বয়সের ভারে ন্যুব্জ ছকিনা বেগম। ভোটার আইডি কার্ডের বয়স অনুযায়ী তার বয়স ৭১ বছর। বার্ধক্যজনিত নানা রোগে আক্রান্ত তিনি। ওষুধ কেনা তো দূরের কথা দু’বেলা খাবার জোটে না তার। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বার বার গিয়েও একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড পাননি তিনি।
ছকিনা বেগম কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার ভোগডাঙ্গা ইউনিয়নের চরবড়াইবাড়ী গ্রামের মৃত ছাবের উদ্দিনের মেয়ে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া জমিতে পুরোনো টিন জোড়াতালি দিয়ে বসবাস করছেন তিনি। ঘরের সামনে-পেছনে জোড়াতালি দেওয়া টিনের বেড়া থাকলেও অন্য দু’পাশে বাঁশের বেড়া। একটি চৌকিতে আসবাবপত্রসহ কোনোমতে রাত কাটান তিনি। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে তার ব্যবহৃত পোশাক।
স্থানীয়রা জানান, দশ বছর বয়সে যাত্রাপুর ইউনিয়নের সামান্দর চর এলাকার মৃত সাহাবুদ্দির ছেলে মৃত মোসলেম সরদারের সঙ্গে বিয়ে হয় ছকিনা বেগমের। বিয়ের পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হওয়ায় কলহ শুরু হয়। এর মধ্যে কোনো সন্তানও জন্মায়নি তাদের সংসারে। আট বছর সংসার করার পর বিচ্ছেদ হয় তাদের। এরপর থেকে ছকিনা বাবার বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। কয়েক বছরের মাথায় বন্যায় বাবার বাড়ি ছেড়ে একই উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের বড়াইবাড়ী গ্রামের এক ব্যক্তির বাড়িতে আশ্রয় নেন ছকিনা। পুনরায় পৈতৃক ভিটায় এসে বসবাস শুরু করেন তিনি। কিন্তু স্বামী-সন্তানহীন ছকিনার যেন দুঃখের শেষ নেই। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে ছাগল ও ভেড়া বর্গা নিয়ে লালন পালন করেন।
বয়সের ভারে নুইয়ে পরা ছকিনার তিনবেলা খাবারই জোটে না। কখনো অনাহারে, কখনো অর্ধাহারে দিন কাটে তার। পান না কোনো সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা। বয়স্ক ভাতার যোগ্য হলেও জনপ্রতিনিধিদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও সেটি পাননি।
প্রতিবেশী কোব্বাদ বলেন, খেতে না পেরে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়েছেন ছকিনা। শারীরিকভাবে দুর্বল হওয়ায় পরিশ্রম করা তার পক্ষে কঠিন। কেউ তাকে সহায়তা দেন না। নিরূপায় হয়ে এলাকাবাসীর কাছে হাত পাততে হয় তার। তার একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড হলে ভালো হয়।
ছকিনার বড় বোন ঝুনকি বলেন, বিয়ের পর স্বামীর সঙ্গে বনিবনা না হওয়ায় বাড়িতে নিয়ে আসি তাকে। এরপর থেকে শুরু হয় ছকিনার কষ্টের জীবন। আমরাও ঠিকমতো খেতে পারি না। কিন্তু ছকিনা আমাদের থেকেও বড় অভাবী।
এ বিষয়ে ছকিনা বেগম বলেন, খেয়ে না খেয়ে পড়ে থাকি। কেউ খবর নেয় না। কেউ একটা বয়স্ক ভাতার কার্ডও দেয় না। শেষ বয়সে একটা বয়স্ক ভাতার কার্ড থাকলে স্বামী সন্তানহীন জীবনে একটু ভরসা পেতাম।
তিনি বলেন, তিনদিন ধরে ধারদেনা করে চলছি। গতকাল সন্ধ্যায় প্রতিবেশীর বাড়িতে গিয়ে ভাত খেয়েছি। অসুস্থ শরীরে রোজা রাখতে পারি না। রাতে এলাকাবাসীর কাছ থেকে চাল ধারদেনা করে এনে লবণ দিয়ে খেতে হবে।
এ বিষয়ে হলোখানা ইউনিয়ন পরিষদের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) গোলজার হোসেন বলেন, আমি নবনির্বাচিত ইউপি সদস্য। পূর্বের ইউপি সদস্য কী করেছেন তা জানি না। গত মার্চ মাসের ২২ তারিখ বয়স্ক ভাতার তালিকা হয়েছে। ওই বৃদ্ধার খোঁজ নিয়ে আগামী বরাদ্দে বয়স্ক ভাতার কার্ডের ব্যবস্থা করব।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা এস এম হাবিবুর রহমান বলেন, ওই বৃদ্ধাকে অনলাইনে আবেদন করতে বলেন। আবেদনের কপি দিলে হবে। আর কোথাও যেতে হবে না আমি নিজেই উনার বয়স্ক ভাতার ব্যবস্থা করব।
মাসুদ রানা/আরএইচ/এএসএম