৪০ চোরাকারবারীর দখলে ৫৩ কিলোমিটার সীমান্ত


প্রকাশিত: ০৭:০৬ এএম, ১৯ আগস্ট ২০১৬

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর সীমান্ত রাজত্ব করছে ৪০ চোরাকারবারী। যার তালিকা স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে রয়েছে। গুটি কয়েক চোরাকারবারী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ধরা পড়লেও গডফাদাররা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোয়ার বাইরেই।

এছাড়া রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় তারা তাদের কর্মকাণ্ড অব্যাহত রাখে। তবে পুলিশ ও বিজিবির দাবি চোরাকারবারীরা এখন কোনঠাসা। কঠোর নজরদারীর কারণে তাদের কর্মকাণ্ড স্থবির হয়ে পড়েছে।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা গেছে, কুষ্টিয়া জেলার পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত দৌলতপুর উপজেলার সঙ্গে প্রতিবেশী দেশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ ও নদীয়া জেলার সীমান্ত রয়েছে। দৌলতপুর উপজেলার উত্তর-পশ্চিমে পদ্মা নদী তীরবর্তী চিলমারির চর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে কাজিপুর পর্যন্ত সীমান্ত রয়েছে ৫৩ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২৮ কিমি জুড়ে ভারতীয় অংশে কাঁটা তারের বেড়া। বাকি ২৫ কিলোমিটার কাঁটা তারের বেড়াহীন অংশ দিয়ে চলে চোরাচালান।

ভারতীয় লাগোয়া জেলার এই ৫৩ কিলোমিটারের বিশাল সীমান্ত হয়ে প্রতিদিন রাতের আধারে দেশে প্রবেশ করছে অস্ত্র, ফেনসিডিল, হেরোইন এমনকি ইয়াবার চালান। চোরাচালান রোধে বিজিবির পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তৎপর হলেও তা নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না। বিশেষ করে কাঁটাতারের বেড়া বিহীন সীমান্তবর্তী চিলমারি, উদয়নগর, ঠোটারপাড়া, শেওড়াতলা, ধর্মদহ, বিলগাথুয়া ও রামকৃষ্ণপুর ইউনিয়ন চোরাকারবারীদের অভয়ারাণ্য।
 
স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারাদিন সীমান্ত এলাকায় প্রায় সুনসান নীরবতা থাকে। হঠাৎ হয়ত কাউকে সীমান্তের ওপার থেকে টুকিটাকি কিছু জিনিসপত্র নিয়ে আসতে দেখা যায়। কিন্তু রাত হলেই পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। গোটা এলাকা হয়ে ওঠে জমজমাট। আনাগোনা শুরু হয় ভ্যান, সাইকেল ও মোটরসাইকেলের।

সীমান্ত জুড়ে ৫-৬ কিলোমিটার পর পর রয়েছে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড বা বিজিবির সীমান্ত চৌকি। ওপারে রয়েছে বিএসএফ। দুদিকের সীমান্ত রক্ষীদের অবস্থান ও টহল সম্পর্কে সব খোঁজ-খবর নিয়েই নির্বিঘ্নে এসব চোরাচালান চলে।
 
সাহেবনগর ইউনিয়নের কৃষক বদর উদ্দিন বলেন, পুলিশ ও বিজিবির এক শ্রেণির লোকের সহায়তায় চোরাচালান চলে। আবার ওপারে বিএসএফের সঙ্গেও চোরাচালানিদের যোগাযোগ আছে। ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের ইন্ধন ও বিজিবি-পুলিশের সহায়তা ছাড়া অবাধে চোরাচালান চলতে পারে না।
 
তবে সাম্প্রতিকালে চোরাচালান এসব পণ্যের চাহিদায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আগে ভারত থেকে শাড়ি, পোশাক ও প্রসাধনী সামগ্রী আসলেও কয়েক বছর ধরে আসছে অস্ত্র, মাদক ও স্বর্ণালংকার। অবশ্য পুলিশ ও সীমান্তের অতন্দ্রপ্রহরী বিজিবির দাবি বিশাল সীমান্ত এরিয়া নিয়ন্ত্রণ করা অসম্ভব। সীমান্তে চোরাচালান রোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা।

