ফরিদপুরে হঠাৎ পেঁয়াজের দাম বেড়ে গেছে। জেলা-উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রতিদিনই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। এপ্রিল মাসের শেষ দিকেও যে পেঁয়াজ বিক্রি করতে হতো প্রতি মণ ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায়, মাত্র ১০ থেকে ১৫ দিনের ব্যবধানে সেই পেঁয়াজ পাইকারি বাজারে প্রতি মণ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি পেঁয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৩৬ থেকে ৩৭ টাকা।
কৃষকদের ভাষ্য, পেঁয়াজ মৌসুমের শেষ দিক পর্যন্ত সংরক্ষণের জায়গার অভাব, শ্রমিকদের মজুরি ও সাংসারিক খরচ মেটাতে তাৎক্ষণিক কম দামে তাদের পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়েছে। এই সময় তারা লাভবান হতে পারেন না। পরে দাম বাড়লেও এর সুফল পান ফড়িয়া ও মধ্যস্বত্বভোগীরা। আমদানি বন্ধের কারণে প্রতি মণ পেঁয়াজে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দাম বেড়েছে। এতে তারা লাভের মুখ দেখছেন।
জেলার বেশ কয়েকটি উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজার ও দোকান ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে প্রতি মণ পেঁয়াজ ১ হাজার ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ গত কয়েকদিন আগেও এর দাম ছিল প্রতি মণ সর্বোচ্চ ৮০০ টাকা। ভারত থেকে আমদানি বন্ধের কারণে হঠাৎ দাম বেড়েছে বলে ব্যবসায়ীদের দাবি।
নগরকান্দা উপজেলার কৃষক উসমান তালুকদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন প্রতি মণ পেঁয়াজ ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ আগে এই পেঁয়াজ ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি করেছি। কয়েকদিনের ব্যবধানে এখন দাম বেড়ে দ্বিগুণ।’
তিনি বলেন, ‘মূল্যবৃদ্ধি পাওয়ায় বেশ কয়েক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছি। তবে ভাব ভালো মনে হচ্ছে না। সামনে মনে হচ্ছে গতবারের মতো অসাধু ব্যবসায়ীরা বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অস্বাভাবিক দাম হাঁকাবে।’
ভাঙ্গা উপজেলার বাসিন্দা সোহাগ মাতুব্বর জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রতিদিনই পেঁয়াজের দাম বাড়ছে। দাম বেশি পাওয়ায় কৃষকরা পেঁয়াজ ছেড়ে দিচ্ছে (বিক্রি করে দিচ্ছেন)।’
ফরিদপুরে পেঁয়াজের রাজধানী খ্যাত সালথা উপজেলার গট্টি ইউনিয়নের কালীতলা গ্রামের বাসিন্দা আলিম শেখ। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘প্রথমে আমরা প্রতি মণ পেঁয়াজে ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা দাম পেয়েছি। এতে খরচই উঠতো না। এখন দাম বাড়ছে। আমাদের জন্য ১ হাজার ২০০ টাকা মণ হলে ভালো হয়।’
কানাইপুরের বাদশা মিয়া বলেন, ‘হঠাৎ পেঁয়াজের বাজার অস্থির। প্রতিদিনই লাফিয়ে লাফিয়ে দাম বাড়ছে। গত কয়েকদিনে মূল্য বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। মনে হচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি চলছে।’
মধুখালী উপজেলা সদরের পাইকারি বাজারের বড় ব্যবসায়ী মো. আলম জাগো নিউজকে জানান, ফরিদপুরে এবার পেঁয়াজের উচ্চ ফলন হয়েছে। কৃষকের ঘরে পর্যাপ্ত পেঁয়াজ আছে। আমদানি বন্ধের কারণ ছাড়াও সাধারণ কৃষকরা বাজারে কম পেঁয়াজ তুলছেন, যে কারণে কয়েকদিনের ব্যবধানে প্রতি মণে ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা দাম বেড়েছে। বর্তমানে বাজার ভালো। কৃষকরা এই মূল্যটা পেয়ে খুশি। অন্যবারের মতো এবার পেঁয়াজ নিয়ে কারসাজি করার সুযোগ নেই।
তবে সয়াবিন তেলের পর পেঁয়াজ নিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ফরিদপুরের সভাপতি শেখ ফয়েজ আহমেদ। এজন্য প্রশাসনের সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সোহেল শেখ জাগো নিউজকে বলেন, পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। তবে অবৈধভাবে মজুতদারি, বাজারে সংকট সৃষ্টি করে অধিক মুনাফালোভী ব্যবসায়ীদের প্রতি আমাদের কঠোর নজরদারি রয়েছে। আমাদের পক্ষ থেকে প্রতিদিনই বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। এ বিষয়ে আমরা সজাগ আছি।
বোয়ালমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজাউল করিম জাগো নিউজকে বলেন, নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। কারসাজি ও অনিয়মের প্রমাণ পেলেই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
এ বিষয়ে ফরিদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা লিটন ঢালী বলেন, জেলা প্রশাসকের নির্দেশে নিয়মিত বাজার মনিটরিং করা হচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হচ্ছে। অভিযান অব্যাহত থাকবে।
ফরিদপুরের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. হজরত আলী জাগো নিউজকে বলেন, এ বছর আবহাওয়া পেঁয়াজ চাষের জন্য ভালো ছিল। ফরিদপুরে পেঁয়াজের উৎপাদন খুবই ভালো হয়েছে। এবার জেলায় পেঁয়াজ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার ৩৬০ হেক্টর। সেখানে ৪০ হাজার ৭৯ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে।
তিনি বলেন, বাজারদরের বিষয়টি আমাদের হাতে নেই। বর্তমানে পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। এ রকম দাম থাকলেও কৃষক ও সাধারণ মানুষ খুশি থাকার কথা। কিন্তু কারসাজি করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারী, অবৈধভাবে অধিক মুনাফালোভীদের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজরদারি বাড়াতে হবে।
এসআর/জিকেএস