নির্বাচনে হুমকি এড়াতে তৎপরতা: উখিয়ার ভাড়াবাসা থেকে ৬২২ রোহিঙ্গা আটক
দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। যতই দিন ঘনিয়ে আসছে, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো নিরাপত্তা ঝুঁকির অন্যতম কারণ হয়ে ধরা দিচ্ছে। ক্যাম্পে অবৈধ অস্ত্র ও মাদক কারবার, সশস্ত্র গোষ্ঠীর সক্রিয়তা, ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার এবং ক্যাম্পের বাইরে রোহিঙ্গাদের অবাধ বিচরণ জাতীয় নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের আশঙ্কা, ক্যাম্পে থাকা অপরাধী চক্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীকে অসাধু মহল নির্বাচনকালীন সময়ে নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিতে ব্যবহার করতে পারে।
কক্সবাজারসহ সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় স্বার্থান্বেষী মহল নাশকতা সৃষ্টিতে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করতে পারে আশঙ্কায় সতর্ক অবস্থানে থেকে আগে থেকেই ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের বহির্গমন সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা, চেকপোস্টে শতভাগ পরিচয় যাচাই ও তল্লাশি জোরদারসহ একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সেই নির্দেশনা মাথায় নিয়ে, রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) উখিয়ার পালংখালীর মরাগাছতলা এলাকায় অভিযান চালিয়ে ক্যাম্পের বাইরে ভাড়া বাসা ও স্থানীয়দের জমিতে অবৈধ বসতি করে থাকা ৬২২ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে যৌথবাহিনী। এদের মাঝে ২১১ পুরুষ, ১৯৬ নারী এবং ২০০ জন শিশু।
রোহিঙ্গাদের অবৈধভাবে বাসাভাড়া ও ঘর করতে জমি দেওয়ার দায়ে ১৩ জন বাড়ির মালিককে শনাক্ত করেন অভিযানকারীরা। সেই ১৩ বাড়ির মালিকের কাছ থেকে পৃথকভাবে একলাখ ৫৭ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। এছাড়া ৪ জনকে কারাদণ্ড দিয়ে জেলহাজতেও পাঠানো হয়। আটকদের নির্ধারিত ক্যাম্পে পাঠাতে এপিবিএন পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
অভিযান সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, আটকদের ক্যাম্পে পাঠানোর আগে তাদের অবস্থান ও চলাচল বিষয়ে বিশদ অনুসন্ধান চলছে। বিশেষত অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনের প্রাক্কালে রোহিঙ্গাদের অপব্যবহার প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
এছাড়াও ৪ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রামের চন্দনাইশে দোহাজারী পৌরসভার রোহিঙ্গা কলোনিতে অবৈধভাবে বসবাসকারী ৩৪৫ জন রোহিঙ্গাকে আটক করেছে যৌথবাহিনী। ওই দিন মধ্যরাতে শুরু হওয়া অভিযানে বার্মা কলোনিকে যৌথবাহিনী চারদিক থেকে ঘিরে প্রতিটি বাড়ি সার্চ করে ১৭৬ পুরুষ, ৮৬ নারী ও ৮৩জন অপ্রাপ্তবয়স্ক মিলে ৩৪৫ জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়। এর এক সপ্তাহ আগে, লোহাগাড়ায় যৌথ অভিযানে ভুয়া জাতীয় পরিচয়পত্রসহ ৪৫ জন রোহিঙ্গা আটক হওয়ার ঘটনায় উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে, নির্বাচনে রোহিঙ্গারা অপব্যবহার হতে পারে। পরবর্তীতে থানা এবং উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় অভিযুক্তদের কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনের (আরআরআরসি) তত্ত্বাবধানে উখিয়ায় স্থানান্তরিত করা হয়।
সূত্র মতে, নিজ দেশ মিয়ানমারে নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রয় নেয়। এর আগে বিভিন্ন সময়ে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা এদেশে অনুপ্রবেশ করে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের পাহাড়ি এবং সমুদ্র উপকূলীয় এলাকায় অবস্থান নেয়। উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১০ হাজার একর পাহাড়ি ভূমিতে ৩৩টি ক্যাম্প স্থাপনের পর রোহিঙ্গাদের একত্র করে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে ছড়িয়ে থাকা রোহিঙ্গাদের অনেকে ক্যাম্পে চলে যান। সব মিলিয়ে সরকারি হিসেবে প্রায় ১২ লাখে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গার সংখ্যা। কিন্তু বেসরকারি হিসাবে তা ১৬ লাখ ছাড়িয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
