পর্যটক বরণে প্রস্তুত রাঙ্গামাটি-সাজেক

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাঙ্গামাটি
প্রকাশিত: ১১:০৮ এএম, ১৮ মার্চ ২০২৬

আসন্ন ঈদুল ফিতরের টানা ছুটিকে সামনে রেখে পার্বত্য জেলা রাঙামাটিতে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগমের প্রত্যাশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। ইতোমধ্যে পর্যটকদের বরণে প্রস্তুত রাঙামাটি ও জনপ্রিয় পর্যটনকেন্দ্র সাজেক। এছাড়া রিসোর্ট ও কটেজগুলোতে আগাম বুকিং শুরু হয়েছে।

জানা গেছে, মেঘের উপত্যকা সাজেকের ১১৮টি রিসোর্ট-কটেজের প্রায় শতভাগ বুকিং সম্পন্ন হয়েছে এবং রাঙামাটির হোটেল, মোটেল ও কটেজগুলো আগেই সংরক্ষিত হয়ে গেছে।

সাজেক রিসোর্ট-কটেজ মালিক সমিতির তথ্য মতে, গত বছর আগুনে পুড়ে ক্ষতিগ্রস্ত ৩৪টি রিসোর্টের মধ্যে ২০টি নতুনভাবে নির্মাণের পর বর্তমানে সাজেকে রিসোর্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১১৮টি। রিসোর্টগুলোতে ঈদের দীর্ঘ ছুটিতে আগাম বুকিং শুরু হয়ে বুধবারের (১৮ মার্চ) মধ্যে প্রায় শতভাগ বুকিং হয়ে গেছে। ফলে ঈদের টানা ছুটিতে যেনো পর্যটকদের মিলনমেলায় পরিণত হতে যাচ্ছে সাজেক। এখন অপেক্ষা শুধু অতিথিদের বরণে। প্রস্তুত এখানকার সরকারি ও বেসরকারি পর্যটনকেন্দ্রগুলো।

রাঙ্গামাটির বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে গিয়ে দেখা গেছে, শেষ মুহূর্তের সাজসজ্জার দেখভালে ব্যস্ত সবাই। সিম্বল আব রাঙ্গামাটি খ্যাত ঝুলন্ত সেতুতে ঘষামাজা শেষে রং তুলির আঁচড়ে রঙ্গিন হয়ে উঠেছে সেতু ও আশেপাশের এলাকা। অন্যদিকে পর্যটকদের নৌভ্রমণের জন্য সংস্কার শেষে বোটগুলো সারিবদ্ধভাবে বেধে রাখা হয়েছে ঘাটে। রিসোর্টগুলোকেও সাজিয়ে তোলা হয়েছে নতুন সাজে। শুধু তাই নয় প্রস্তুতি নিয়েছে স্থানীয়ভাবে তৈরি পোশাকের দোকানগুলোও। যেখানে শোভা পাচ্ছে কোমর তাঁতে বুনা স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন পোশাক, শো-পিছ নানান কারুশিল্প।

পর্যটক বরণে প্রস্তুত রাঙ্গামাটি-সাজেক

কাপ্তাই হ্রদের ট্যুরিস্টবোট মালিক মাসুদ রানা বলেন, রমজানে পর্যটক শূন্য ছিল রাঙ্গামাটি। সামনে ঈদের লম্বা ছুটি। আশা করছি সে সময় রাঙ্গামাটিতে প্রচুর পর্যটকের আগমন ঘটবে। তাই আমরা বোটগুলো প্রয়োজনীয় সংস্কার ও রং করা শেষে প্রস্তুত করে রেখেছি। এখন শুধুই সময়ের অপেক্ষা। পর্যটকদের চাহিদামতো সেবা দিতে আমরা প্রস্তুত।

রাঙ্গামাটির হ্রদে বোট পরিচালনার সঙ্গে প্রায় ৩০ বছর ধরে জড়িত বোট ব্যবসায়ী রমজান আলী বলেন, ঈদের ছুটিতে প্রচুর পর্যটক আসবেন। আমাদের ঘাটে ১২৫টি, অন্যান্য ঘাটে আরও প্রায় শতাধিক টুরিস্ট বোট প্রস্তুত আছে। ইতোমধ্যে পর্যটকদের বরণে বোটগুলো মেরামত ও রং করাসহ প্রতিটি বোটে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য লাইফ জ্যাকেট রাখা হয়েছে।

