গারো পাহাড়ে ‘অবৈধ’ বিদ্যুৎ সংযোগ, হুমকিতে বন্যপ্রাণী

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শেরপুর
প্রকাশিত: ০৬:০৪ পিএম, ০২ জানুয়ারি ২০২৬

আইনের তোয়াক্কা না করে শেরপুরের গারো পাহাড়ে দেদারসে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে বিদ্যুৎ বিভাগের একটি অসাধু চক্র এসব সংযোগ দিচ্ছে বলে জানা গেছে। এসব বিদ্যুতের লাইনে পড়ে বিভিন্ন প্রাণী মারা যাচ্ছে। ২০টিরও বেশি হাতি হত্যার অভিযোগ রয়েছে বৈদ্যুতিক শক দিয়ে। অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য করার দাবি পরিবেশবাদীদের। অন্যদিকে বন বিভাগ চাইলে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে বলে জানায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি।

ময়মনসিংহ অঞ্চলের শেরপুর বন বিভাগের তথ্য মতে, জেলায় ১৯ হাজার ২৭৫ একর বনভূমির মধ্যে দুই হাজার ৩৭ একর বনভূমি বেদখল হয়ে আছে।

গারো পাহাড় ঘুরে জানা যায়, একটা সময় পাহাড়জুড়ে দেখা যেত উঁচু-নিচু টিলা। সে সময় বনে ছিল নানান প্রজাতির বন্যপ্রাণী। তবে, নিয়ম-নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বনভূমিতে দখলদারদের বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ায় ঝলমলে আলোয় বন্যপ্রাণীরা নিজেদের বন ছেড়ে চলে যাচ্ছে অন্যত্র। ফলে প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্য হারিয়ে বন পরিণত হয়েছে উপশহরে।

ঝিনাইগাতীর কাংশা ইউনিয়নের গুরুচরণ দুধনই গ্রামের বাসিন্দা সঞ্চয় মিস্টার মারাক বলেন, আমরা ছোট সময় পাহাড়ে বাঘডাশ, বানর, হরিণ, বন্য শূকর, কাঠবিড়ালি, বনমোরগ, বিভিন্ন ধরনের সাপ, টিয়া, ঘুঘু, ময়না, তোতা, বউ পাখি, বিভিন্ন প্রজাতির বকসহ নানান পশু-পাখি দেখতাম। কিন্তু এখন আর পাহাড়ের রূপ আগের মতো নেই। পাহাড় ন্যাড়া হয়ে গেছে, একের পর এক বাড়ি-ঘর উঠেছে আর তাতে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগে সবকিছু আলোকিত হয়ে গেছে। এতে করে গহিন বন বলতে এখন আর কিছু নেই, তাই বন্যপ্রাণীরাও অন্যত্র চলে গেছে।

গারো পাহাড়ে ‘অবৈধ’ বিদ্যুৎ সংযোগ, হুমকিতে বন্যপ্রাণী

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অন্তত ১৫ জন জাগো নিউজকে জানান, বন বিভাগের এসব জমিতে দলিল-দস্তাবেজ ছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার নিয়ম না থাকলেও অতিরিক্ত টাকা দিলেই হরহামেশাই বনে মেলে বিদ্যুৎ সংযোগ। পল্লী বিদ্যুৎবিভাগের একটি অসাধু চক্র আছে, যাদের অতিরিক্ত টাকা দিলেই চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যেই সংযোগ দিয়ে দেয়। মাত্র চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা দিলেই এক থেকে দু’দিনের মধ্যেই বাড়িতে মিলে বিদ্যুৎ, এই সিন্ডিকেটের কারণে এখন বন আর বন নেই। এভাবে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হচ্ছে এখন অলিখিত নিয়ম।

অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য করার দাবি জানিয়ে সেভ দ্যা ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড ন্যাচার (সোয়ান) এর শেরপুরের যুগ্ম-সদস্যসচিব সানজিদা জেরিন বলেন, বনের জমিতে বাড়িঘর করা অবৈধ। সেখানে জমির কাগজপত্র না দেখে কীভাবে বন দখলকারীদের প্রত্যেকের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে? বনের ভেতরে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার ফলে পাহাড়ে এখন আগের রূপ নেই। বন্যপ্রাণীরা হারাচ্ছে তাদের আবাসস্থল, মারাত্মক হুমকিতে আছে জীববৈচিত্র্য। গত কয়েক বছরে হাতিদের হত্যা করা হয়েছে বিদ্যুৎ শক দিয়ে। এ নিয়ে আদালতে মামলাও হয়েছে, হাতি হত্যার দায়ে দায়ীরা কারাভোগও করেছেন।

তিনি আরও বলেন, যে সিন্ডিকেট বনে কাগজপত্র দেখা ছাড়াই বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সহযোগিতা আশা করছি।

বাংলাদেশ অ্যানিমল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান আদনান আযাদ জাগো নিউজকে বলেন, বিশ থেকে পঁচিশ বছর আগেও গারো পাহাড় ছিল ডিপ ফরেস্ট। কিন্তু ধীরে ধীরে বন দখল হওয়ায় আজ বনে বন্যপ্রাণিদের আবাস হুমকিতে পড়েছে। মানুষ বনে অনুপ্রবেশেকারী। আইনের মারপ্যাঁচে বসবাস করা সবাইকে উচ্ছেদ করতেও পারছে না বনবিভাগ। শেরপুরের গারো পাহাড়ে অনেক প্রাণী টিকে না থাকতে পেরে চলে গেছে। আর সবচেয়ে ভয়ংকর কারণ হয়ে উঠেছে বনে বিদ্যুৎ, বিদ্যুৎ দিয়ে হত্যা করা হচ্ছে অনেক প্রাণীকে। এটা আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি। বিশেষ করে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়ে হাতি হত্যা করা হচ্ছে। এর দায় বিদ্যুৎ বিভাগ এড়াতে পারে না।

গারো পাহাড়ে ‘অবৈধ’ বিদ্যুৎ সংযোগ, হুমকিতে বন্যপ্রাণী

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, গারো পাহাড়ের বালিজুড়িতে যেখানে বন্যহাতি মারা হয়েছিল সেখানে সরেজমিনে আমি গিয়েছিলাম। ওই অঞ্চলে বিদ্যুৎ সংযোগ দিয়েই বেশির ভাগ হাতি মারা হয়। হাতি হত্যার দায়ে কারাভোগও করেছে অভিযুক্তরা। বনে বিদ্যুৎ সংযোগের কারণে এখানে অনেক প্রাণী মারা যাচ্ছে। যার কারণে হুমকিতে পড়ছে জীববৈচিত্র্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি শেরপুরের জেনারেল ম্যানেজার ইঞ্জিনিয়ার মাইনউদ্দিন আহমদ বলেন, বন বিভাগ চাইলে বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হবে। অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে সঠিক কাগজপত্র যাচাইবাছাই না করে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হবে।

সম্প্রতি গারো পাহাড়ে আসলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, আগে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করতে হবে।

মো. নাঈম ইসলাম/এমএন/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।