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এবারও ‘প্রকৃতি উৎসব’ নামে ভিন্নধর্মী আয়োজন করে আত্মীয়। এ আয়োজনের মধ্যে ছিল বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সামনে ফলের বাগান গড়ে তোলা। এছাড়া মাসব্যাপী বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, রক্তের গ্রুপ নির্ণয়ের কার্যক্রমও রয়েছে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আয়োজনে।

করোনাকালে মানুষের পাশে আত্মীয়

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর গত ৩১ মার্চ আখাউড়া উপজেলার ১০৮টি কর্মহীন পরিবারকে খাদ্য সহায়তা দেয় আত্মীয়। এরপর ২৬ এপ্রিল থেকে আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও উপজেলা ছাত্রলীগের সঙ্গে মুঠোফোনে মানুষকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে আসছে সংগঠনটি। ১২ মে হাসপাতালের রোগী, ভবঘুরে ও শ্রমজীবী আড়াইশ মানুষকে ইফতার দেয়া হয়।

করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করা ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা চিকিৎসক, পুলিশ, প্রশাসন, পৌরসভা ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যদের মনোবল চাঙ্গা রাখতে তাদেরকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি দেয় আত্মীয়। এছাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নয়জন চিকিৎসককে ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম দেয়া হয়।

আত্মীয়’র মাধ্যমে রক্ত দেয়া আখাউড়ার রাধানগর এলাকার বাসিন্দা বিশ্বজিৎ পাল বলেন, গত দুই বছরে আত্মীয়’র মাধ্যমে পাঁচবার রক্ত দিয়েছি। প্রতিবারই দেখেছি রক্তগ্রহীতাদের সে কী আবেগ। আত্মীয় মানুষের প্রাণ বাঁচাতে যেভাবে কাজ করে যাচ্ছে সেটা দেখে সত্যিকার অর্থেই প্রাণ জুড়ায়।

আত্মীয়’র মাধ্যমে বোনের জন্য রক্ত পাওয়া আখাউড়ার রাধানগরের রাজীব সাহা নামে এক তরুণ জানান, তার বোনের জন্য এক ঘণ্টারও কম সময়ের মধ্যে চার ব্যাগ রক্ত জোগাড় করে দেয় আত্মীয়। সেদিন ছিল ঈদের দিন। কেউ কোরবানি ফেলে, কেউবা বাড়িতে অন্য অনুষ্ঠান রেখে রক্ত দিতে ছুটে আসে।

আত্মীয়’র সমন্বয়ক শেখ দিপু বলেন, রক্তের প্রয়োজনে মানুষের পাশে থাকার ব্রত নিয়ে আমরা সংগঠনের যাত্রা শুরু করেছিলাম। আমরা মানুষের মধ্যে ভালোবাসা বাড়াতে চাই। আমরা বিশ্বাস করি রক্ত দানই মানুষে মনুষে ভালোবাসা বাড়াতে পারে। মানুষের ভালোবাসায় আত্মীয় রক্ত দানে একটি আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছে।

আখাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক শ্যামল ভৌমিক বলেন, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব শুরুর পর মানুষজন আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। তখন আত্মীয় নামের সংগঠনটি আমাদের নিয়ে নানা সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান করেছে। এই সংগঠনের মাধ্যমে আমি ও স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক শুভ্র রায় প্রতিদিন গড়ে ১০-১২ জন রোগীকে মুঠোফোনে স্বাস্থ্যসেবা দিয়েছি। অনেক সময় মাধ্যমের অভাবে রক্ত জোগাড় করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। আত্মীয় এখন রক্ত যোগাড়ের একটি মাধ্যম হয়ে উঠেছে।

আজিজুল সঞ্চয়/আরএআর/এমকেএইচ