বিজিবির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি সূত্র জানান, আমাদের লোকবল কম। রাস্তাঘাটও ভালো নয়, যানবাহনও অপর্যাপ্ত। অন্যদিকে আমাদের তুলনায় বিএসএফের ক্যাম্পের সংখ্যা তিনগুণ বেশি। তাদের দিকে রাস্তঘাট বেশ ভালো। তাদের পর্যাপ্ত যানবাহনও আছে। ওপারে কড়াকড়ি করা হলে চোরাচালান কমত।

দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৪০ চোরাকারবারী

সীমান্তবর্তী দৌলতপুর উপজেলার ৫৩ কিলোমিটারের বিশাল সীমান্ত জুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে তালিকাভূক্ত ৪০ চোরাকারবারী। এরা হলেন- উপজেলার ডাংমড়কা বাজার এলাকার শহিদুল বিশ্বাস, রামকৃঞ্চপুর ইউনিয়নের মাহাবুল মেম্বার, ভাগজোদ নিজপাড়া এলাকার পিলকজান, আক্তার, ভাগজোদ তালতলা এলাকার টিটু মেম্বার, বিজি বিশ্বাস, শরীফুল, চল্লিশপাড়া এলাকার আমজাদ হোসেন, আব্দুল কুদ্দুস, মুন্সিগঞ্জ এলাকার মোকাদ্দেস।

ভাগজোত কাস্টমস এলাকার বাদশা দফাদার, আক্কাস আলী, রাশেদ, রফিকুল, পাতন, পাকুরিয়া এলাকার লাবু, কালু মোল্লা, মুকুল মাস্টার, আরজেদ, আমিনুল, জামালপুর এলাকার লাল্টু, আরিফ, টাইগার, হোসেনাবাদ এলাকার ময়েন, রাজু, বাগমারি এলাকার জৈমুদ্দিন, মোহম্মদপুর এলাকার কালাম, বাহিরমাদি এলাকার শাহাজুল, কাউসার, বিলগাথুয়া এলাকার জুয়েল, সাতা, ধর্মদাহ এলাকার বাবু, দয়রামপুর এলাকার তেদের, আজম, হাসেম, চকদিয়াড় এলাকার হাসান ও প্রাগপুর ইউনিয়নের হেবল।

অস্ত্র ও মাদকসহ সবধরনের চোরাইপণ্যের নিয়ন্ত্রক এরা। মাঝে মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে চোরাকাবারীদের সংঘর্ষ কিংবা গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। তবে স্থানীয়দের মতে ওরা রাজনৈতিক পৃষ্টপোষকতায় পরিচালিত হয়। সে কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় তাদের বিচরণ। বিজিবিও অসহায়।

কারা চোরাকারবারীর সঙ্গে সম্পৃক্ত তা বিজিবি কিংবা পুলিশের অজানা নয়। তারপরও তাদের কর্মকাণ্ড ওপেন সিক্রেট। পুলিশ বলছে তালিকা অনুযায়ী চোরাকারবারীদের গ্রেফতারে অভিযান চলছে। আর বিজিবির দাবি আগের চেয়ে চোরাকারবারীদের তৎপরতা অনেকাংশে কমে গেছে।

কুষ্টিয়া ৪৭ রাইফেল ব্যাটালিয়ন কমান্ডার লে. কর্নেল শহিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, সীমান্তবর্তী এলাকাতে চোরাচালান বন্ধে বিজিবি প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। তবে আমাদের একার পক্ষে চোরাচালান বন্ধ করা সম্ভব না। চোরাচালান সম্পূর্ণরুপে বন্ধ করতে সীমান্ত এলাকার মানুষকে সচেতন হতে হবে। এই এলাকার মানুষকে সচেতন করার জন্য আমরা নিরলসভাবে কাজ করছি এবং তাদের সঙ্গে মতবিনিয়ম অব্যাহত রয়েছে।

এফএ/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।