কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘিরে কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়িতে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। এ কর্মযজ্ঞের সঙ্গে বদলে যাচ্ছে দুর্গম দ্বীপ অঞ্চলটির মানুষের জীবনচিত্র। সেই সঙ্গে দামি হয়ে উঠছে বিচ্ছিন্ন ইউনিয়নটির জমিও।
‘মাতারবাড়ি আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল-ফায়ার্ড পাওয়ার প্রোজেক্ট’ শীর্ষক প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর গত দুই বছরে অঞ্চলটিতে জমির দাম ক্ষেত্রবিশেষে তিনগুণ পর্যন্ত বেড়েছে। সেই সঙ্গে এসেছে স্থানীয়দের অবকাঠামোগত পরিবর্তন। কোথাও কোথাও আধুনিকতার ছোঁয়াও লেগেছে।
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একসময় মাতারবাড়িতে চা-সিঙ্গাড়া খাওয়ার জন্য একটি দোকানও খুঁজে পাওয়া যেত না। এখন ছড়িয়ে-ছিটিয়ে খাবারের অসংখ্য হোটেল তৈরি হয়েছে। এসব হোটেলে সকালের নাস্তার পাশাপাশি দুপুর ও রাতের খাবারও পাওয়া যায়। হোটেলগুলোতে চা তো পাওয়া যায়ই, কফিও পাওয়া যায়।
তারা বলছেন, কায়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর ধীরে ধীরে মাতারবাড়ির মানুষের জীবনচিত্র বদলে গেছে। বিশেষ করে গত দুই বছরে অনেক পরিবর্তন এসেছে মাতারবাড়িতে। দুই বছর আগে যে জমি সাত থেকে আট লাখ টাকায় বিক্রি হতো এখন তার দাম বেড়ে ২০ লাখ টাকা ছাড়িয়ে গেছে। এরপরও স্থানীয়রা জমি বিক্রি করতে চাচ্ছেন না।
জমির দামের বিষয়ে জানতে চাইলে ফুলজান মোরার বাসিন্দা শাহদাত হোসেন বলেন, ‘বছর দুই আগে এক কানি (২৩.৫ কাঠা) জমি সাত লাখ টাকায় বিক্রি হয়েছে। সেই জমির দাম এখন ২২ লাখ টাকা। বাইরে থেকে এসে অনেকে এখানে জমি কিনতে চাচ্ছেন। তবে আমরা যারা স্থানীয়, তারা জমি বিক্রি করছি না।’
তিনি বলেন, ‘কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই আমাদের জমির দাম বাড়ছে। সেই সঙ্গে অনেক হোটেল, দোকানপাট গড়ে উঠছে। আগে যারা চাষাবাদ করতেন, তাদের অনেকে এখন নতুন ব্যবসায় নেমেছেন। আয়ও হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।’
মাইজপাড়ার বাসিন্দা ওলি আহমেদ বলেন, ‘কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর আমাদের লবণ চাষে কিছু সমস্যা সৃষ্টি হয়। অন্যান্য ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়ন হয়েছে। আগে এখানে একটা চায়ের দোকান ছিল না। এখন অনেকগুলো খাবার হোটেল তৈরি হয়েছে। বাইরে থেকে মানুষ আসায় এসব খাবার হোটেলের ব্যবসাও ভালো। তাছাড়া স্থানীয়রাও হোটেলে গিয়ে নাস্তা করেন।’
তিনি বলেন, ‘আগে মাইজপাড়ার এক কানি জমি আট লাখ টাকার মধ্যে পাওয়া যেত। কাগজে-কলমে নতুন করে আমাদের জমির দাম বাড়েনি। এখন কোথাও ১২ লাখ টাকার নিচে এক কানি জমি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও এক কানি জমি ২৪ থেকে ২৫ লাখ টাকায়ও বিক্রি হচ্ছে। আগামীতে এসব জমির দাম আরও বাড়বে বলে আমাদের ধারণা।’
জমির দামের বিষয়ে প্রায় একই ধরনের কথা বলেন মগডেইলের বাসিন্দা মো. করিম। তিনি বলেন, ‘কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প হওয়ার কারণে জমির দাম বেড়েছে, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় লাভ। এছাড়া আমাদের তেমন কোনো লাভ হয়নি। কারণ প্রকল্প এলাকায় আমাদের জমি ছিল না, তাই টাকাও পাইনি। আগে যেভাবে চলতাম এখনো সেভাবেই চলছি।’
এ বিষয়ে মাতারবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ উল্লাহ জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাতারবাড়ি একটি দুর্গম অঞ্চল। এখানকার মানুষ অনেক পিছিয়ে। তবে প্রধানমন্ত্রী মাতারবাড়ির উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছেন। এখানে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গভীর সমুদ্র বন্দর হচ্ছে। এ কারণে মাতারবাড়ির মানুষের জীবনচিত্রও বদলে যাচ্ছে। সামনে মাতারবাড়ির মানুষের আরও উন্নয়ন হবে।’
তিনি বলেন, ‘একসময় এখানে এক কাপ চাও পাওয়া যেত না। এখন এই ইউনিয়নের মানুষ আয়েশ করে হোটেলে বসে কফি খান। অনেক হোটেল হয়েছে। রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হয়েছে। সামনে আরও উন্নয়ন হবে। এসব কারণে জমির দামও বেড়েছে। বাইরে থেকে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজের জন্য মানুষ আসছে। সামনের দিনে মাতারবাড়িতে আধুনিক অনেক কিছুই হবে।’
মাতারবাড়ি আলট্রাসুপার ক্রিটিক্যাল কোল ফায়ার্ড পাওয়ার প্রকল্পের পরিচালক আবুল কালাম আজাদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘মাতারবাড়িতে শুধু বিদ্যুৎ প্রকল্প নয়, অনেক কিছুই হচ্ছে। উন্নয়ন হলে জমির দাম বাড়বে এটাই স্বাভাবিক। খোঁজ নিলে দেখা যাবে, আগে মাতারবাড়িতে একটা ফলের দোকান ছিল না, সিঙ্গাড়া খাওয়ার দোকান পাওয়া যেত না। এখন একটা বাজারেই দেড় থেকে দুইশ’ ফলের দোকান। এখন মাতারবাড়িতে সবকিছু পাওয়া যায়।’
এমএএস/পিডি/ইএআর/সায়ীদ আলমগীর/ইএ/এইচএ/এমএস