৪ কেজি গম কম দেয়ার প্রতিবাদ করায় কলেজছাত্রকে নির্যাতন
কুড়িগ্রামের উলিপুরে ভিজিএফের গম ১৩ কেজির পরির্বতে ৯ কেজি নিতে অস্বীকার করায় নুর আলম (২০) নামে এক ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করেছে চেয়ারম্যানের পেটোয়া বাহিনী।
বর্তমানে সে উলিপুর হাসপাতালে ১৩নং বেডে চিকিৎসাধীন। ঘটনাটি ঘটেছে রোববার দুপুরে উপজেলার গুনাইগাছ ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ে।
আহত নুর আলম বলেন, ‘আমার মা নুর বানু বেগম (৪৫) অসুস্থ থাকায় তার পরিবর্তে আমি রোববার দুপুরে স্লিপের ভিজিএফ এর গম নিতে যাই। এসময় ১৩ কেজি গমের পরিবর্তে চেয়ারম্যানের লোকজন আমাকে ৯ কেজি গম দেয়। আমি ১৩ কেজি গম চাইলে কথাকাটাকাটি হয়। কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে গ্রাম পুলিশ মেহেরুল ইসলাম, চেয়ারম্যানের লোক ফয়জার রহমান (৩২), রাজু মিয়া (৩৫), জহুরুল হকসহ (৩৬) বেশ কয়েকজন আমাকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মারধর করে পরিষদের রুমে নিয়ে যেতে চায়।’
এসময় স্থানীয় লোকজন ও স্বজনরা আমাকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে উলিপুর হাসপাতালে ভর্তি করে। এ ঘটনায় নুর আলম বাদী হয়ে উলিপুর থানায় অভিযোগ করেছেন।
নির্যাতনের শিকার ওই ছাত্রের মা নুর বানু বেগম বলেন, অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে ছেলেকে পড়াশুনা করাচ্ছি। স্বামী না থাকায় দীর্ঘ ২০ বছর ধরে বাবার বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে মা-ছেলে বসবাস করে আসছি। পড়াশুনা করা ছেলে অন্যায়ের প্রতিবাদ করায় প্রভাবশালীদের হাতে মার খেয়ে আজ আমার সন্তান হাসপাতালে ভর্তি। আমি চেয়ারম্যান ও তার পেটোয়া বাহিনীর বিচার চাই।
তিনি জানান, মেধাবী ছাত্র নুর আলম এসএসসি ও এইচএসসিতে গোল্ডেন জিপিএ-৫ পাওয়ায় ‘মিজান মেধাবী দেশের মুখ’ এর পক্ষ থেকে নাট্য অভিনেতা আবুল হায়াৎ ও বিপাশা হায়াৎ উলিপুরে এসে তাকে সংবর্ধিত করে। বর্তমানে নুর আলম কুড়িগ্রাম সরকারি মহাবিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অনার্স প্রথম বর্ষে পড়াশুনা করছেন। এ ঘটনায় এলাকায় তোলপার শুরু হয়েছে।
খবর পেয়ে সোমবার সকালে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হায়দার আলী মিঞা ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম আহত নুর আলমকে উলিপুর হাসপাতালে দেখতে যান এবং চিকিৎসার খোঁজখবর নেন।
সোমবার দুপুরে গুনাইগাছ ইউপি পরিষদে সরেজমিনে দেখা যায়, ভিজিএফ এর গম বিতরণ চলছে। এ সময় ৫০ কেজি বস্তায় প্রতি চারজনকে দেয়া হচ্ছে। জব্বার (৫০), বুলবুল আহমেদ (২৫), মাসুদ (২৬) ও কামরুল (৩০) বলেন, আমাদের ১৩ কেজি গম না দিয়ে ৫০ কেজি ওজনের গমের বস্তা দেয়। যাদের চারজন লোক ছিল না তাদের অনেককেই ১০ থেকে ১১ কেজি করে গম দেয়া হয়।
তারা আরও বলেন, ভিজিএফের স্লিপ যাদের পাওয়ার কথা তাদের না দিয়ে চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ তাদের লোকজন ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে একটি করে স্লিপ বিক্রি করে পাইকারদের কাছে। সাধারণ উপকারভোগীর চেয়ে পাইকাররাই আসছে গম তুলতে।
এসময় গাবেরতল এলাকার বক্করের ছেলে সাবু মিয়া (১৫) পাইকারের দেয়া স্লিপ নিয়ে গম তুলে দেয়ার জন্য ৫০ টাকার বিনিময়ে লাইনে দাঁড়ায়।
পাইকার মোখলেস শতাধিক নামের স্লিপ নিয়ে গম তুলতে আসে। পরে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে পালিয়ে যায়। আরেক পাইকার রহিম সরদার প্রায় ৫০টির বেশি স্লিপ নিয়ে গম তোলেন। তাকে হাতে নাতে ধরলে তিনি জানান, পরিষদের পাশে দোকানদার মোস্তফার কাছ থেকে একটি করে স্লিপ ১৫০ থেকে ১৮০ টাকায় কিনে নিয়েছেন। তিনি সেই স্লিপের গম লোক মাধ্যমে তুলে নিচ্ছেন ৫০ টাকার বিনিময়ে।
রিলিফ অফিসার নুরে আলম সিদ্দিকী জানান, আমার জানা মতে ভিজিএফ এর গম কাউকে কম দেয়া হয়নি। তবে ছাত্র আহত হওয়ার ঘটনা তিনি স্বীকার করেন।
গুনাইগাছ ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ খোকা বলেন, এসময় আমি ইউনিয়ন পরিষদের ভেতরে ছিলাম। হইচই শুনে আমি ছাত্তার মেম্বারসহ তাকে উদ্ধার করি। তবে এ ঘটনায় তার কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন।
উলিপুর থানা পুলিশের অফিসার ইনাচার্জ এস.কে আব্দুল্যা আল সাঈদ অভিযোগ পাওয়ার কথা স্বীকার করে বলেন, বিষয়টি তদন্ত পর্যায়ে রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ শফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনার তদন্ত করে দোষী ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
নাজমুল/এমএএস/আরআইপি