কান্নার স্বাধীনতাও পাইনি

আমানউল্লাহ আমান
আমানউল্লাহ আমান আমানউল্লাহ আমান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৩:৪৯ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০১৭

‘আমার মা তখন বাবার লাশের পাশে বসেছিলেন। কাঁদতে পারেননি। কী নির্মম! কী নিষ্ঠুর! এখনও ভাবতে পারি না বিষয়টা! বাবার লাশ সামনে অথচ কান্নার স্বাধীনতাটুকুও নেই।’

বাবা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দিন আহমেদের মরদেহ নিয়ে নির্মম স্মৃতি জাগো নিউজ’র কাছে ব্যক্ত করেন তার দ্বিতীয় মেয়ে আফরোজা জামিল কঙ্কা।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জামিল উদ্দিন আহমেদ কর্নেল জামিল নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। মুক্তিযোদ্ধা বীর উত্তম জামিল উদ্দিন ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামরিক সচিব ছিলেন।

jamil

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামরিক সচিব হিসেবে কর্তব্যরত অবস্থায় নিহত হন জামিল। (যদিও ১৫ আগস্টের আগেই কর্নেল জামিলকে ডিএফআইতে (বর্তমানে ডিজিএফআই) বদলি করা হয়। কিন্তু তিনি সেখানে যোগ দেননি।)

মানুষ হিসেবে বাবা সৎ ও চমৎকার ছিলেন। মায়ের ভাষায়, বাবা ভালো স্বামীও ছিলেন। আর আমরা (মেয়েরা) ছিলাম বাবার প্রাণ। সেনাবাহিনীতে এমন কেউ নেই যিনি বাবার সহযোগিতা পাননি। বাবা খুব ভালো রবীন্দ্র সঙ্গীত গাইতেন, মাও। বাবার প্রিয় গান ছিল, যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে...।

bangabondhu১৫ আগস্টের ঘটনা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে কঙ্কা বলেন, ভোর ৫টার কিছুক্ষণ আগে ফোন আসে। তখন বাসার সবাই গভীর ঘুমে। ফোনের আওয়াজে মা ও বাবার ঘুম ভেঙে যায়। মা আনজুমান আরা জামিল ফোন রিসিভ করেন।

‘ফোনের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে থাকেন বাবা। বাবা ও মায়ের কথাবার্তায় আমারও ঘুম ভেঙে যায়। তখন পাশের ঘর থেকে তাদের কথাবার্তা শুনি। মা বাবাকে বললেন, এই সময়ে তুমি যাবে? বাবা মাকে বিরক্তির সুরে বলেন, কী বলো তুমি! বঙ্গবন্ধু বিপদে পড়েছেন, আমাকে ডেকেছেন আর আমি যাব না? বাবা কিন্তু তখন ডিএফআইতে (বর্তমানে ডিজিএফআই) কর্মরত ছিলেন। উনি না গেলেও পারতেন, তবে দেশের প্রয়োজনে, বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সুসম্পর্ক থাকায় তিনি ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন। সেই ঘরে আর বাবার পায়ের চিহ্ন পড়েনি কখনও।’

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের স্মৃতিচারণ করেত গিয়ে আফরোজা জামিল কঙ্কা আরও বলেন, আমার বয়স তখন ১২ কিংবা ১৩ হবে। সেদিন দুপুরের দিকে জেনারেল সফিউল্লাহ চাচা মাকে ফোন করে বললেন, ভাবি সম্ভবত ভাই আর নেই। উনি পুরোটা আর বলতে পারলেন না। তখন আমরা গণভবনের ভেতরে থাকতাম। একজন সেনা কর্মকর্তা ও কিছু সেনা সদস্য আমাদের গাড়িতে করে লালমাটিয়ায় আমার চাচার বাসায় নিয়ে গেলেন। এরপর সেনা কর্মকর্তারা দফায় দফায় বৈঠক করে রাত প্রায় ১১টার দিকে আমার চাচার বাসায় বাবার লাশ নিয়ে এলেন। আমি চাচার বাসার ওপর থেকে কিভাবে নিচে নেমে এলাম বলতে পারব না। গাড়ির ভেতরে বাবার নিথর দেহটি শোয়ানো। পা দুটো গাড়ির জানালা দিয়ে বের হয়ে আছে। সেখানে গিয়ে বাবার পায়ে হাত রাখতেই বুঝলাম, আমার বাবা আর নেই। (কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন আফরোজা জামিল)।

বাবার স্মৃতিচারণ করে চোখের পানি যেন থামাতে পারছিলেন না আফরোজা জামিল কঙ্কা। অথচ বাবার লাশ নিয়ে সেদিন কাঁদতেও দেয়া হয়নি তার আদরের মেয়েদের। সেদিনের ভয়ঙ্কর স্মৃতি আজও তাড়িত করে তার মেয়েদের।

কঙ্কা আরও বলেন, লালমাটিয়া থেকে বাবার লাশ তার সহকর্মী ও ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ চাচার বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। ওখানেই গোসল করানো হয়। পরে আমাদের ডাকা হয় বাবার লাশ দেখানোর জন্য। তখন সেনা সদস্যরা বাবার লাশ ঘিরে রেখেছিল। আমাদের বলা হয়েছিল, কেউ কাঁদতে পারবেন না। আমরা সবাই গেলাম। আমার মা তখন বাবার লাশের পাশে বসেছিলেন। কাঁদতে পারেননি। কী নির্মম! কী নিষ্ঠুর! এখনও ভাবতে পারি না বিষয়টা! বাবার লাশ সামনে অথচ কান্নার স্বাধীনতাটুকু নেই!

