‌‘বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর পা রেখে আমি মন্ত্রিসভায় যাব না’

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বরগুনা
প্রকাশিত: ১১:০০ পিএম, ১৪ আগস্ট ২০১৭

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতার স্থপতি, মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সপরিবারে শহীদ হওয়ার খবরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল দেশজুড়ে। ওই ঘটনায় সর্বপ্রথম প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে ওঠে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন তৎকালীন মহকুমা বরগুনায়।

সেই সময় বরগুনার বেতাগী অঞ্চলের এমপি ও বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদের শিল্প প্রতিমন্ত্রী ছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহজাদা মালেক খান। খন্দকার মোশতাক ছিল তার আপনব বড় ভায়রা। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর শাহজাদা মালেক খানকে মন্ত্রিপরিষদে যোগদানের জন্য অনুরোধ জানায় খন্দকার মোশতাক। তখন শাহজাদা মালেক খান বলেছিলেন, ‘ভাইজান, আমার জীবন থাকতে বঙ্গবন্ধুর রক্তের ওপর পা রেখে মন্ত্রিসভায় যাব না।’

সম্প্রতি জাগো নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তৎকালীন বরগুনা মহকুমার এসডিও সিরাজ উদ্দীন আহমেদ এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধুর প্রতি অবিচল ভালোবাসা, সততা আর ক্ষমতার প্রতি নির্লোভের অনন্য উদাহরণ দিয়েছিলেন শাহজাদা মালেক খান।

স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে এসডিও সিরাজ উদ্দীন আহমেদ বলেন, বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা আব্দুল মোতালেব মৃধা রেডিওতে বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শুনেই তার কাছে ছুটে আসেন। এর পরপরই সিরাজ উদ্দিন আহমেদ খবরের সত্যতা জানতে পেরে বরগুনার তৎকালীন তিন এমপি শাহজাদা মালেক খান, আসমত আলী সিকদার ও নিজাম উদ্দিনের সঙ্গে যোগযোগ করেন। তাদের সমর্থন নিয়ে তিনি বরগুনার তৎকালীন মহকুমা পুলিশ অফিসার (এসডিপিও) ফারুক আহমেদকে সঙ্গে নিয়ে পুলিশ লাইন যান।

bb

সেখানে তিনি সকল পুলিশ সদস্যের উদ্দেশ্যে বলেন, এ সরকার অবৈধ। এ সরকার মানি না। এ সময় তিনি মহকুমার সর্বত্র জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখার নির্দেশ দেন।

এরপর তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি ও বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলহাজ মো. জাহাঙ্গীর কবীর ও বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোতালেব মৃধাকে নিয়ে বরগুনার ওয়াবদা অফিসে রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পে যান তিনি। তখন রক্ষীবাহিনীর সেক্রেটারি ছিলেন আব্দুল লতিফ মাস্টার। জয়েন্ট সেক্রেটারি ছিলেন নুরুল ইসলাম সিকদার। তাদের সঙ্গে আলাপ করে সবাইকে সংগঠিত হতে বলেন এসডিও সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।

সিরাজ উদ্দীন আহমেদ আরও জানান, পরের দিন ১৬ আগস্ট তার বাংলোয় (বর্তমানে জেলা প্রশাসকের বাংলো) আয়োজন করা হয় শোক সভার। শোক সভায় বরগুনার বিভিন্ন পদে কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা, ছাত্রনেতা ও আওয়ামী লীগ নেতাসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষ অংশ নেয়। এর মধ্য দিয়ে অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়।

তিনি বলেন, পরবর্তীতে বরগুনার তৎকালীন সিও (ডেভ) ফরিদ আহমেদ, সাব রেজিস্ট্রার আজগর আলী, রিলিফ অফিসার বিপ্লব কুমার শর্মাসহ একাধিক সরকারি কর্মকর্তা এবং তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভুসহ (বর্তমান এমপি) বরগুনার নেতৃস্থানীয় আরও অনেকে সরাসরি এ আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন। কিন্তু সারা দেশের আর কোথাও এ আন্দোলনের কোনো সমর্থন না পাওয়ায় এক সময় ভেঙে পড়ে সে আন্দোলন। পরবর্তীতে আন্দোলনে সম্পৃক্ততার অভিযোগে নেতাকর্মীদের অনেককেই জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়।

bb

সিরাজ উদ্দীন আহমেদ বলেন, আমরা ভেবেছিলাম বরগুনার মতো দেশজুড়ে এ আন্দোলন ছড়িয়ে পড়বে, কিন্তু না। তৎকালীন অবৈধ সরকারের রক্ত চক্ষুকে উপেক্ষা করে সারা দেশে তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে না ওঠায় এক সময় ভেঙে পড়ে বরগুনার আন্দোলনও।

তিনি বলেন, ২৪ আগস্ট চিফ অব স্টাফ হলেন জিয়াউর রহমান। তিনি সব রক্ষীবাহিনীকে অস্ত্র জমা দেয়ার নির্দেশ দিলেন। সেই সময় আমি বরগুনার সব রক্ষীবাহিনীকে অস্ত্র জমা দিতে নিষেধ করলাম। অনেকেই অস্ত্র জমা দিলেন না। অস্ত্র জমা না দেয়ায় রক্ষীবাহিনী বরগুনার অ্যাসিস্ট্যান্ট লিডার আ. মান্নানের চাকরি চলে যায়।

১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বরগুনার প্রেক্ষাপট নিয়ে এ প্রতিবেদককে তৎকালীন একটি গোয়েন্দা প্রতিবেদন দেখান এসডিও সিরাজ উদ্দীন আহমেদ।

ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর ১৬ আগস্ট বরগুনার এসডিও সিরাজ উদ্দীনের বাসায় (বর্তমানে বরগুনার জেলা প্রশাসকের বাসভবন) তার নেতৃত্বে বরগুনার সরকারি কর্মকর্তা ও বাকশাল নেতাদের সঙ্গে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদে বরগুনায় বিভিন্ন কর্মসূচি নেয়া হয়। ওই প্রতিবেদনে বরগুনার পাঁচ ছাত্র নেতা ও বাকশাল নেতার অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়।

bb

জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ও তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি মো. জাহাঙ্গীর কবির সে দিনের কথা স্মরণ করে বলেন, হঠাৎ রেডিওতে শুনতে পাই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করা হয়েছে। এ খবর শুনে মুহূর্তেই সবাই হতবাক হয়ে পড়ি। এরপর গ্রামের বাড়ি থেকে বরগুনা শহরে এসে এসডিও সিরাজ উদ্দীন স্যারের সঙ্গে দেখা করি, তিনি আমাদের নিয়ে জরুরি সভা করেন। একই সঙ্গে শহরে মিছিল বের করি। আমরা তখন অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম।

সাবেক ছাত্র নেতা ও বর্তমান জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ. মোতালেব মৃধা বলেন, সেই সময় যারা প্রতিবাদ করেছিলেন তাদের অনেককেই জেল খাটতে হয়েছে। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ ও তৎকালীন অবৈধ সরকার-বিরোধী কর্মকাণ্ডের কারণে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে এসডিও সিরাজ উদ্দীন আহমেদকে নানা হয়রানি আর ভোগান্তির শিকার হতে হয়।

মো. সাইফুল ইসলাম মিরাজ/এএইচ/বিএ