সাতক্ষীরা

হাসপাতালে মিলছে না জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন, ফার্মেসিতে দ্বিগুণ দাম

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সাতক্ষীরা
প্রকাশিত: ০৫:২১ পিএম, ১৩ জানুয়ারি ২০২৬

সাতক্ষীরা জেলা সদর হাসপাতালে গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে জলাতঙ্ক রোগের প্রতিষেধক ‘এন্টি রেবিস ভ্যাকসিন’ সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ জন রোগী কুকুর বা বিড়ালের কামড়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে আসলেও প্রতিষেধক না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যাচ্ছেন।

অভিযোগ উঠেছে, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে কিছু অসাধু ফার্মেসি মালিক ভ্যাকসিনের দাম দ্বিগুণ বাড়িয়ে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করছেন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, প্রতিষেধক সংকটের কারণে গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতাল থেকে বিনামূল্যে জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন প্রদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফলে সরকারি সেবার ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত রোগীরা বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করতে বাধ্য হচ্ছেন। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সামলাতে না পেরে অনেকেই ভ্যাকসিন নেওয়া থেকে পিছিয়ে যাচ্ছেন, যা তাদের জীবনকে সরাসরি ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

অভিযোগ রয়েছে, এই সংকটকে পুঁজি করে হাসপাতাল সংলগ্ন ও বিভিন্ন এলাকার কিছু অসাধু ফার্মেসি মালিক ভ্যাকসিনের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন। যেখানে সরকারি নির্ধারিত মূল্য ৪৫০ টাকা, সেখানে একই ভ্যাকসিন ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, এমনকি কোথাও এক হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এতে একদিকে সাধারণ মানুষের আর্থিক ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে, অন্যদিকে প্রাণঘাতী জলাতঙ্ক রোগ প্রতিরোধ কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

চিকিৎসকরা বলছেন, ভ্যাকসিন সংকটের এই সময়ে প্রাথমিক চিকিৎসা হিসেবে কোনো প্রাণী কামড় বা আঁচড় দিলে সঙ্গে সঙ্গেই ক্ষতস্থান ১৫ মিনিট ধরে সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ধুতে হবে। এরপর যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা অন্য সরকারি হাসপাতাল থেকে ভ্যাকসিন দিতে হবে। এছাড়া সামর্থ্য থাকলে অনুমোদিত ফার্মেসি থেকে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করে অবশ্যই প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর মাধ্যমে পুশ করানো জরুরি। তবে দীর্ঘমেয়াদে এ ধরনের প্রাণঘাতী রোগ প্রতিরোধে সরকারি পর্যায়ে দ্রুত ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পথকুকুর নিয়ন্ত্রণ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করার তাগিদ দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।

হাসপাতালে মিলছে না জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন, ফার্মেসিতে দ্বিগুণ দাম

জেলার সদর হাসপাতালের জলাতঙ্ক ভ্যাকসিন সেন্টারে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা কুকুর ও বিড়ালের কামড়ে আহত রোগীরা ভ্যাকসিন পাওয়ার আশায় দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় সেন্টার থেকে অনেককে হতাশ হয়ে ফিরে যেতে হচ্ছে। আবার যারা আর্থিকভাবে সামর্থ্যবান, তারা বাইরে থেকে অতিরিক্ত দামে ভ্যাকসিন কিনে এনে হাসপাতালের দায়িত্বপ্রাপ্ত সিস্টারদের মাধ্যমে পুশ করিয়ে নিচ্ছেন। ফলে সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে তৈরি হয়েছে স্পষ্ট বৈষম্য।

সাতক্ষীরা সদরের ঘোনা এলাকার বাসিন্দা রমিজুল ইসলাম জানান, ছেলেকে ভ্যাকসিন দিতে সদর হাসপাতালে এসেছিলেন। কিন্তু সেখানে ভ্যাকসিন না থাকায় পাশের একটি ফার্মেসি থেকে ৮০০ টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন কিনতে হয়েছে।

অন্যদিকে কুকুরের কামড়ে আহত কলারোয়া উপজেলার পাঁচনল গ্রামের সাকিবুল হাসান (১৭) ও জয়নগর গ্রামের আজিজুল গাজী (৪৫), আর বিড়ালের আঁচড়ে আহত সদর উপজেলার টেংরা ভবানীপুর গ্রামের শিশু প্রিয়াঙ্কা (৮) ও বকচরা গ্রামের শরিফা খাতুন (২৫) জানান, টানা দুই দিন হাসপাতালে এসেও তারা ভ্যাকসিন পাননি। হাসপাতালের ভ্যাকসিন সেন্টার থেকে জানানো হয়েছে, বাইরে থেকে কিনে আনলে ভ্যাকসিন পুশ করে দেওয়া হবে। কিন্তু বাইরে প্রতিটি ভ্যাকসিনের দাম ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা, কোথাও আবার এক হাজার টাকা পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। এই দামে ভ্যাকসিন কেনা তাদের পক্ষে খুবই কষ্টকর। তার ওপর সব ফার্মেসিতে ভ্যাকসিন পাওয়া যাচ্ছে না বলে তারা আরও বিপাকে পড়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদর হাসপাতালের ভ্যাকসিন সেন্টারে দায়িত্বরত সিস্টাররা জানান, গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালে ভ্যাকসিনের সরবরাহ বন্ধ। প্রতিদিন গড়ে আড়াইশ থেকে তিনশ রোগী ভ্যাকসিন নিতে আসেন। ভ্যাকসিন না থাকায় অনেক রোগী তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছেন, কেউ কেউ কটু কথাও বলেন। সবকিছু নীরবে সহ্য করতে হচ্ছে।

সাতক্ষীরা সিভিল সার্জন কার্যলয় সূত্রে জানা গেছে, জেলায় প্রতিদিন গড়ে ২৫০ থেকে ৩০০ জন রোগী এন্টিরেবিস ভ্যাকসিন নিতে আসেন। গত এক মাসে সাতক্ষীরা জেলায় পাঁচ হাজারেরও বেশি মানুষ বিভিন্ন প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তবে সদর হাসপাতাল থেকে তারা প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন সুবিধা পাচ্ছেন না।

সাতক্ষীরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মানস কুমার জাগো নিউজকে বলেন, জলাতঙ্ক একটি প্রাণঘাতী রোগ। কামড়ের পর নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ভ্যাকসিন গ্রহণ না করলে মৃত্যুঝুঁকি অনিবার্য। সংকট থাকলেও রোগীকে বাধ্যতামূলক চার থেকে পাঁচ ডোজ ভ্যাকসিন নিতে হয়। এই মুহুর্তে সাতক্ষীরাসহ সারা দেশে এই ভ্যাকসিনের সংকট রয়েছে।

এ বিষয়ে সাতক্ষীরার সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম জাগো নিউজকে বলেন, গত ২৩ ডিসেম্বর থেকে হাসপাতালে এন্টিরেবিস ভ্যাকসিনের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। অনেক আগেই বরাদ্দ চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি ভ্যাকসিনের নতুন বরাদ্দ পাওয়া যাবে।

আহসানুর রহমান রাজীব/কেএইচকে/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।