জাতীয়

শহীদ মিনারে রাকিব হত্যা, নেপথ্যে নারী-মাদক সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত

কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার এলাকায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও কলেজ শিক্ষার্থী রাকিব হাসানকে কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যার ঘটনায় নারী ও মাদকসংক্রান্ত দ্বন্দ্ব আছে বলে ধারণা করছে পুলিশ এবং নিহতের স্বজনরা।

পুলিশের তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, একজন তরুণীকে ঘিরে বিরোধ এবং মাদক সংশ্লিষ্ট জটিলতা থেকেই এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটতে পারে।

পুলিশ জানায়, ঘটনাটি পূর্বপরিকল্পিত হতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এ ঘটনায় জড়িত সকলকে গ্রেফতার করা গেলে প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা যাবে। ইতোমধ্যে অভিযুক্তদের ধরতে শাহবাগ থানা পুলিশের একাধিক দল অভিযান চালাচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রোববার রাত সাড়ে ৯টার দিকে শহীদ মিনারের ভেতরে রাকিব হাসানের ওপর হামলা চালায় কয়েকজন দুর্বৃত্তরা। প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে তাকে গুরুতর আহত করা হয়। পরে গুলি করে হামলাকারীরা পালিয়ে যায়। এসময় আশপাশের লোকজন ধাওয়া করে ঘটনাস্থল থেকে শিহাব উদ্দিন নামে এক তরুণকে আটক করা হয়। পরে তাকে শাহবাগ থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আটক শিহাব পুলিশকে জানিয়েছে, একজন তরুণীর ডাকে তিনি খুলনা থেকে ঢাকায় এসেছিলেন। রোববার সকালে ঢাকায় পৌঁছে বিকেল তিনটা থেকে শহীদ মিনার এলাকায় অপেক্ষা করছিলেন। যদিও তাকে ডেকে আনা সেই তরুণীর সঙ্গে তার দেখা হয়নি।

শিহাব দাবি করেন, সেখানে বসে গাঁজা সেবন করছিল এমন তিন যুবকের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। তারা তাকে টাকার বিনিময়ে একটি ছেলেকে মারধরের কাজে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দেয়। শিহাবের ভাষ্য অনুযায়ী, তারা তাকে বলে ‌‘আমরা এখানে একটা ছেলেকে মারবো, তুমি শুধু তাকে ধরে রাখবা।’ এরপর টাকা পাওয়ার পর তিনি রাজি হন। হামলার সময় ছুরিকাঘাত করেছেন বলে স্বীকার করেছেন শিহাব। তবে অন্যদের পরিচয় তিনি জানেন না বলে দাবি করেছেন।

শিহাব নিজেকে খুলনার সোনাডাঙ্গা থানার দীঘিরপাড় এলাকার রফিকুল ইসলাম ও শিল্পী বেগমের ছেলে বলে পরিচয় দিয়েছেন। তিনি পেশায় বাসচালক এবং খুলনা থেকে সাতক্ষীরা রুটে চলাচলকারী একটি লোকাল বাসে বদলি চালক হিসেবে কাজ করেন বলেও জানিয়েছেন।

নিহতের স্ত্রী হাবিবা আক্তার দাবি করেন, খুলনার এক নারী কনটেন্ট ক্রিয়েটর জান্নাত মুনকে ঘিরে এই বিরোধের সূত্রপাত। বগুড়ায় এক কনটেন্ট ক্রিয়েটরের বিয়ের অনুষ্ঠানে গিয়ে তার স্বামীর সঙ্গে ওই নারীর পরিচয় হয়। পরে ওই নারী তাদের বাসায় যাতায়াত শুরু করেন। একসময় রাকিব বুঝতে পারেন, তিনি ফোনে কারও সঙ্গে মাদক বহনের বিষয়ে কথা বলতেন। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করায় ওই নারী তার বয়ফ্রেন্ড সাজিদকে জানায়। এরপর প্রায় এক মাস আগে সাজিদ ফোনে রাকিবকে হুমকি দেয়। হুমকি দিয়ে রাকিবকে বলেছিল, ‘ঢাকায় এসে তোকে শেষ করে দিয়ে যাবো। এসব বিষয়ে বাড়াবাড়ি করবি না’।

এ ঘটনার পর নিহত রাকিবের মা রাজিয়া বেগম সন্তানের মৃত্যুর শোকে বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ছিলেন। তিনি বলেন, পরশু বিকেলে আমার ছেলে আমার কাছে ভাত চেয়েছিল। তখন আমি রান্না করছিলাম। তাকে একটু অপেক্ষা করতে বলেছিলাম। সে বাসা থেকে বের হয়ে গেল। আমার ছেলেটা না খেয়েই চলে গেল।

রাজিয়া বেগম জানান, তার এক ছেলে ও এক মেয়ে। তিনি শেখ বুরহানউদ্দিন পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কলেজের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক শাখায় চাকরি করেন। তার স্বামী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত মৈত্রী হলে অফিস সহায়ক হিসেবে কর্মরত। নিহত রাকিব ওই কলেজেই ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষে পড়াশোনা করছিলেন। ২০২১ সালে তার বিয়ে হয় এবং স্ত্রীকে নিয়ে তিনি ঢাকাতেই থাকতেন।

এদিকে নিহত রাকিব হাসানের সুরতহাল প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, রাকিবের শরীরে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ডান পাশে বগলের নিচে প্রায় সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি এবং তার নিচে প্রায় সাত ইঞ্চি গভীর ক্ষত পাওয়া গেছে। এছাড়া পেটের ডান পাশে প্রায় পাঁচ ইঞ্চি এবং বাম পাশে আড়াই ইঞ্চি কোপের দাগসহ শরীরের অন্তত পাঁচটি স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। পাশাপাশি পেটের বাম পাশে ও পিঠে গুলির চিহ্ন পাওয়া গেছে।

এ বিষয়ে ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বলেন, শহীদ মিনারের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। এখনো নিশ্চিতভাবে হত্যার মোটিভ বলা যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিকভাবে একজন নারীকে ঘিরে দ্বন্দ্বের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। ঘটনায় জড়িত অন্যদের গ্রেফতার করতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তাদের শনাক্ত করে গ্রেফতার করা গেলে হত্যার প্রকৃত কারণ জানা যাবে।

টিটি/কেএইচকে