কুড়িগ্রামে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নিয়ে আতঙ্কে সাধারণ মানুষ
কুড়িগ্রামে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধগুলো। জেলায় ২১০ কিলোমিটার বাঁধের মধ্যে গত কয়েক বছরের ভাঙনে ২১ দশমিক ২০ কিলোমিটার বাঁধ নদীগর্ভে বিলিন হয়ে গেছে। এছাড়াও ৫১টি পয়েন্টে অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে ৪৮ কিলোমিটার বাঁধ।
বাঁধ ভেঙে পড়ায় ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার-হাজার পরিবার। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড ও জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
জানা যায়, দেশের উত্তরে ভারত সীমান্ত বেষ্টিত এই জেলায় রয়েছে ছোট-বড় ১৬টি নদ-নদী। ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, গঙ্গাধর আর দুধকুমারসহ এসব নদ-নদীতে প্রতিবছর পানি বৃদ্ধি কিংবা কমার সময় চলে তীব্র ভাঙন। ভাঙনের কবলে পরে ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে হাজার-হাজার পরিবার। বসতভিটা ও জমি হারিয়ে স্বর্বশান্ত ভাঙন কবলিতদের অনেকের ভাগ্যে মিলছে ঠাঁই। খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হয় অনেক পরিবারকে। এছাড়াও ভাঙনের ফলে বিলিন হচ্ছে সরকারি প্রতিষ্ঠানসহ হাটবাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাস্তাসহ অনেক স্থাপনা। প্রতিবছর নদ-নদীর ভাঙন এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় জেলার ফসলি জমি কমে আসছে।
জেলার রাজারহাট উপজেলার বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তৈয়ব খাঁ এলাকার আইজার রহমান (৬৫) জানান, তিস্তা নদীতে পানি বাড়ার ফলে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ পর্যন্ত আটবার নদী ভাঙনের ফলে বাঁধে আশ্রয় নিয়েছি। এবার বাঁধও ভেঙে যাচ্ছে। জানিনা পরিবার নিয়ে কোথায় যাব।
একই এলাকার কাঁচামাল ব্যবসায়ী মতিয়ার রহমান জানান, পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিস্তা নদীতে ভাঙন বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে তৈয়ব খাঁ বাজারের একাংশ নদীতে বিলিন হয়েছে। ভাঙনের মুখে রয়েছে তৈয়ব খাঁ জামে মসজিদ, বিদ্যানন্দ নিন্ম মাধ্যমিক বিদ্যালয়, তৈয়ব খাঁ বাজার, সার্বজনিন মন্দিরসহ শতশত বসত-বাড়ি।
কুড়িগ্রাম সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আইয়ুব আলী সরকার জানান, জেলার নাগেশ্বরী ও কুড়িগ্রাম সদরের মধ্যে দুধকুমার, গঙ্গাধর ও ব্রহ্মপূত্র নদের ভাঙনে কালিগঞ্জ, বামনডাঙ্গা, বেরুবাড়ি, নুনখাওয়া, ঘোগাদহ ও যাত্রাপুর ইউনিয়ন দিয়ে চলে যাওয়া শহর রক্ষা বাঁধের এসব অংশে ছিঁড়ে যাওয়ায় বাঁধ সংলগ্ন পরিবারগুলো ভিটেমাটি হারিয়েছে। এছাড়াও যারা বাঁধে রয়েছে, তারাও আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে।

রাজিবপুর উপজেলার মোহনগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন জানান, ব্রহ্মপূত্র নদের তীব্র ভাঙনে এই ইউনিয়নের নয়ারচর বাজারের ৪৯টি দোকানঘর বিলিন হয়ে গেছে। এই নদীর অব্যাহত ভাঙনে উপজেলার বসতভিটা ও কৃষিজমি মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, ধরলা নদীর পানি ব্রিজ পয়েন্টে ২৫ দশমিক ৩৫ সে.মি. তিস্তা নদীর পানি কাউনিয়া রেল ব্রিজ পয়েন্টে ২৮ দশমিক ০৫ সে.মি. ব্রহ্মপুত্র নদের নুনখাওয়া পয়েন্টে ২৫ দশমিক ১৮ সে.মি. এবং ব্রহ্মপুত্র নদে চিলমারীর রমনা ঘাট পয়েন্টে ২২ দশমিক ৯৬ সে.মি. সোমবার সকাল ৬টায় পরিমাপ করা হয়।
গত ২৪ ঘণ্টায় ধরলা নদীতে ১৫ সে.মি., তিস্তা নদীতে দশমিক ২৯ সে.মি., ব্রহ্মপুত্র নদের নুনখাওয়া পয়েন্টে দশমিক ১১ সে.মি. এবং ব্রহ্মপুত্র নদের চিলমারী পয়েন্টে দশমিক ১৩ সে.মি. পানি বেড়েছে।
জেলা ত্রাণ শাখা সূত্র জানায়, জুন মাসের শেষ সপ্তাহে রাজারহাট উপজেলায় তিস্তা নদীর ভাঙনে ৫০টি পরিবার এবং ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে রাজিবপুর উপজেলায় মোহনগঞ্জ ইউনিয়নে ৪৯টি দোকান ঘর বিলিন হয়ে যায়। বাড়ি ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের প্রত্যক পরিবারকে দু’হাজার টাকা ও ৩০ কেজি করে চাল এবং ক্ষতিগ্রস্ত দোকান মালিকদের তিন হাজার টাকা এবং ৩ কেজি করে চাল দেয়া হয়।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম জানান, ক্ষতিগ্রস্ত বাঁধ মেরামতের জন্য ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হলেও পাওয়া গেছে মাত্র ৬০ লাখ টাকা। ইতোমধ্যে রাজারহাটের বিদ্যানন্দ ইউনিয়নের তৈয়ব খাঁ এলাকায় তিস্তা নদীর ভাঙন কবলিত স্থানে জিও ব্যাগ ও পাইলিং-এর কাজ চলমান রয়েছে। এছাড়াও ১০টি পয়েন্টে সংস্কার কাজে টেন্ডার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুরু করা হচ্ছে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
এমএএস/এমএস