আত্মহত্যা করব তবুও পাক বাহিনীর হাতে ধরা দিব না
মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল জব্বার (৬২)। তিনি একজন সাবেক ইউনিয়ন সচিব এবং উপজেলা সাংগঠনিক কমান্ডার। বাড়ি নওগাঁ জেলার সাপাহার উপজেলার বড় মির্জাপুর গ্রামে। স্ত্রী জয়নুব বেগম গৃহিণী। তিন ছেলে ও এক মেয়ে নিয়েই তাদের সংসার।
বৃহস্পতিবার শহরের মুক্তি কমিউনিটি সেন্টারে ‘মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা’ প্রদান অনুষ্ঠানে এসেছিলেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের কিছু স্মৃতির কথা জানতে চাইলে অনেক ইতিকথার মধ্যে দুটি ঘটনার কথা শুনালেন তিনি।
তিনি বলেন, দেশকে শত্রুমুক্ত করতে ও বঙ্গবন্ধুর ঘোষণায় মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করা। ১৯৭১ সালে মে মাসের সম্ভবত ৩ তারিখ ভারতের শিলিগুড়ি পানিরঘাট ক্যাম্পে ট্রেনিং করা হয়। ট্রেনিং শেষে ২৮ জনের একটি দলের প্রধান করে বাংলাদেশ পাঠায় আমাদের। পাঁচবিবি জেলার কামারপাড়া ইপিআর ক্যাম্পে মে মাসের ৪ তারিখে পাকিস্তানি বাহিনীদের ঘেরাও করা হয়।
সন্ধ্যার একটু আগে শুরু হয় যুদ্ধ। এসময় কৌশলে অন্য দিক দিয়ে প্রায় ২৮ ট্রাক পাক বাহিনী এসে চারদিক আমাদের ঘিরে ফেলে। নিরুপায় হয়ে যায়। ভাবতে লাগলাম কী করা যায়। যদি কোনো মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়ে তাহলে হয়তো বহুত কষ্ট দিয়ে মারবে। এজন্য প্রত্যেক মুক্তিযোদ্ধার কাছে একটি করে বুলেট থাকে। আত্মহত্যা করব তবুও পাকিস্তানিদের হাতে ধরা দিব না।
এমন সময় ভারতের সৈনিকরা তাদের বিমান দিয়ে উপর থেকে গুলি চালানো শুরু করে এবং ট্যাংক দিয়ে আমাদের সহযোগিতা করে। সেদিন যুদ্ধে কতজন যে পাকিস্তনি সৈন্য মারা গিয়েছিল তার হিসেবে নেই।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাক হানাদার বাহিনী ও দেশীয় রাজাকাররা জেলার সাপাহার সদরে একটি বিদ্যালয়ে ক্যাম্প গঠন করে। স্কুলটি এখন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় নামে পরিচিত। তারা এ ক্যাম্প থেকে বিভিন্ন গ্রামের মা-বোনদের সম্ভ্রমহানী, নিরীহ গ্রামবাসীকে নির্বিচারে হত্যা এবং বসতবাড়িতে আগুন দিয়ে এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করতে থাকে।
সাপাহারকে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন মুক্তিযোদ্ধারা। সাপাহার থেকে মধুইল আসার পথে একটা বড় ব্রিজ ছিল। কিন্তু আমরা ব্রিজটি ভাঙতে পারিনি সময়ের স্বল্পতার কারণে। মুক্তিযোদ্ধারা ১৩ সেপ্টেম্বর রাতে ওই ক্যাম্প দখল করার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাদের পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যায়। পাক সেনারাও যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়ে অপেক্ষায় থাকে।
রাত প্রায় ৪টার দিকে মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে উভয় পক্ষের মধ্যে শুরু হয় তুমুল লড়াই। সেখানে ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা ধরা পড়ে ও ৬ জন মারা যায়। আর প্রায় ১৭৫ পাক সেনা মারা যায়। আহত হন অনেকেই।
পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীরা যখন দলে দলে চলে গেল তখন বুঝতে পারলাম সাপাহার হানাদার মুক্ত হয়। সাপাহার হানাদার মুক্ত হয় ১৩ সেপ্টেম্বর। দেশীয় রাজারকারদের সহযোগিতায় তারা এ লুটতরাজ চালিয়েছিল।
আব্বাস আলী/এফএ/এমএস