দিনাজপুরের হাকিমপুর (হিলি) উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ডাঙ্গাপাড়া রেলস্টেশন। স্টেশনটি প্রায় ২০ বছর ধরে পরিত্যাক্ত রয়েছে। এ কারণেই লাইনের দুই পাশে গড়ে উঠেছে অসহায় ছিন্নমূল মানুষের বসতি।
বস্তিটি ঘুরে দেখা যায়, টিন আর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘেরা ছোট ছোট ঘর। প্রায় ২০ থেকে ৩০ বছর যাবৎ এই ভূমিহীন পরিবারগুলো এখানে বসবাস করে আসছে। এখানে বসবাসকারী বেশিরভাগ নারীই বিধবা কিংবা স্বামী পরিত্যাক্তা। নিজস্ব ঘরবাড়ি না থাকায় এই স্থানকেই মাথা গোজার ঠাঁই হিসেবে বেছে নিয়েছেন তারা। চানাচুর কিংবা বিড়ি কারখানা ও দিনমজুরির কাজ করে ছেলে-মেয়েদের লেখাপড়াসহ সংসারের ভার মেটাচ্ছেন তারা।
একই স্থানে লাইনের পাশে বসবাস করছে হরিজন সম্প্রদায়ের ৮টি পরিবার। ঝড়, বৃষ্টি, তীব্র শীত কিংবা গরম, সব সহ্য করেই বসবাস করছেন তারা।
কথা হয় ৪০ বছর বয়সী ফজিলা বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, আমার দুই ছেলে এক মেয়ে। স্বামী মারা গেছেন ৬ বছর আগে। অনেক কষ্টে মেয়েকে বিয়ে দিয়েছি, ছোট ছেলে স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করে আর বড় ছেলে বাকপ্রতিবন্ধী। ছেলের প্রতিবন্ধী ভাতার কার্ডও হয়নি। স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে স্থানীয় একটি বিড়ি কারখানায় বিড়ি তৈরির কাজ করে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে কোনোমতে চলছি। বিধবা ভাতার কার্ডও পাইনি। সরকার যদি আমাকে একটা ঘর দিত তাহলে সন্তানদের নিয়ে নিরাপদে থাকতে পারতাম।
বিধবা আফেলা বলেন, স্বামী মারা গেছে অনেক আগে। তিন মেয়ে এক ছেলে। অনেক কষ্ট করে বাচ্চাদের বড় করেছি। স্বামীর ভিটেবাড়ি নেই, তাই নিরুপায় হয়ে রেলের জায়গায় বসবাস করছি। এখানে ট্রেনের শব্দ আর শীত, ঝড়-বৃষ্টি সহ্য করে ছেলে-মেয়েরা লেখাপড়া করে। সরকারি ঘর পেলে অনেক উপকৃত হতাম।
ষাটোর্ধ্ব কালাম মিয়া বলেন, প্রায় ৩২ বছর ধরে এই রেললাইনের ধারে ছেলে, ছেলের বউ, নাতি আর স্ত্রীকে নিয়ে আছি। সরকারের দিকে তাকিয়ে আছি, যদি ঘর পাই তাহলে শেষ বয়সে ভালোই হবে।
হরিজন গোষ্ঠির লাকি মার্ডি বলেন, বিপদে পড়ে এখানে বসবাস করছি। আমরা রেললাইনে আছি বলে কেউ আমাদের খোঁজ-খবর নেয় না। সরকার যদি আমাদের জন্য একটা গুচ্ছগ্রাম তৈরি করে দিতো তাহলে ছেলে-মেয়ে ও পরিজনদের নিয়ে ভালো থাকতে পারতাম।
জানতে চাইলে স্থানীয় ১নং খট্টা-মাধবপাড় ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান মোখলেছুর রহমান বলেন, রেললাইনের পাশে বসবাসরত বিধবা, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের ভাতার কার্ডের জন্য কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে ভাতাভোগীরা সুবিধা পাবেন।
হাকিমপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ নুর এ আলম বলেন, হিলির ডাঙ্গাপাড়া রেলস্টেশনে দীর্ঘদিন যাবৎ কিছু পরিবার বসবাস করছে। উপজেলায় 'ক' তালিকায় ২৫৬টি সরকারি ঘর তৈরি করা হয়েছে। এই তালিকায় যদি তাদের নাম থাকে তাহলে তাদের ঘর দেওয়া হবে। আর যদি না থাকে তাহলে আগামীতে তাদের জন্য ঘর বরাদ্দের ব্যবস্থা করা হবে।
এফএ/এএসএম