দেশজুড়ে

যশোরে মৎস্য চাষ প্রদর্শনী প্রকল্প, বরাদ্দের অর্ধেকই লুটপাট

যশোরে মৎস্য চাষ প্রযুক্তি সেবা প্রকল্পের (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রদর্শনীর অর্থ ব্যয়ে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রদর্শনীর বরাদ্দের সব টাকা মাছ চাষিদের না দিয়ে মৎস্য কর্মকর্তা নিজের ইচ্ছামতো দর নির্ধারণ করে কেনাকাটা করেছেন। বিশেষ সুবিধাভোগী একই পরিবারের ব্যক্তিদের নিয়ে বেনিফিসায়ারি গ্রুপ (সিবিজি) করা হয়েছে। প্রকল্পে বরাদ্দকৃত চার লাখ ৮৪ টাকার টাকার অর্ধেকের বেশি নয়-ছয়ের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। মৎস্য অফিস সূত্র মতে, গত অর্থ বছরের ৭ এপ্রিল সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর আরডি প্রদর্শনী প্যাকেজে বাঘারপাড়া মৎস্য কর্মকর্তার অনুকূলে প্রশিক্ষণ বাবদে দুই লাখ ৮৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়। সেখানে বিভাজন অনুযায়ী উপজেলার নয় জন মৎস্য চাষিকে কার্প নার্সারি, মিশ্র চাষ, পাবদা, মনোসেক্স, পাঙ্গাস, কৈ মাছের প্রদর্শনী দেওয়া হয়েছে। এছাড়া একটি গ্রুপের পুকুর স্থাপন প্রদর্শনী কার্যক্রমের জন্য দেওয়া হয় আরও দুই লাখ টাকার।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, প্রদর্শনীর সব কেনাকাটা মৎস্য কর্মকর্তা নিজেই তার ইচ্ছামতো সেরেছেন। বাঁকড়ি এলাকার তিন ব্যক্তির দরপত্রের কাগজ জোগাড় করে খাতা কলম ঠিক রেখে মাছের দর ও খাদ্য নির্ধারণ করেছেন কর্মকর্তা। এমকি জুনের আগেই সব বিল উত্তোলন করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কথা হয় প্রদর্শনীর অন্তত চার জন চাষির সঙ্গে। তারা অভিযোগ করেন, প্রদর্শনীর বরাদ্দের সব টাকা তাদের দেওয়া হয়নি। বেশির ভাগ কেনাকাটা মৎস্য কর্মকর্তা নিজেই করেছেন। গত ১৫ জুন উপজেলা পরিষদ চত্বরে মাছ চাষিদের মাঝে মৎস্য উপকরণ বিতরণ করে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়। এসব বরাদ্দ থেকে তাদের প্রত্যেককে ১০-১৫ হাজার টাকা কম দেওয়া হয়েছে।

এদিকে বেনিফিসায়ারি গ্রুপ (সিবিজি) দেওয়া হয়েছে বিশেষ সুবিধাভোগী একই পরিবারের ব্যক্তিদের মাঝে। এ গ্রুপ নিয়ে এলাকাবাসী হতবাক হয়েছে। স্বামী, স্ত্রী, ভাইয়ের স্ত্রী, চাচাতো ভাই, ভাগনি জামাই মিলে ২০ সদস্যের গ্রুপ করা হয়েছে। গ্রুপটি নদীর জায়গা দখল করে পুকুর বানিয়ে সরকারের সুবিধা ভোগ করছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বাসুয়াড়ি ইউনিয়ন খলিলপুর গ্রামে মৃত বাবু খানের তিন ছেলে রুহুল আমিন খান সভাপতি, মোশারেফ হোসেন খান সাধারণ সম্পাদক, আব্দুল খান কোষাধ্যক্ষ। সদস্য রাখা হয়েছে, একই পরিবারের ইসাহাক আলী খান, মৃত গফুর খানের স্ত্রী ফাতেমা বেগম, আব্দুল খানের স্ত্রী তহমিনা বেগম, মোশারেফ হোসেন খানের স্ত্রী নিহরুন নেছা, সেলিনা খাতুন, শাহানারা খাতুন, রিজাউল খান, জাহিদুল ইসলাম, শরিফুল ইসলাম ও রিপন হোসেন। অন্য সদস্যরা মাছ চাষের সঙ্গে যুক্ত নয় বলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন। এরপরেও মৎস্য কর্মকর্তা ওই ব্যক্তিদের নিজস্ব পুকুরে মৎস্য চাষ করে আসছেন এবং সবাই সফল মৎস্য চাষি উল্লেখ্য করে প্রত্যয়নপত্র দিয়েছেন। প্রকল্পের দুই অংশ মিলে দুই লক্ষাধিক টাকা আত্মসাতের অভিযোগ চাষিদের।

বেনিফিসায়ারি গ্রুপ (সিবিজি) সভাপতি রুহুল আমিন খান সাংবাদিকদের বলেন, তার দুই একর পুকুরে প্রদর্শনী হিসেবে মাছ চাষের জন্য দুই লাখ টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তাকে চার হাজার পিস নাইলোটিকা মাছের পোনা ও ১০ ব্যাগ খাদ্য দেওয়া হয়েছে। যার বাজার মূল্য ২০ হাজার টাকা। আপনার পরিবারের প্রায় সব সদস্য গ্রুপে কেন রেখেছেন প্রশ্ন করলে তিনি জানান, বোঝেন তো! টাকা ছাড়া কিছুই হয় না। মৎস্য কর্মকর্তাকে টাকা দিয়েছেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকা না দিলে হয় না কি!

মনোসেক্স তেলাপিয়া প্রদর্শনী চাষি মালঞ্চি গ্রামের সেকেন্দার আলী জানান, তার নামে ৪৩ শতক পুকুরে প্রদর্শনী হিসেবে তেলাপিয়া মাছ চাষের জন্য ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১০ হাজার পিস মাছের পোনা পেয়েছি। যার বাজার মূল্য ছয় থেকে ১০ হাজার টাকা। এর সঙ্গে উপজেলা থেকে প্রথমে পাঁচ বস্তা ও বাঁকড়ি থেকে পাঁচ বস্তা মাছের খাবার পেয়েছি।

মহিরন গ্রামের নিতাই বিশ্বাসের ৩৩ শতক পুকুরে পাবদা প্রদর্শনী চাষে ৫০ হাজার টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তিনি পেয়েছেন মাছের পোনা কেনার জন্য ১৫ হাজার টাকা ও নয় বস্তা খাদ্য। সব মিলিয়ে তাকে দেওয়া হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার টাকার উপকরণ। বাকি টাকা কি হয়েছে তিনি জানেন না।

অভিযোগের বিষয়ে বাঘারপাড়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা পলাশ বালা বলেন, নিয়ম মেনেই সমিতিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রদর্শনী দেওয়া চাষিদের টাকা কম দেওয়া হয়নি। একই পরিবারকে নিয়ে সিবিজি গ্রুপ ও নদীর জায়গা দখল করে পুকুর বানিয়ে সুবিধা নেওয়ার বিষয় আমার জানা ছিল না। কারোর কাছ কোনো প্রকার অনৈতিক সুবিধা নেওয়া হয়নি।

যশোর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনিছুর রহমান বলেন, অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ তদন্ত করা হবে। সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মিলন রহমান/আরএইচ/এমকেএইচ