ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটির দুর্দিন
শীতল পাটির নাম শুনলেই দেহ-মনে চলে আসে প্রশান্তি। প্রশান্তি আনা এই শীতল পাটি এক সময় বাংলার ঘরে ঘরে শোভা পেতো। বাঙালি সংস্কৃতির চিরায়ত শিল্পটির কথা বার বার উঠে এসেছে ইতিহাসে। শিল্পটির খ্যাতি ছিল পুরো ভারতবর্ষ জুড়ে। বাংলাদেশের পিরোজপুরের কাউখালীর শীতল পাটির খ্যাতি ছিল ভারতবর্ষ জুড়ে।
নানামুখী সমস্যায় পড়ে কাউখালীর শীতল পাটির খ্যাতি আজ বিলুপ্তির পথে। অথচ এই শিল্পের বিকাশের যথেষ্ট সুযোগ ও সম্ভাবনা রয়েছে। ঐতিহ্যবাহী শীতল পাটি কারিগররা আজ আর্থিক অনটন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও শিল্পের প্রয়োজনীয় উপকরণের দুষ্প্রাপ্যতা, ক্রেতা স্বল্পতার কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। বাপ-দাদার এ ঐতিহ্যবাহী শিল্প এখন হুমকির মুখে। এরপরও এ আদি শিল্প সুবিদপুর গ্রামের মানুষ আঁকড়ে ধরে আছে। 
সাহায্য সহযোগিতা আর পৃষ্টপোষকতার অভাবে গ্রামের প্রায় ৪৫টি পরিবার চরম দুর্দিনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। বাজার ঊর্ধ্বগতি আর শীতল পাটির ন্যায্য মূল্যের অভাবে পূর্ব পুরুষদের কাজটি ধরে রাখতে পারছেন না।
শীতল পাটির তৈরির একমাত্র কাঁচামাল হচ্ছে- পাইত্রা নামক এক জাতীয় গাছ। এই গ্রামে এক সময় প্রায় ৮০/৯০ একর পাইত্রা বন ছিল। এই ৮০/৯০ একর পাইত্রা বনের মালিক ছিল সুবিদপুর গ্রামের ৪৫/৫০টি পাটিকর পরিবার। আজ সময়ের আবর্তনে অভাবের তাড়নায় ও ভূস্বামীদের কলকাঠিতে পাইত্রা বন বিক্রি করতে হয়েছে। আজ তারা নিঃস্ব অসহায়। এক সময় পরিবারের শিশু কিশোর বৃদ্ধসহ সবাই সম্মিলিতভাবে পাটি বুননের কাজ করতেন। পাটি শিল্পটি হল জড়িত পরিবারগুলোর আয়ের একমাত্র উৎস। 
বছরের পর বছর ধরে এ কাজ করে যাওয়া পরিবারগুলো বেশ কিছুদিন যাবৎ মারাত্মক সমস্যায় পড়েছে। পাইত্রা বন একদম কমে গেছে। সে বনে এখন ঘর বাড়ি বা অন্য জমি অন্য কিছুর চাষাবাদ চলছে। ফলে পর্যাপ্ত পাইত্রা না পাওয়ার কারণে পেশাটিকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পূর্বে এক পন পাইত্রা ৫০ টাকায় পাওয়া যেত। এখন সেই পাইত্রা পন বিক্রি হচ্ছে ২৫০/৩০০ টাকায়।
সরেজমিনে পিরোজপুরের কাউখালী উপজেলার সুবিদপুর গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিভিন্ন বয়সের নারী-পুরুষের কর্মব্যস্তার শেষ নেই। কেউ উঠানে বসে পাটি বুুনছে, কেউ পাইত্রা কাটছে, আবার কেউবা পাইত্রা গাছের বেত ছড়াচ্ছেন। প্রতিটি বাড়ির আঙিনা ও ঘরে সমান তালে পাটি বুননের কাজ চলছে দিন-রাত। 
শীতল পাটির যে সকল শিল্পীরা তাদের পেশাটিকে নিয়ে বিপাকে পড়েছেন এদেরই একজন দিপালী রানী পাটিকর (৩৭) তার পরিবার বহু বছর ধরে বংশানুক্রমে এ পেশাটি চলিয়ে আসছেন। তিনি খুব ছোটবেলা থেকে এ পেশার সঙ্গে জড়িত আছে। তার পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৯ জন। তারা সবাই মিলে মিশে পাটি বুননের কাজ করে থাকেন। পরিবারের সকল সদস্যদের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি পাটি তৈরি করতে কমপক্ষে ৫/৬ দিন সময় লাগে। তাদের তৈরি পাটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা ব্যবসায়ীরা তাদের কাছ থেকে কিনে নিয়ে যায়।