সংশ্লিষ্টরা জানায়, ৩৩টি রোহিঙ্গা ক্যাম্প নিয়ন্ত্রণে রাখতে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়। কিন্তু রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর ভেতরে ও বাইরে নিয়মিতভাবে অস্ত্র ও ইয়াবা কারবার, অপহরণ, চাঁদাবাজি ও খুনের মতো গুরুতর অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, অপরাধীরা ক্যাম্পগুলোকে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে ক্যাম্পসংলগ্ন জনপদগুলোতেও নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে। তাই এসব ক্যাম্প এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে।
জানা গেছে, বিভিন্ন ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়ার একাধিক অংশ কেটে গোপন পথ তৈরি করা হয়েছে। উখিয়ার পানবাজার ও কুতুপালং সংলগ্নসহ বিভিন্ন ক্যাম্পে অন্তত ২০-২৫টি স্থানে করা পথ ব্যবহার করে রাতের আঁধারে রোহিঙ্গারা ক্যাম্পের বাইরে বেরিয়ে পড়ছে। নজরদারির ক্ষেত্রেও চরম দুর্বলতার তথ্য মিলেছে।
ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা এপিবিএনের তথ্য অনুযায়ী, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্থাপিত প্রায় ৭০০টি সিসিটিভি ক্যামেরার একটি ক্যামেরাও বর্তমানে সচল নেই। ফলে ক্যাম্পের ভেতরের কার্যক্রম নজরদারিতে বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। নির্বাচন সামনে রেখে ক্যাম্পগুলোতে মাইকিং করে সতর্কতা জারি করা হলেও বাস্তবে রোহিঙ্গাদের চলাচল পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। এরই প্রমাণ রোববার উখিয়ার পালংখালী ও চট্টগ্রামের চন্দনাইশ এবং লোহাগাড়ায় যৌথ অভিযানে অবৈধভাবে বসবাসরত হাজারাধিক রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়।
এর আগে ২১ জানুয়ারি সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের অপারেশন্স ও পরিকল্পনা পরিদপ্তর থেকে পাঠানো এক সরকারি চিঠিতেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পকে কেন্দ্র করে নির্বাচনকালীন নাশকতা, অবৈধ অস্ত্রের উপস্থিতি এবং ভোটার তালিকায় অনিয়মের আশঙ্কার কথা উল্লেখ করা হয়।
সুজন কক্সবাজার জেলা সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা সংকট এখন আর শুধু মানবিক নয়, এটি স্পষ্টভাবে আইনশৃঙ্খলা ও জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। সামনে নির্বাচন, এসময় ক্যাম্পগুলোর নিরাপত্তা জোরদার না করা হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
রোহিঙ্গা প্রতিরোধ কমিটির নেতা ও উখিয়ার পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন, ক্যাম্পসংলগ্ন এলাকার মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ভুয়া এনআইডি, অবাধ চলাচল ও অপরাধমূলক তৎপরতা বন্ধে প্রশাসনের সমন্বিত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ শুরু হয়েছে- এখন ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে নির্বাচনসহ পুরো এলাকার স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব হবে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, ক্যাম্পে শক্ত নিরাপত্তা বেষ্টনী, গোপন পথ বন্ধ এবং নজরদারি জোরদার করা না হলে জাতীয় নির্বাচনে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
সংসদ নির্বাচন ও গণভোটে নির্বাচনকালীন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের বিরত রাখতে সশস্ত্র বাহিনীসহ সকল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে পাঠানো চিঠিতে ইসি জানায়, ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের বিরত রাখতে উখিয়া-টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্পসমূহের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত প্রদান করেছে।
ইসির সিদ্ধান্ত অনুসারে নির্বাচনকালীন রোহিঙ্গা ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও নির্বাচনি কর্মকাণ্ডে রোহিঙ্গাদের বিরত রাখার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে তৎপর প্রশাসন।
সায়ীদ আলমগীর/এফএ/এমএস