নিরিবিলি পরিবেশ ও কাপ্তাই হ্রদের প্রাণ-প্রকৃতি উপভোগ করতে দ্বীপ কেন্দ্রীক রিসোর্টে আগ্রহ বেড়েছে পর্যটকদের।

রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে অন্যতম গন্তব্য এখন মায়াবীদ্বীপ, রাঙ্গাদ্বীপ, ওয়াইল্ডউড আইল্যান্ড, ডিভাইন লেক আইল্যান্ড, লেকভিউ আইল্যান্ড ও দ্য গ্রান্ড হিলতাজ অন্যতম।

মায়াবীদ্বীপ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রিকো খীসা বলেন, শুধু আমাদের রিসোর্টই নয়, জেলার অধিকাংশ রিসোর্ট প্রায় শতভাগ বুকিং হয়ে গেছে। আমরা এখন পর্যটকদের বরণ করে নেওয়ার অপেক্ষায় আছি।

পর্যটক বরণে প্রস্তুত রাঙ্গামাটি-সাজেক

বার্গী লেকভ্যলি রিসোর্টের মালিক সুমেধ চাকমা বলেন, আমাদের সবগুলো রিসোর্ট আগামী ২৯ মার্চ পর্যন্ত বুকিং হয়ে গিয়েছে। আশা করছি ঈদে ভালো ব্যবসা হবে। রোজার সময়ে পর্যটক ছিলো না বললে চলে। এতে অনেকটা আর্থিক ক্ষতির মুখে আমরা। আশা করছি সেটি পুষিয়ে নিতে পারব এবার।

সাম্প্রতিক সময়ে রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের কাছে পছন্দের কেন্দ্র হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ পুলিশ কল্যাণ ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত পলওয়েল কটেজ অ্যান্ড ন্যাচার পার্ক। শহরের জিরো পয়েন্টে কাপ্তাই হ্রদের তীরঘেঁষা এই স্থাপনাটি লাভপয়েন্ট’র জন্যও বিখ্যাত। এছাড়াও এখানকার লেকভিউ কটেজ, সুইমিংপুল এবং কায়াকিংসহ শিশুদের বিভিন্ন রাইডস ও বিশাল এক রেস্তোরাঁ রয়েছে। আরো আছে পিকনিকসহ অন্যান্য সভা-সেমিনার করার জন্য বিশাল মিলনায়াতন।

পার্কটির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান বলেন, এখানে ১১টি কটেজে মোট ৩৬ জন পর্যটক থাকতে পারেন। ঈদের ছুটিতে কটেজগুলো শতভাগ বুকিং হয়েছে। পর্যটকদের অসুস্থতায় আমাদের পুলিশ হাসপাতাল সেবা দিতে প্রস্তুত রয়েছে। আমরা চাই এখানে বেড়াতে আসা পর্যটকরা যেন রাঙ্গামাটি সম্পর্কে একটি পজিটিভ ধারণা নিয়ে যান।

কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ নীল জলরাশি আর সবুজ পাহাড়ের টানে প্রকৃতিপ্রেমী পর্যটক ও দর্শনার্থীদের কাছে নতুন আকর্ষণ হয়ে ধরা দিয়েছে হাউজবোট। দৃষ্টিনন্দন আধুনিক সব সুবিধা থাকায় সব বয়সী পর্যটকের কাছে ভালোই সাড়া ফেলেছে এসব হাউজবোট। বিশাল নৌকার ওপর খোলা ছাদে বসে কাপ্তাই হ্রদের সৌন্দর্য উপভোগ যেমন করা যায়, তেমনি এসব হাউজবোটে আধুনিক বেডরুম, বেলকনি, রেস্টুরেন্টসহ যাবতীয় সুযোগ সুবিধার কমতি নেই, যেন ভাসমান হোটেল। এখন শুধু দিনের আলোতে নয়, পূর্ণিমা রাতে জোছনার আলোতেও ঘুরে বেড়ানো যায় কাপ্তাই হ্রদের বুকে।

এবারের ঈদের লম্বা ছুটিতে এসব হাউজবোটে দারুন সাঁড়া পরবে বলেন জানান সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটক বরণে প্রস্তুত রাঙ্গামাটি-সাজেক