একটি শীতল পাটি এক হাজার টাকা থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রি করেন। কিন্তু পাইত্রার আকাশ চুম্বি দামের কারনে এখন আর ভাল ব্যবসা হয় না। জমা সব টাকাই পাইত্রা কিনতে চলে যায়। মাসে আয় হয় মাত্র ৫/৬ হাজার টাকা। সামান্য আয়ে সংসার চালাতে হিমসিম খেতে হয় দিপালী রানীকে। 
দিপালী রানীর স্বামী অনিল চন্দ্র পাটিকর (৫৫) জানান, পাটি তৈরি করে যা আয় করি তা দিয়ে সংসার চালাতে খুবই কষ্ট হয়।
অপরদিকে আরতি রানী জানায়, শিশু বয়স থেকেই এ কাজ করে আসছি। বাবার সংসারেও এ কাজ করতাম। আবার স্বামীর সংসারে এসেও এ কাজ করছি। কিন্তু বর্তমানে আমরা বড় সমস্যার মধ্যে দিন কাটাচ্ছি। আগে পাইত্রার কোনো জোড়া না দিয়েই একটি ৫/৬ হাঁত পাটি তৈরি করতাম। কিন্তু এখন ভালো লম্বা পাইত্রার অভাবে পাইত্রা জোড়া দিয়ে পাটি তৈরি করতে হয়। আর এজন্য পাটির ভালো দাম পাই না। আগে নিজেদের পাইত্রার জমি ছিল। এখন আর তা নেই। অভাবের তাড়নায় পাইত্রা জমি বিক্রি দিয়েছি। পাইত্রা বাহির থেকে কিনে ভালো ব্যবসা করতে পারি না।
সময়ের আবর্তনে এই সুবিতপুর গ্রামের পাটি শিল্পের বয়স অনেক হয়েছে। পাটি শিল্পের জন্য বিখ্যাত হওয়ায় সুবিদপুরকে পাটিপাড়া বলা হয়। ১৯৭০ সালে সম্মিলিত সবার প্রচেষ্টায় গঠিত হয়েছে সুবিদপুর শীতলপাটি সমবায় সমিতি।
সমিতির সভাপতি খোকন চন্দ্র পর্টিকর জানান, সিডর পরবর্তী সময়ে ২০টি পরিবারকে মোট এক লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছিল এবং তাদের সমিতিতে তিন লাখ টাকা বিনা সুদে দেয়া হয়। এই তিন লাখ টাকা থেকে সর্বমোট ৫০ জন পার্টিকরকে ছয় হাজার টাকা করে সাপ্তাহিক কিস্তিতে ঋণ দেয়া হয়। এই ঋণের টাকা দিয়ে আমরা কোনো মতে টিকে আছি।
তিনি আরো বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠান বা সরকার তাদের আরো পৃষ্টপোষকতা করে তবে এই শিল্পটি আরো উজ্জল সম্ভাবনাময় হতে পারে। অর্জিত হতে পারে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা। 
কাউখালী সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আমিনুর রসিদ মিল্টন জানান, এই পেশায় প্রায় ২০০ জন লোক কর্মরত রয়েছেন। এই শিল্পকে বহির্বিশ্বের দরবারে আরো ব্যপক পরিচিতির লক্ষ্যে রাজধানী ঢাকা শহরে একটি শো-রুম করা প্রয়োজন। এতে শিল্পের আরো ব্যাপক পরিচিতি লাভ করবে।
এ ব্যাপারে কাউখালী উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এস. এম আহসান কবীর জানান, সুবিদপুরে গ্রামে শতাধিক পরিবার শীতল পাটি বুননের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। বর্তমানে তারা অসহায় জীবনযাপন করছে।
শীতল পাটির ঐতিহ্যকে ধরে রাখতে সরকার যদি ব্যাংক ঋণের ব্যবস্থা করেন তাহলে হারানো ঐতিহ্যকে আবার ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
হাসান মামুন/এআরএ/এমএস