এএসপির অনুরোধে বদলে গেলেন ইউপি সদস্য


প্রকাশিত: ১১:৪৮ এএম, ১১ জানুয়ারি ২০১৭
ফাইল ফটো

নিয়মিত জুয়া খেলতেন এক ইউপি সদস্য। এতে সংসারের প্রতি চরম উদাসীন ছিলেন তিনি। কীভাবে চলছে তার সংসার কোনো খেয়াল রাখতেন না। ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যেত কি না তারও খোঁজ নিতেন না তিনি। প্রতিনিয়ত জুয়া খেলার কারণে আর্থিকভাবে দিন দিন ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে তার পরিবার। এছাড়া সামাজিকভাবে হেয় হয় পরিবারটি। এ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে তাকে নিয়ে পরিবারটিতে চলে অশান্তি। ঘটনাটি দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার।

সম্প্রতি বিরামপুর সার্কেল অফিসে নবনিযুক্ত সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হাফিজুর রহমান রিয়েলের ভালো কাজ এবং মহৎ উদ্যোগের কথা জেনে যান উপজেলাবাসী। সেই ভরসায় বড় ভাই ইউপি সদস্যের জুয়া খেলার অভিযোগ নিয়ে বিরামপুর সার্কেল অফিসে আসেন ছোট ভাই।

এসময় তিনি এএসপি হাফিজুর রহমান রিয়েলের কাছে তার বড় ভাইয়ের এমন কর্মকাণ্ড ও পরিবারের অশান্তি তুলে ধরে কান্নাকাটি করেন। তার কথা শুনে সিনিয়র এএসপি হাফিজুর রহমান রিয়েল ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করেন ইউপি সদস্যকে তার কাছে পাঠাতে।

এর পরের ঘটনা পড়ুন হাফিজুর রহমান রিয়েলের ফেসবুক ওয়ালে পোস্ট করা লেখাটিতে। পাঠকের জন্য লেখাটি হুবহু প্রকাশ করা হলো।

‘লোকটা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য। ঘরে বাচ্চা-কাচ্চা আছে। সংসারের কাণ্ডারি লক্ষ্মী একটা বউও আছে। সম্পদ যা আছে মন্দ নয়। চলে যাবে দিনকাল। কিন্তু ভদ্রলোক জুয়া খেলে ইতোমধ্যে সংসারের গণেশ উল্টে দিয়েছেন। নষ্ট করেছেন অনেক সম্পদ। খেলছেন এখনও। সংসার, ছেলে-মেয়ে, মা-বাবা কিংবা স্ত্রীর প্রতি আপাদমস্তক উদাসীন লোকটা। এ দিকটার চেয়ে পান খেয়ে ঠোট লাল করে গলায় মাফলার জড়িয়ে জুয়ার আসরে বসতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।

উপরের অভিযোগগুলো নিয়ে ওই লোকের আপন ছোট ভাই কয়েকদিন আগে এসেছিলেন আমার কাছে। বললেন, স্যার সে আমার ভাই নামের কলঙ্ক। আমাদের সবাইকে সে ভীষণ যন্ত্রণার মধ্যে রেখেছে। আপনি প্লিজ তাকে ধরে চালান করে দিন। তার কারণে আমরা সামাজিকভাবে ছোট হয়ে গেছি। ইজ্জত বলতে কিছুই নেই আমাদের।

কথাগুলো বলতে বলতে হাওমাও করে কেঁদে ফেললেন ভদ্রলোক। বললাম ঠিক আছে আমি আজকেই ব্যবস্থা নিচ্ছি। বিদায় হলেন তিনি। এরপরে ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সাহেবকে অনুরোধ করলাম ওই ইউপি সদস্যকে আমার কাছে পাঠাতে।

কিছুক্ষণ পরে লোকটা এলে বসতে বললাম। তারপরে খুব সহজভাবে বেশ কিছু কথা বললাম। তারপরে বললাম, আপনি পান খান তাইনা? হ্যাঁ খাই। আপনার স্ত্রীর হাতে পান খেয়েছেন শেষ কবে? তা মেলাদিন হবে। খেতে ইচ্ছে করে না? হুম করে। কিন্তু সেতো আর পান বানিয়ে দেয়না। আপনার সন্তান কেমন? হাসতে হাসতে বললেন খুব মেধাবী। ওকে আদর করেন? একটু থেমে বললেন, না মানে টাকা পয়সা যা লাগে সব দেইতো। আপনার ছেলেকে যখন কেউ বলে তুই তো বেটা জুয়াড়ির ছেলে তখন বাপ হিসেবে আপনার কেমন লাগবে। আর যখন বলবে অমুকের ছেলে গোল্ডেন এ প্লাস পেয়েছে, তখন কেমন লাগবে? স্যার পরেরটাই বেশি ভালো লাগবে।

আপনি চান না যে আপনার স্ত্রী আপনাকে আবার পান বানিয়ে দিক, আপনি চান না যে আপনার ছেলে ভালো ফলাফল করে চারদিকে সুনাম কুড়াক। একটা সুন্দর সুখের সংসার কী চান না আপনি, যেখানে সম্পদ না থাকলেও সুখ আর চিরনির্মল একটা শান্তি বিরাজ করবে?

অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, হুম চাই। বললাম তাহলে আপনাকে এই জুয়া খেলার নেশা ছাড়তে হবে। তখন জোহরের আজান হচ্ছিলো। লোকটার হাতটা আমার হাতে নিয়ে বললাম আজ এক্ষুণি আপনাকে শপথ করতে হবে যে আপনি আজ এখন থেকে এই নেশা ছাড়বেন।

তিনি চোখ মুছতে মুছতে বললেন, স্যার আমি আজ থেকে তওবা করলাম আর জুয়া খেলব না। কিন্তু, স্যার এভাবে তো কেউ কখনো আমাকে বুঝিয়ে বলেনি, সবাই শুধু গালমন্দই করেছে আমাকে। এভাবে হাত ধরে কেউ ভালো হতে বলেনি। আমি আর কখনও এই খেলা খেলব না।

বিদায় বেলায় বললাম, আপনার মন চাইলেই এখানে চা খেতে চলে আসবেন। সাথে আমার জন্য একটা মিষ্টি পানও আনবেন। এ কথা শুনে মুচকি হেসে বললেন, আপনি পান খান নাকি? বললাম আপনার সঙ্গে খাবো কোনো অসুবিধা নাই। পানের রঙে লাল হওয়া ঠোঁট গুলিতে একরাশ সলজ্জ হাসি হেসে বললেন, স্যার আমার স্ত্রী খুব ভালো পান বানাতে পারে, খাবেন নাকি? একথা শুনে আমার হাসি দেখে তিনিও হাসতে লাগলেন। ভাবলাম এই হাসিই হোক বদলে যাওয়ার হাসি।’

এমএএস/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।