চিলমারী রক্ষা প্রকল্প ভেস্তে যেতে বসেছে
ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন থেকে কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের ২৫৬ কোটি টাকা ব্যয়ে চিলমারী উপজেলা রক্ষার ৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
এ বাঁধে জিও টেক্রাটাইল ফিল্টার বসানো ব্লক প্লেচিং, ব্লক ডাম্পিং ও জিও ব্যাগ ডাম্পিং এর ফেজ-২ প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের অনিয়মিত তদারকি ও গোপন আঁতাতে ইতোমধ্যে নির্মাণাধীন প্রকল্পের বিভিন্ন স্থানে বাঁধে ধস ও বাঁধ দেবে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
জুন ক্লোজিং এর নামে তড়িঘড়ি করে কাজ সম্পন্ন করতে দুর্নীতির মহৎসব চলছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে এ পরিস্থিতিতে চিলমারীবাসী আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে।
অভিযোগে জানা যায়, ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে সিসি ব্লক তৈরি, কোনো রুপ কম্পেকশন ছাড়াই জিও টেক্রাটাইল ফিল্টার বসানো ও ব্লক প্লেচিং এ মানা হয়নি সরকারের দেয়া নিয়মাবলী। এছাড়া ৫ ক্যাটাগরিতে প্রায় সাড়ে ১২ লাখ সিসি ব্লক তৈরির হিসাব তাদের রেজিস্টারে থাকলেও বাস্তবে এর কোনো মিল নেই। প্রকল্পগুলোর ঠিকাদাররা ক্ষমতাসীন দলের নেতা হওয়ার সুবাদে সিন্ডিকেট করে যে যার মতো ডাম্পিংয়ের কাজটি রাতারাতি সেরেছেন। ফলে সরকারের চিলমারী রক্ষায় নেয়া প্রকল্প ভেস্তে যেতে বসেছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে শুরু হয় উলিপুর উপজেলার বৈরাগীরহাট-চিলমারী বন্দর ডান তীর রক্ষা প্রকল্প ফেজ-টু। ২০১৩, ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে ৩ দফায় ১৯১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ কিলোমিটার বাঁধে ব্লক ফেলার কাজ হাতে নেয় পানি উন্নয়ন বোর্ড। ব্রহ্মপুত্র নদের তীব্র ভাঙন ঠেকানোর জন্য সর্বশেষ ২০১৬ সালে আরও প্রায় দেড় কিলোমিটার বাঁধের পরিধি বাড়িয়ে এই প্রকল্পের টাকা ধরা হয় ২৫৬ কোটি টাকা।
২০১৬ সালে ৯টি প্যাকেজে ৯টি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এই কাজ দেয়া হয় দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে। লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলীকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।
অভিযোগে জানা যায়, উৎকোচ বাণিজ্যের মাধ্যমে নেয়া চলমান কাজগুলোর মধ্যে বেলাল হোসেনের দুটি প্রতিষ্ঠান র্যাব আরসি, টিআইএসবি জেভিকে প্রায় ১৫ কোটি, সুশেনের রূপান্তর জেভি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৫ কোটি, লিয়াকত আলীর এলএলটিজেভি প্রায় ৭ কোটি, আ. মান্নানের এমএ এন্টারপ্রাইজ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৮ কোটি, মাহফুজার রহমানের এমআরসি প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৭ কোটি, খায়রুল কবির রানা প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৮ কোটি, কেএসএ ইমদাদুল হক প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ৭ কোটি এবং খন্দকার শাহিন আহমেদ প্রতিষ্ঠানকে প্রায় ১৩ কোটি টাকার কাজ দেয়া হয়। স্ব-স্ব নামে কাজ পেলেও এইসব প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সাব ঠিকাদার দিয়ে চালাচ্ছে প্রকল্পের কাজ। নিম্ন দরদাতাদের কাজ না দিয়ে উচ্চ দরদাতাদের কাজ দেয়ায় সরকারের ক্ষতি হয়েছে কয়েক কোটি টাকা।

রানীগঞ্জ ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার নাছির উদ্দীন বলেন, ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙন থেকে চিলমারী রক্ষায় নেয়া সরকারি উদ্যোগে আমরা খুবই খুশি। কিন্তু পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের সহযোগিতায় ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো যেভাবে কাজে অনিয়ম ও দুর্নীতি আশ্রয় নিয়েছেন এতে দীর্ঘমেয়াদী সুফল থেকে বঞ্চিত হবার আশঙ্কা রয়েছে। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে ব্লক তৈরি এবং একটি জিওব্যাগ কেটে ছোট দুইটি করে ডাম্পিং করার সময় এলাকাবাসী কাজ বন্ধ করে কর্মকর্তাদের অভিযোগ করেও সুফল পাওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, ৬ কিলোমিটার বাঁধের বিভিন্ন জায়গায় ফাটল বা ধসের ঘটনাটি কোনো ব্যাপার না। ধস ও ফাটল হলে আমরা সারা বছর মেরামত করে যাব। আর কাজে অনিয়মের অভিযোগ মোটেও সত্যি নয়। নিয়মনুযায়ী তৈরিকৃত ব্লক পরীক্ষা করে ফেলা হচ্ছে। ফলে শতভাগ কাজের মান নিশ্চিত করছে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানগুলো। সেখানে আতঙ্কা কিংবা উদ্বেগ হওয়ার কিছুই নেই।
নাজমুল/এমএএস/এসআর