দুই মাসে জবির ৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা

বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
প্রকাশিত: ০৫:৫২ পিএম, ২২ অক্টোবর ২০২১

করোনাকালে টানা বিধিনিষেধে ঘরে বসে থাকা, কর্মহীনতাসহ বিভিন্ন কারণে হতাশা-বিষণ্নতা অনেক বেশি জেঁকে বসছে মানুষের মনে। মনোবিদসহ অনেকের পক্ষ থেকেই এ ধরনের কথা বলা হচ্ছে বারবার। দেশে সাম্প্রতিক আত্মহত্যার প্রবণতা এবং এর সম্ভাব্য কারণ মনোবিদদের সে কথাগুলোকেই সামনে নিয়ে আসছে।

গত দুই মাসে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। তীব্র হতাশা, প্রেমঘটিত, অর্থনৈতিক চাপ ও পারিবারিক কলহে মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে তারা আত্মহত্যা করেছেন বলে স্বজনদের দাবি।

এ পর্যন্ত যারা আত্মহত্যা করেছেন তাদের প্রায় সবাই মৃত্যুর আগে পরিবার, বন্ধু ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম থেকে নিজেদেরগুটিয়ে নিয়েছিলেন। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক অবসাদগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং দেওয়ার জন্য কোনো মানসিক হেলথকেয়ার সেন্টার নেই। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে মানসিক হেলথকেয়ার সেন্টার স্থাপন করে শিক্ষার্থীদের কাউন্সেলিং দেওয়ার দাবি জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বুধবার (২০ অক্টোবর) নিজ কক্ষে ঝুলন্ত অবস্থায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আইন বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া মেহজাবিন স্বর্ণাকে উদ্ধার করা হয়। তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। সহপাঠী ও পরিবারের দাবি পড়াশোনার অতিরিক্ত মানসিক চাপে তিনি আত্মহত্যা করতে পারেন। তার গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা সদর উপজেলার পলাশ পোল মধুমাল্লার ডাঙ্গী গ্রামে।

৩০ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জের সদর থেকে অমিতোষ হালদার নামে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ভোর ৫টায় জেলার সদর থানার পাটিকেলবাড়ি ইউনিয়ন থেকে গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। এ ব্যাপারে কয়েক পাতা সুইসাইড নোটও পাওয়া গেছে। মারা যাওয়া অমিতোষ হালদার বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। অমিতোষ এক মাস আগে ঢাকা থেকে বাড়িতে যান। পারিবারিক কলহের কারণে বাড়িতে এসে চুপচাপ থাকতেন। বুধবার রাতে বাবা-মাকে ঘরের বাইরে থেকে তালাবদ্ধ করে তিনি গাছের ডালের সঙ্গে ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

গত ১৩ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বাড্ডায় ছাদ থেকে লাফিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের ২০১২-২০১৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী চন্দন পার্সি আত্মহত্যা করেছেন। চন্দন বেকারত্ব ও প্রেমঘটিত কারণে মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে তার সহপাঠীরা জানিয়েছেন।

২৮ আগস্ট চট্টগ্রাম নগরের আখতারুজ্জামান ফ্লাইওভার থেকে নিচে পড়ে আহত হন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আকবর হোসেন। তাকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়। আকবর হোসেন খান মৌলভীবাজার সদরের বাসিন্দা। আকবরও প্রেমঘটিতকারণে মানসিক অবসাদগ্রস্ত ছিলেন। তবে, এটি আত্মহত্যা না পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড সেটি জানা যায়নি। এ ঘটনায় একটি মামলা হয়েছে। মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনে কাজ করছে পুলিশ।

গত ২৩ আগস্ট রাজধানীর উত্তরায় জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষার্থী মেসবাহ আত্মহত্যা করেন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি মানসিক বিষণ্নতায় ভুগছিলেন বলে জানা গেছে।

এসব বিষয়ে জগন্নাথ বিশবিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নূর মোহাম্মাদ বলেন, করোনাকালীন সময়ে শিক্ষার্থীদের মানসিক সমস্যা আরও বেড়েছে। এদের জন্য জরুরি ভিত্তিতে মানসিক কাউন্সিলিং প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনের উচিত জরুরিভিত্তিতে দুইজন সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া। তারা মানসিক অবসাদগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের সমস্যা শুনবেন ও পরামর্শ দেবেন।

জবির ছাত্রকল্যাণ দপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক ড. আইনুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এসব মৃত্যু মেনে নেওয়া যায় না। তবে শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে মানসিক অবসাদগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মেডিক্যাল সেন্টারে সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হবে। এছাড়া প্রত্যেক বিভাগে শিক্ষার্থীদের সমস্যা শোনার জন্য একজনদায়িত্বপ্রাপ্ত শিক্ষক থাকবেন।

জবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. ইমদাদুল হক বলেন, মেডিক্যাল সেন্টারে দুইজন সাইকোলজিস্ট নিয়োগ দেওয়া হবে। এছাড়া শিক্ষার্থীদের সমস্যা শোনার জন্য প্রত্যেক বিভাগে দুইজন ছাত্র উপদেষ্টা নিয়োগ দেওয়া হবে। আগামী সিন্ডিকেটে এপদগুলো সৃষ্টি করে নিয়োগ দেওয়া হবে। যাতে শিক্ষার্থী মানসিক সমস্যার সমাধান করতে পারেন।

রায়হান/এমএএইচ/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]