দেশজুড়ে

পোল্ট্রি খাতে শুধু নোয়াখালীতেই বছরে ক্ষতি আড়াইশ কোটি টাকা

নোয়াখালীতে শুধুমাত্র পোল্ট্রি খাতেই খামারিদের বছরে ক্ষতি আড়াইশ কোটি টাকা বলে নিশ্চিত করেছেন জেলা পোল্ট্রি খামার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন।

তিনি জানান, ২০১৯ সাল থেকে বেশিরভাগ খামারে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। রাণীক্ষেত, গামবোরা, ককসিডিওসিস, পুলোরাম, ঠান্ডাজনিত ও বার্ডফ্লুসহ বিভিন্ন রোগে ব্যাপকভাবে মারা যাচ্ছে খামারের মুরগি। ফলে বর্তমানে জেলায় প্রায় এক হাজার ৩০০ খামার বন্ধ রয়েছে।

জেলা পোল্ট্রি শিল্পের এ নেতা আরও জানান, খামার বন্ধ থাকায় জেলায় প্রতিমাসে প্রায় ২০ কোটির অধিক টাকার মুরগি ও ডিম উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। বছর শেষে এ ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৫০ কোটি টাকা। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই ব্যাংকঋণে জর্জিরত। খামারগুলো বন্ধ হওয়ায় মালিকরা যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তেমনি কর্মচারীদের কাজ না থাকায় জেলায় বেকারত্বের হারও অনেক বেড়েছে। ফলে দেশের মাংসের চাহিদার প্রায় ৮০ ভাগ পূরণকারী পোল্ট্রি খামারগুলোতে মুরগি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।

জেলা পোল্ট্রি খামার অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, ২০২০ সালের শেষের দিকে জেলার ৯ উপজেলায় প্রায় ছয় হাজার পোল্ট্রি খামার ব্যবসায়ী ছিলেন। এসব খামার থেকে প্রতিমাসে ৬০০ টন মুরগি ও এক কোটি ডিম উৎপাদন হত। কিন্তু বিভিন্ন সময় একাধিক রোগে খামারগুলোর লাখ লাখ মুরগি মারা যায়। এতে খামারিদের ক্ষতির পাশাপাশি সরকারও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ মুরগির খাদ্য ও ওষুধ ক্রয়ের একটি অংশ সরকারি রাজস্বে যোগ হয়ে থাকে। কিন্তু বর্তমানে খামারগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরকারও লাখ লাখ টাকা রাজস্ব হারাচ্ছে।

পোল্ট্রি শিল্পের সাথে জড়িত বেশ কয়েকজন খামারি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জেলার বর্তমান পোল্ট্রি খামারিরা একটা সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছে। এ সিন্ডিকেট কোনো প্রকার পূর্বঘোষণা ছাড়াই মুরগির বাচ্চা, খাদ্য ও ওষুধের মূল্য বাড়িয়ে দেয়। সরকারি কোনো সংস্থার নিয়ন্ত্রণ না থাকায় তারা নিজেদের মতো করে কয়েক মাস পরপর এসব করে যাচ্ছে। পোলট্রি শিল্পের দুর্দিনের জন্য এটাও একটা কারণ।তারা আরও জানান, ২০১৯ সালে প্রতিটি মুরগির বাচ্চা ক্রয়ে খরচ হত ৪০ থেকে ৫০ টাকা, মুরগির খাদ্য প্রতি ৫০ কেজির ফিডের বস্তার মূল্য ছিল দুই হাজার ৫০ টাকা। দুই বছরের ব্যবধানে বর্তমানে প্রতিটি বাচ্চার মূল্য ৬০ থেকে ৬৫ টাকা এবং খাদ্য প্রতি বস্তা দুই হাজার ৪৫০ টাকা। খামারে প্রতি হাজার ব্রয়লার মুরগি উৎপাদনে খরচ হয় দুই লাখ টাকা। যার মধ্যে ওষুধ বাবদ ২০ হাজার ও খাদ্য বাবদ এক লাখ ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। ৩০ দিনে বাজার উপযোগী হয়ে ওঠার পর বিভিন্ন রোগের ক্ষতি কাটিয়ে প্রতি হাজার মুরগি বিক্রি হয় এক লাখ ৬০ হাজার টাকায়।

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার গাংচিল গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত খামারি আল মামুন বলেন, ২০১৫ সালে ৩২ হাজার মুরগি নিয়ে পোল্ট্রি খামার চালু করেন তিনি। পরবর্তীতে ব্যবসায় সফলতা আসলে ঋণ নিয়ে আরও ৯টি খামার গড়ে তোলেন। ব্রয়লার, লেয়ার, সোনালী এই তিন প্রজাতির প্রায় ৫৫ হাজার মুরগি ছিল তার খামারে।