jamilআমার বড় বোন চিৎকার করে কেঁদে ফেলল। বড় আপাকে সবাই ধরে বাড়ির ভেতরে নিয়ে যায়। রাত প্রায় ১২টার পর বাবার লাশ বনানীতে সেনাবাহিনীর কবরস্থানে দাফন করা হয়।

বাবার সঙ্গে কাটানো সেই দিনগুলো এখনও খুব মনে পরে কঙ্কার। বাবাই তার হাতে তুলে দিয়েছিলেন রঙ-তুলি। সেই রঙ তুলিতে আকা ছবিগুলো এখনও খুঁজে ফেরে বাবাকে।

কঙ্কা বলেন, সেনা কর্মকর্তা হলেও বাবা দায়িত্বের বাইরে যতটুকু সময় পেতেন আমাদের দিতেন। সব সময় খুব হাসিখুশি থাকতেন। রবিবার ছুটির দিনে সকাল বেলায় মা মজার মজার নাস্তা বানাতেন। সবাই মিলে নাস্তা খেয়ে বাবার সঙ্গে আমাদের নিশান প্রিন্স গাড়ি পরিষ্কার করতাম। বাবা যখন কাজে ব্যস্ত থাকতেন তখন মাঝেমধ্যে আমাকে বলতেন, মা আমার পিঠটা চুলকে দাও তো। তখন আমি নখ দিয়ে বাবার পিঠে বিভিন্ন ছবি আঁকতাম আর জিজ্ঞাসা করতাম, বলো এটা কিসের ছবি? ওই মুহূর্তগুলো খুব মনে পড়ে। বাবাকে হারালেও এখনও বাবার আদর্শ নিয়েই পথ চলার চেষ্টা করছি।

বাবার কাছ থেকে পাওয়া দায়িত্বশীলতা ও নিষ্ঠার শিক্ষা নিয়েই জীবনের পথচলার পাথেয় নির্ধারণ করেছেন আফরোজা জামিল কঙ্কা। তিনি বলেন, আমি একজন চিত্রশিল্পী। বাবা প্রায়ই বলতেন, আমার মেয়েকে আমি প্যারিসে পাঠাব।

তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে তেমন কোনো সহযোগিতা না পেলেও তাতে খুব বেশি আক্ষেপ নেই জামিলকন্যার। তার মতে, শহীদ পরিবার হিসেবে আমরা কিছুই পাইনি। আমার মা একজন সেনা কর্মকর্তার স্ত্রী থেকে পরে ব্যবসায়ী হয়েছিলেন। মা ১৯৯৬ সালে বৃহত্তর কুষ্টিয়ার সংসদ সদস্য ছিলেন। মা আমাদের চার বোনকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। নিজের জন্য কিছুই চাওয়ার ছিল না তার।

নির্মম ওই হত্যাকাণ্ডের যে বিচার হয়েছে, তাতে আমরা সন্তুষ্ট। তবে সবার দণ্ড এখনও নিশ্চিত করা যায়নি। দণ্ডপ্রাপ্ত যারা এখনও বিভিন্ন দেশে পালিয়ে আছে তাদের দ্রুত ফিরিয়ে এনে দণ্ড কার্যকর করা হোক- এটাই আমাদের শেষ চাওয়া।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাবাকে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে বীর উত্তম উপাধিতে ভূষিত করেছেন। এজন্য আমরা কৃতজ্ঞ।

কর্নেল জামিল ও আনজুমান আরা জামিলে সংসারে চার মেয়ে। বড় মেয়ে তাহমিনা এনায়েত ঢাকায় থাকেন। তিনি পেশায় ব্যবসায়ী। দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে সংসার তার। আফরোজা জামিল কঙ্কা চিত্রশিল্পী। দুই ছেলে ও স্বামীর সংসার নিয়ে খুব সুখেই আছেন। সেজ মেয়ে ফাহমিদা আহমেদ আমেরিকায় থাকেন। সেখানে ব্যবসা করছেন। সবার ছোট ক্যারিশমা জামিল দেশেই থাকেন। তিনিও পেশায় আর্টিস্ট। এক মেয়ে নিয়ে তার দিনগুলো ভালোই কাটছে।

বর্তমান সরকারের কাছে কী চাওয়ার আছে- এমন প্রশ্নের জবাবে আফরোজা জামিল কঙ্কা বলেন, আমরা চার বোন ভালোই আছি। সরকারের পক্ষ থেকে আমার মাকে কিছুই দেয়া হয়নি। বাবার স্বীকৃতিস্বরূপ যদি সরকার কিছু করে সেটাই চাইব। আমার মা আনজুমান আরা জামিল ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে মারা যান। উনি বেঁচে থাকতে কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ নামে একটি ফাউন্ডেশন করেছিলেন। সেই ফাউন্ডেশনটি চালানোর জন্য সরকারের সহযোগিতা চাই। আর যদি ক্যান্টনমেন্টে বাবার কোনো মুরাল এবং ইতিহাসের অংশ হিসেবে বাবাকে পাঠ্যপুস্তকে সংযুক্ত করা যায়, এই চাওয়াই সরকারের কাছে। এর বেশি কিছু নয়।

এইউএ/এমএআর/আরআইপি