দেশজুড়ে

সুনাম কুড়াচ্ছে জাহাপুরের লিচু

গ্রামের নাম জাহাপুর। ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার একটি গ্রাম। গ্রামটি লিচুর জন্য বিখ্যাত। অনেকের কাছে তাই ‘লিচু গ্রাম’ নামেও পরিচিত। জাহাজপুরের লিচু জেলার চাহিদা মিটিয়ে বাজারে বেশ সুনাম কুড়াচ্ছে। খেতে সুস্বাদুও। তাই ক্রেতারা লুফে নিচ্ছেন এ এলাকার লিচু।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার জাহাপুর ইউনিয়নের জাহাপুর গ্রামের প্রায় মানুষেরই লিচুর বাগান রয়েছে। অন্য ফসল উৎপাদন ছেড়ে দিয়ে এ গ্রামের সবাই লিচু চাষে ঝুঁকেছেন। লিচুগাছ-বাগান নেই, এমন একটিও বাড়ি যেন খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রতিটি বাড়ি কিংবা জমিতে রোপণ করা হয়েছে লিচুগাছ। প্রায় ২০ বছরের মধ্যে এ ইউনিয়নে লিচুর আবাদ ব্যপক হারে বেড়েছে।

জাহাপুর ইউনিয়নের জাহাপুর, দপ্তরদিয়া, টেংরাকন্দি, মনোহরদিয়া, চর মনোহরদিয়া, খাড়াকান্দি ও মির্জাকান্দি গ্রাম এবং পাশের ফরিদপুর সদরের চাঁদপুর ইউনিয়নের চাঁদপুর ও চতরবাজার কান্দি গ্রামে লিচুর আবাদ বেশি হয়। বিভিন্ন জাতের লিচু বাগান থাকলেও মোজাফফরপুরী জাতের লিচুর চাষ এখানে বেশি। এ জাতের ১০০ লিচু ২২০ টাকা থেকে ২৫০ টাকা, বোম্বাই জাতের ১০০ লিচু ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা এবং চায়না থ্রি জাতের লিচু ৩৮০ থেকে ৪০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।

একাধিক লিচুবাগান মালিক জানান, অন্য চাষাবাদে বর্তমানে শ্রমিকের দামসহ বিভিন্ন উপকরণের মূল্য বৃদ্ধির কারণে এবং লাভজনক হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে লিচু চাষের প্রতি এ এলাকার চাষিদের আগ্রহ বেড়েছে।

জাহাপুর গ্রামে আবদুস সাত্তার শেখের লিচুবাগানটি এলাকার সবচেয়ে বড়। এ বাগানে গাছের সংখ্যা ১৩০টি।

আবদুস সাত্তার শেখ বলেন, জাহাপুরে প্রায় ৩০০ বছর আগে এক জমিদার পরিবারের উদ্যোগে ভারতের মাদ্রাজ থেকে গাছ এনে প্রথম লিচু বাগান করা হয়। পরে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাগানের গাছগুলোও কাটা পড়ে। আমিই ৫৪ বছর আগে ওই জমিদারের আমলের বেঁচে যাওয়া লিচুগাছ কিনে নিয়ে জাহাপুরে বাগান করি। এখন আমার বাগানে অন্তত ৩০০ বছরের পুরোনো মোজাফফরপুরী জাতের একটি লিচুগাছ রয়েছে। পরের গাছগুলো ওই গাছ থেকে কলম করা।

সত্তারের বাগানে লিচু কিনতে আসেন স্থানীয় ফল ব্যবসায়ী রাজু মোল্লা। তিনি বলেন, লিচুর সময় দিনাজপুর, রাজশাহী, ঈশ্বরদী কিংবা ইছাখাদা এমন কোনো জায়গা নেই, যে জায়গার লিচু আমি বিক্রি করিনি। অন্য অঞ্চলে বড় আকারের মিষ্টি লিচু পাওয়া গেলেও জাহাপুরের লিচুর কিছু স্বকীয় বৈশিষ্ট্য আছে। এ লিচুর রং ভালো, মান ভালো, খেতে সুস্বাদু, দামও সহনশীল। এ জায়গার লিচু পাকে আগে। গত ঈদুল ফিতরের সময় থেকেই বাজারজাত করা যাচ্ছে জাহাপুরের লিচু।