হাউজবোট ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদুল ইসলাম মিজান জানান, ঈদ পরবর্তী ২২ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত সব হাউজবোটেই বুকিং রয়েছে। দু’দিন একরাত করে ট্রিপ আয়োজনে সব হাউজবোটেরই প্রায় ৩ থেকে ৪ টা করে বুকিং হয়ে গেছে। ঈদের বুকিংয়ে প্রায় ৮টি হাউজবোট থাকবে। এসব হাউজবোটে রুম সংখ্যা ৫০-এর মতো।

এদিকে ‘বাংলাদেশের দার্জিলিং’ খ্যাত মেঘের উপত্যকা সাজেক পর্যটনকেন্দ্র ফের মুখিয়ে আছে পর্যটকদের বরণে। ইতোমধ্যেই সেখানকার ১১৮টি কটেজেই ছুটির দিনগুলোতে প্রায় শতভাগ বুকিং হয়ে গেছে। গত বছরের ভয়াবহ আগুনে পুড়ে যাওয়া ৩৪টি কটেজের মধ্য ২০টি পুনরায় নির্মাণ শেষে চালু করা হয়েছে। বর্তমানে চালু ১১৮ টি কটেজে প্রায় ৩০০০ পর্যটকের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে।’

সাজেক রিসোর্ট ও কটেজ মালিক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক রাহুল চাকমা জন জানান, মার্চের ২২ থেকে ২৯ তারিখ পর্যন্ত সবগুলো রিসোর্ট শতভাগ বুকিং হয়েছে। যেহেতু এখন রিসোর্টের সংখ্যা কম, এরপর অনেকগুলো রিসোর্ট নির্মাণাধীন আছে, এর মধ্যে অনেকগুলো এবারই উদ্বোধন হবে। আমাদের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে আছে। এখন শুধু পর্যটকদের সেবা দেওয়ার অপেক্ষায় আমরা। সমিতির পক্ষ থেকে যে কোনো সংকট মোকাবেলায় প্রস্তুত রয়েছি।

রাঙ্গামাটি পর্যটন হলিডে কমপ্লেক্সের ব্যবস্থাপক আলোক বিকাশ চাকমা বলেন, আমাদের মোটেল ও কটেজ মিলে মোট ৮৭টি রুম আছে, যাতে ১৭০ জন থাকতে পারবেন। ২২ মার্চ থেকে থেকে ২৮ মার্চ পর্যন্ত ৮০ শতাংশ রুম বুকিং আছে। এছাড়াও যারা হঠাৎ করে রাঙ্গামাটি বেড়াতে আসবে তাদের জন্য ২০ শতাংশ রুম খালি রাখা হয়েছে। যাতে রাঙ্গামাটি বেড়াতে এসে কোনো পর্যটক বিড়ম্বনায় না পড়েন।

রাঙ্গামাটি আবাসিক হোটেল মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ ইউসুফ বলেন, ঈদের টানা ছুটি এবং দেশে এই মুহূর্তে কোনো রাজনৈতিক হানাহানি না থাকায় এবার রেকর্ড পরিমাণ পর্যটক আসবেন বলেই মনে করছি আমরা, ইতোমধ্যেই বুকিং দেখে এটাই ধারণা হচ্ছে। পর্যটকদের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা দিতে এবং সবরকম সহযোগিতা করতে আমরা হোটেল মালিকদের নির্দেশনা দিয়েছি।

এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা টুরিস্ট পুলিশ রাঙ্গামাটি রিজিয়নের পুলিশ সুপার (এসপি) নিহাদ আদনান তাইয়ান জাগো নিউজকে বলেন, এবারের ঈদের ছুটিতে আমরা তিন ভাগে ভাগ হয়ে কাপ্তাই হ্রদে স্পিডবোট নিয়ে, শহরে মোটরসাইকেলে এবং একটি টিম ইমার্জেন্সির দায়িত্ব পালনের প্রস্তুতি নিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, আমরা সাজেকসহ রাঙ্গামাটি শহরের সব পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে পর্যটকদের জন্য নির্দেশনা সংবলিত ব্যানার ফেস্টুন লাগিয়েছি। এছাড়াও ট্যুরিস্টবোটগুলো যাতে লাইফ জ্যাকেট ও ফাস্টএইড বক্স সঙ্গে রাখেন তা মনিটরিং করা হচ্ছে। আশা করছি এবারের ঈদের ছুটিতে রাঙ্গামাটিতে পর্যটকদের ভ্রমণ নিরাপদ ও আনন্দদায়ক হবে।

আরমান খান/এনএইচআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।