গাজীপুরের কালীগঞ্জের দক্ষিণ ভাদার্ত্তী গ্রামের চল্লিশোর্ধ্ব জগন্নাথ রবি দাসের বাবা পেশায় ছিলেন চর্মকার। খুব ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও দরিদ্রতার কারণে স্কুলে যাওয়া হয়নি। কিন্তু বাড়িতে বাবার কাছে নিজের নাম লেখাটা শিখেছেন। কালীগঞ্জ থানার প্রাচীর ঘেঁষা সড়কের পাশে ফুটপাতে জুতা পালিশ ও মেরামত করে সংসার চলে তার।
জগন্নাথের তিন ছেলে ও তিন মেয়ে রয়েছে। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি তিনি। তবে মহামারি করোনাভাইরাস তাকে ফেলে দিয়েছে চরম অনিশ্চয়তা ও ঝুঁকির মুখে।
কঠোর লকডাউনের দশম দিনে পেটের তাগিদে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন চর্মকার জগন্নাথ। তবে রাস্তায় জনসমাগম কম থাকায় কাজ নেই বললেই চলে। কখন এক ব্যক্তি এসে বললেন জুতাটা পালিশ বা মেরামত করে দিন, এই আশায় শূন্য দৃষ্টিতে সকাল থেকে পথ চেয়ে রয়েছেন। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় ছোট মেয়েটা বারবার বলে দিয়েছে, ‘বাবা, ফেরার সময় আম আনবে কিন্তু।’
জগন্নাথ রবি দাস জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি দিন আনি দিন খাই। সারাদিনে যা আয় করি তা দিয়ে কোনোরকমে পেটে-ভাতে বেঁচে আছি। আটজনের সংসারে প্রতিদিন অনেক খরচ। লকডাউনের আগে প্রতিদিন জুতা সেলাই ও পলিশ করে ৪০০-৫০০ টাকা আয় হতো। কিন্তু লকডাউনের কারণে আয়-রোজগার একেবারেই নেই। এখন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত মাত্র ৫০-৬০ টাকা কামাই হয়।’
তিনি বলেন, ‘বড় ছেলেটা নরসুন্দরের কাজ শিখছে। বাকিরা সবাই ছোট। লকডাউনের প্রথম তিনদিন এক দোকান থেকে বাকি খেয়েছি। টাকা দিতে না পারায় বাকি দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। এ অবস্থায় আজ তিনদিন ধরে ঘরে রান্না বন্ধ। মুড়ি আর চিড়া খেয়ে কত দিন বাঁচব? বাধ্য হয়ে পেটের দায়ে আজ বের হয়েছি।’
অনেকটা কান্নাজড়িত কণ্ঠে রবি দাস বলেন, ‘পুরোনো এক কাস্টমার আমাকে ভালো জানে বিধায় এমনিতেই একশত টাকা দিয়ে গেছে। কারো কাছে হাত পাততে পারি না, লজ্জা লাগে। এখন শুনলাম আরও সাতদিন কঠোর লকডাউন বাড়ানো হয়েছে। আমি কিভাবে ছেলেমেয়েদের মুখে খাবার তুলে দেব জানি না।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পুরো কালীগঞ্জে এমন জগন্নাথদের সংখ্যা নেহায়েত কম না। লেবু বিক্রেতা আনোয়ার, আখের রস বিক্রেতা ছালাম মিয়ারাও একইভাবে দিনাতিপাত করছেন।
কালীগঞ্জ পৌরমেয়র এস এম রবীন হোসেন জানান, পৌরসভার পক্ষ থেকে প্রথম দফায় এক হাজার ৮০০ কর্মহীন মানুষকে খাদ্য সহায়তার আওতায় আনা হচ্ছে। তারা প্রত্যেকেই ২০ কেজি করে চাল পাবেন। দ্বিতীয় দফায় পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ড থেকে আরও বেশ কিছু মানুষকে বিনামূল্যে খাদ্য সহায়তার দেয়া হবে।
প্রতিটি ওয়ার্ডের ওয়ার্ড কাউন্সিররা তালিকা তৈরি করছেন। প্রথম দফা দু-একদিনের মধ্যে এবং দ্বিতীয় দফা ঈদের আগেই দিয়ে দেয়া হবে বলেও জানান নবনির্বাচিত এই মেয়র।
কালীগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানান, আগামী দু-একদিনের মধ্যে উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের প্রতিটি ইউনিয়নে ৫০০ করে কর্মহীন মানুষকে খাদ্য সহায়তা দেয়া হবে। এই খাদ্য সহায়তার আওতায় সাড়ে তিন হাজার কর্মহীন মানুষ খাদ্য সহায়তা পাবেন। আশা করি এতে তাদের দুর্ভোগ কিছুটা হলেও কমবে।
আব্দুর রহমান আরমান/এসআর/এমকেএইচ