কিন্তু গত ২০১৯ সালের জুনে রাণীক্ষেত রোগে তার ৯টি খামারের এক কোটি ১৭ লাখ টাকার মূল্যের ১৮ হাজার ব্রয়লার মুরগি মারা যায়। দ্বিতীয় ধাপে ২০২০ সালে জানুয়ারিতে বার্ডফ্লু রোগে মারা যায় ৩৭ হাজার মুরগি। যার বাজার মূল্য ছিল দুই কোটি চার লাখ টাকা। নিরুপায় হয়ে ওই বছরের ডিসেম্বরে খামারগুলো বন্ধ করে দেন। বর্তমানে তিনি বিভিন্ন ব্যাংকে সাড়ে তিন কোটি টাকা ঋণগ্রস্ত হয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। এতকিছুর পরও সরকার ঘোষিত কোনো প্রণোদনা পাননি বলে অভিযোগ করেন আল মামুন।

চরযাত্রা গ্রামের খামারি জাহাঙ্গীর আলম জানান, তার দুটি খামারে তিনটি ঘরে প্রায় তিন হাজার মুরগি ছিল। কিন্তু মুরগির বাচ্চা, ওষুধ, খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি, যাতায়াত ব্যবস্থা ও খামার পরিচালনায় খরচ বেড়ে যাওয়ায় তিন মাস আগে খামার দুটি বন্ধ করে দিয়েছেন। বর্তমানে তিনি এবং তার খামারের চার জন কর্মচারী বেকার অবস্থায় আছেন।চরএলাহী ইউনিয়নের খামারি আরিফুল ইসলাম বলেন, আমাদের পোল্ট্রি শিল্পের বর্তমানে বেহাল অবস্থা। সরকার যদি আমাদেরকে সহজ শর্তে ঋণ দেয় এবং সব কিছুর দাম সহনীয় রাখে তাহলে এ শিল্পের সাথে জড়িতরা আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের তথ্যমতে, জেলার ৯টি উপজেলায় ব্রয়লার এক হাজার ৫২১টি, লেয়ার ১৬৯টি, সোনালী-ফাউমি ১৪৭টি ও টার্কি মুরগির ১০৭টিসহ মোট এক হাজার ৯৪৪টি মুরগি উৎপাদন খামার রয়েছে। যার মধ্যে ব্রয়লারের ৩৪৩টি ও লেয়ারের ৬০টি খামারের নিবন্ধন রয়েছে। তবে এর বাইরে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তৈরি হওয়া আরও মুরগি খামার আছে। জেলায় মাংসের চাহিদা রয়েছে তিন দশমিক ৮৪ লাখ মেট্রিক টন আর উৎপাদন হচ্ছে ৩ দশমিক ৮৯ লাখ মেট্রিক টন। আর ডিমের চাহিদা রয়েছে ৩৩ দশমিক ৯০ কোটি কিন্তু তার বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছে ২৯ দশমিক ৭৩ কোটি। চাহিদা ও উৎপাদনে মাংসের দিক থেকে এগিয়ে থাকলেও খামারগুলোতে ডিম উৎপাদন কম হচ্ছে। বিভিন্ন সমস্যার কারণে কিছু মুরগির খামার প্রতিনিয়ত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আবার এদের মধ্যে কেউ কেউ নতুন করে আবার শুরু করেছেন।

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. শহিদুল ইসলাম আকন্দ জাগো নিউজকে জানান, করোনাকালীন ও তার আগে বিভিন্ন রোগে মুরগি মারা যাওয়ায় কিছু খামারি তাদের খামারগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন। এরমধ্যে কেউ কেউ আবার নতুন করে চালুও করছেন। জেলার ক্ষতিগ্রস্ত ৭৭৮ জন খামারি প্রণোদনার জন্য আবেদন করেছিলেন। যার মধ্যে গত মার্চে ৭৩৬ জনকে ১৬ কোটি ১৭ লাখ ১৫ হাজার টাকা সরকারি প্রণোদনা দেয়া হয়েছে।

তিনি জানান, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ও তালিকার বাইরে ক্ষতিগ্রস্ত যেসব খামারি রয়েছেন উপজেলা পর্যায়ে তাদের তালিকা তৈরি করে প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হবে।এছাড়া মুরগির বাচ্চা, ওষুধ ও খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধির বিষয়টি স্বীকার করে এ কর্মকর্তা বলেন, বাচ্চা, ওষুধ ও খাদ্যের ঊর্ধ্বমুখী বাজার নিয়ন্ত্রণে আমাদের কোনো হস্তক্ষেপ নেই। তবে খামারিদের সুবিধার্থে এসবের বাজার নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মধ্যে রাখা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

এফএ/এএসএম