সিরাজগঞ্জের এক গ্রামেই ১০ হাজার তাঁতকল

এম এ মালেক
এম এ মালেক এম এ মালেক , জেলা প্রতিনিধি, সিরাজগঞ্জ
প্রকাশিত: ১০:৫৯ এএম, ০৭ মার্চ ২০২৬

সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলার ‘তামাই গ্রাম’। এটি সিরাজগঞ্জ শহর থেকে প্রায় ১৭ কিলোমিটার দক্ষিণে। এই গ্রামের মানুষের প্রধান পেশা উন্নত মানের তাঁতের লুঙ্গি বানানো। গ্রামটিতে রয়েছে প্রায় ১০ হাজারের অধিক যন্ত্রচালিত তাঁত (পাওয়ার লুম)। যেখানে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। গ্রামটির প্রায় ৯৫ ভাগ পরিবারের মানুষ কোনো না কোনোভাবে এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। এই লুঙ্গি শিল্পীদের হাত ধরে গ্রামটিতে এসেছে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সূত্রে জানা যায়, এখানকার তৈরি লুঙ্গির খ্যাতি এখন শুধু দেশে নয়, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা এমনকি মিয়ানমারের কিছু অংশেও ছড়িয়ে পড়েছে। ব্যবসায়ীরা এখান থেকে লুঙ্গি কিনে বিদেশেও পাঠান। বিশেষ করে ইউরোপ, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মালয়েশিয়ায় থাকা প্রবাসীদের মধ্যে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

৪৫ বছরের বেশি সময় ধরে রকমারি লুঙ্গি উৎপাদন করে আসছেন তামাই গ্রামের রাজবিথি লুঙ্গির স্বত্বাধিকারী সাইফুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘আমার বাপ-দাদাও এই কাজ করেছেন। অনেক দিন ধইরা আমিও করছি। বর্তমানে আমার প্রায় ৬০টি তাঁত চলমান। প্রতিদিন পর্যাপ্ত লুঙ্গি উৎপাদন হয়। উৎপাদিত লুঙ্গিগুলোর বেশিরভাগ সেলাইয়ের পর ভাঁজ করে আমাদের রাজবিথি ব্র‌্যান্ডে বাজারজাত করা হয়। কিছু স্থানীয় হাটসহ লুঙ্গি কোম্পানিগুলোর কাছে গ্রেরে (অপ্রস্তুত) বিক্রি করা হয়ে থাকে।’

সিরাজগঞ্জের এক গ্রামেই ১০ হাজার তাঁতকল

সপ্তাহে তিন হাজার টাকা মজুরিতে লুঙ্গি তৈরির সুতা শুকানোর কাজ করছেন আবু হেনা নামের এক যুবক। তিনি বলেন, সারা বছরই তাদের কমবেশি কাজের চাপ থাকে। তামাই গ্রামের তাঁতশিল্পে লুঙ্গি উৎপাদন ঘিরে অনেক বেকার যুবকের কাজের ব্যবস্থা হয়েছে। ঈদ, পূজা ও রমজান মাস ঘিরে তামাই গ্রামে মানুষের কর্মব্যস্ততা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

তামাই গ্রামে উৎপাদিত লুঙ্গির চাহিদা কমবেশি সারা বছরই থাকে জানিয়ে তাঁতি আমিরুল ইসলাম বলেন, দামে কম, পাকা রংসহ গুণে মানে ভালো হওয়ায় আমাদের গ্রামের উৎপাদিত লুঙ্গিই সবার পছন্দ।

গ্রামটির লুঙ্গি উৎপাদনকারী তাঁতি আসাদুল ইসলাম বলেন, আমরা সর্বদা উন্নত মানের রং, সুতা ব্যবহার করে নতুন নতুন নকশায় যন্ত্রচালিত তাঁতে মানসম্মত লুঙ্গি উৎপাদন করে থাকি। যে কারণে দেশের খ্যাতনামা লুঙ্গি বাজারজাত কোম্পানিগুলো আমাদের উৎপাদিত লুঙ্গি কিনে নিয়ে তাদের নিজস্ব ব্র্যান্ডে বাজারে ছাড়ছে।

সিরাজগঞ্জের এক গ্রামেই ১০ হাজার তাঁতকল

স্থানীয়রা জানান, তামাই গ্রামে লুঙ্গি ও শাড়ি তৈরির গোড়াপত্তন হয়েছিল এক শতাব্দীর বেশি আগে। তখন স্থানীয় কারিগরদের দক্ষ হাতে তৈরি উন্নত মানের লুঙ্গি, শাড়ি ও গামছার জন্য এই জেলা বিখ্যাত হয়ে ওঠে। লুঙ্গি তৈরি অনেকটাই ঝামেলামুক্ত হওয়ায় এক পর্যায়ে তামাই গ্রামের তাঁতিরা শাড়ি উৎপাদন বাদ দিয়ে ধীরে ধীরে লুঙ্গিতে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন। লুঙ্গি উৎপাদন করেই এই গ্রামের তাঁতিদের ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এই সময়েই তাঁতিরা তাদের হস্তচালিত তাঁত বিক্রি করে যন্ত্রচালিত তাঁত কিনতে শুরু করেন। গ্রামটিতে বর্তমানে হস্তচালিত তাঁত নেই বললেই চলে। ১০ হাজারের অধিক যন্ত্রচালিত তাঁত রয়েছে। এসব তাঁতে ১৫০ টাকা থেকে শুরু করে ২ হাজার টাকা দামের লুঙ্গিও তৈরি হয়ে থাকে।

এ গ্রামে কাজের সুবাদে এসে অনেক পরিবারের অর্থনৈতিক চিত্রও বদলে গেছে। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার পচাকাটা গ্রামের একরামুল হোসেন (৪০) তামাই গ্রামে এসে ১০ বছর ধরে লুঙ্গি বুননের কাজ করছেন। এতে তার পরিবারে বেশ স্বচ্ছলতা এসেছে। তার দুই ভাইও লুঙ্গি বুননের কাজ করেন। এতে খাবার খরচ বাদ দিয়ে প্রতি সপ্তাহে দুই ভাই মিলে ১০ হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতে পারছেন।

তামাই গ্রামে এসে নলিতে সুতা পাকানোর কাজ করেন জাহানারা আক্তার। তার বাড়ি পার্শ্ববর্তী দেলুয়াকান্দি গ্রামে। প্রায় আট বছর ধরে তিনি তামাই গ্রামে লুঙ্গির সুতা পাকানোর কাজ করেন। প্রতি সপ্তাহে বেশ ভালোই আয় করেন। সেই টাকায় পরিবার এখন বেশ সচ্ছল।

সিরাজগঞ্জের এক গ্রামেই ১০ হাজার তাঁতকল

ফকিরপাড়া এলাকার লুঙ্গি উৎপাদনকারী তাঁতি শামীম মল্লিক জানান, লুঙ্গি উৎপাদন করেই গত দুই দশকে এই এলাকার মানুষের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে। অনেক মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এরই মধ্যে এই গ্রামের অনেক তাঁতি লুঙ্গি উৎপাদন করে তাদের নিজেদের ব্র্যান্ডের নামে বাজারজাত করে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

এফএ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।