সাত্তার শেখের দেখাদেখি এলাকার সুলতান আহমেদ, শাহজাহান মোল্লা, বজলু মল্লিক ফসল আবাদ বাদ দিয়ে লিচু চাষে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। তারাও লিচুর বাগান গড়ে তোলেন।

এলাকার আশরাফ আহমেদের লিচুবাগানে ৭০টি গাছ রয়েছে। তিন বছরের জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকায় ওই বাগান ইজারা নিয়েছেন জাহাপুর এলাকার বাসিন্দা রিয়াজ মিয়া (৩৪)। তিনি বলেন, চলতি বছর ফলন কম। তবে আগামী বছর পুষিয়ে যাবে। বর্তমানে শ্রমিকের অনেক মূল্য, তাই নিজের পরিবার-পরিজন নিয়ে উৎসবের সঙ্গে কাজ করছি।

লিচু চাষি ও বিক্রেতা রাজ্জাক মল্লিক (৬৩) বলেন, জাহাপুরের লিচুর মান ভালো। দেশে সুনাম আছে। এখানকার লিচু ফরিদপুর ও এর আশপাশের জেলা ছাড়াও ঢাকায় পাঠানো হয়। ভালো কদর পায়।

জাহাপুরের লিচু চাষি খবির চৌধুরী বলেন, জাহাপুরের লিচু বিক্রি প্রায় শেষের দিকে। এখানকার লিচু সুস্বাদু। তাই চাহিদা বেশি। মাজকান্দি-ভাটিয়াপাড়া আঞ্চলিক মহাসড়কে পাশে প্রতিদিন এলাকার লিচু চাষিরা ঝুড়ি ভরে লিচু বিক্রি করে থাকেন।পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানের পাইকারি বিক্রেতারা এসে লিচু কিনে নিয়ে যান।

জাহাপুরের দস্তুরদিয়া গ্রামের শফিকুর রহমান শফিক বলেন, জাহাপুরে প্রায় আড়াইশ পরিবারের প্রত্যেকেই লিচু চাষি। প্রত্যেক পরিবারেরই ছোট-বড় লিচু বাগান রয়েছে। এখানকার লিচুর কদরও বেশ।

এ বিষয়ে জাহাপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. শামসুল ইসলাম বাচ্চু জাগো নিউজকে বলেন, জাহাপুর গ্রামটি এখন লিচু গ্রাম হিসেবে পরিচিত। জাহাপুর গ্রাম ছাড়াও আশপাশ গ্রাম মিলে অত্র এলাকায় প্রায় কয়েকশ একর জমিতে লিচু চাষ হয়। এখানকার লিচুর কদর ও সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে।

মধুখালী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আলভীর রহমান বলেন, এ উপজেলায় ২৬ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়। প্রতি হেক্টরে ৯ টন লিচু উৎপাদন হয়ে থাকে। প্রতি কেজি ২০০ টাকা করে বিক্রি হলে কৃষকদের সাড়ে ৪ কোটি টাকার বেশি আয় হবে।

এ বিষয়ে ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ ড. মো. হযরত আলী জাগো নিউজকে বলেন, জেলার মধ্যে মধুখালী ছাড়াও বোয়ালমারী ও ফরিদপুর সদরে চানপুরে লিচুর বাণিজ্যিক আবাদ হচ্ছে। তবে জেলায় মোট কী পরিমাণ জমিতে লিচুর আবাদ এবং উৎপাদন হয় এ পরিসংখ্যান এখন পর্যন্ত আমাদের হাতে নাই।

এসজে/এএসএম