আলোর ফাঁদে পোকা মেরে বেগুনচাষির বাজিমাত
পার্বত্য খাগড়াছড়ির মাটিরাঙা উপজেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার উত্তরের এক নিভৃত পল্লী খেদাছড়া। শহর ছাড়িয়ে চারদিকে সবুজের ছায়ায় ঢাকা পাহাড়ি পল্লী। সেখানেই আলোর ফাঁদে পোকা দমনের মাধ্যমে বেগুন চাষে বাজিমাত করেছেন মো. আবদুল হাই নামের এক কৃষক।
মাটিরাঙা উপজেলা সদর ছাড়িয়ে গ্রামীণ সড়কের পাশে ২ বিঘা জমিতে বেগুনের খেত, খেতের মাঝখানে ঝুলছে ১০-১৫টি বৈদ্যুতিক বাল্ব। বাল্বের নিচে বসানো ডিটারজেন্ট মেশোনো পানির পাত্রে অসংখ্য ফ্রুট ওয়ার্ম (বেগুনে ছিদ্রকারী পোকা) মরে পড়ে আছে।
কোনো প্রকার ক্ষতিকারক কীটনাশকের ব্যবহার ছাড়া এভাবেই পোকা দমনের মাধ্যমে বেগুন চাষ করে বাজিমাত করেছেন কৃষক মো. আবদুল হাই। শুধু বাজিমাতই করেননি বেগুন চাষে পেয়েছেন অসামান্য সাফল্য। কৃষি বিভাগের সহযোগিতা নিয়ে গত ৭-৮ বছর ধরে বেগুন চাষ করছেন বাড়ির আঙিনার পাহাড়ি জমিতেও। প্রতিবছর তার উৎপাদিত বেগুন থেকে আয় করছেন প্রায় তিন থেকে চার লাখ টাকা।
মাটিরাঙা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের মাধ্যমে খাগড়াছড়ি পাহাড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র ও গাজীপুরের বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে বিষমুক্ত সবজি চাষের উপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ গ্রহণের মাধ্যমে আবদুল হাই উপজেলার একমাত্র প্রশিক্ষিত কৃষক।
সম্প্রতি সরেজমিনে আবদুল হাইয়ের বাগান ঘুরে দেখা গেছে, বাড়ির আঙিনায় প্রায় দুই একর পাহাড়ি টিলা ভূমিতে বেগুনের চাষ করেছেন আবদুল হাই। পুরো বছরজুড়েই বেগুন বিক্রি করে থাকেন এ কৃষক। অনেক সময় পাইকাররা তার জমি থেকেই বেগুন নিয়ে যায় বলে জানান কৃষক মো. আবদুল হাই।
বেগুন চাষই তার আয়ের একমাত্র উৎস জানিয়ে মো. আবদুল হাই জানান, ছোটবেলায় বাবা মারা যাওয়ায় সংসারের প্রয়োজনেই কৃষি পেশায় যুক্ত হন। বসত বাড়ির আঙিনায় গ্রীষ্মকালীন টমেটো চাষ করে চট্টগ্রাম বিভাগের সেরা কৃষকের খেতাব লাভ করে।

শুরুর দিকে উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় মুনাফা কম পাওয়া যেত জানিয়ে কৃষক আবদুল হাই বলেন, প্রথম দুই বছর পর থেকেই অধিকহারে মুনাফা আসতে শুরু করে। তার পাহাড়ি ভূমির মাটি বেগুন চাষের উপযুক্ত হওয়ায় এবং সঠিক পরিচর্যার কারণে প্রচুর ফলন হয়। বেগুন চাষে শুধুমাত্র কৃষক মো. আবুদল হাই লাভবানই হচ্ছেন না পাশাপাশি তার বেগুন খেতে আরো ৪-৫ জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।
বেগুন খেতে পোকা দমনে আলোর ফাঁদ ব্যবহার প্রসঙ্গে কৃষক মো. আবদুল হাই বলেন, জমিতে কীটনাশক বা ওষুধ ব্যবহার করা বেশ ব্যয়বহুল এবং মানুষের শরীরের জন্য ক্ষতিকারক। রাতের বেলা বাঁশের খুটিতে লাগানো সাদা বাল্বের আলোয় আকৃষ্ট হয়ে কীটপতঙ্গ আসে, বাল্বের নিচে থাকা ডিন্টারজেন্ট মাখানো পানির পাত্রে একবার পরে গেলে আর উঠতে পারে না। এভাবে বেগুন ছিদ্রকারী কীটপতঙ্গসহ সবজি খেতের ক্ষতিকর অনেক পোকা মারা যায়।
তবে পোকা দমন করা গেলেও পাতা সাদা হয়ে যাওয়া, ফুল পচে যাওয়া এবং গাছের গোড়ায় পঁচন রোধ করা গেলে আরো লাভবান হওয়া যেতো বলে মনে করেন কৃষক আবদুল হাই।
আবদুল হাইয়ের বেগুন চাষ থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে অনেকেই পাহাড়ি ঢালু কিংবা সমতল ভূমিতে বেগুন চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন জানিয়ে মাটিরাঙা উপজেলা উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন বলেন, প্রায় ৬-৭ বছর ধরে কৃষক আবদুল হাই বেগুন চাষ করছেন। অল্প কয়দিনেই বেগুন চাষে তার ঈর্ষণীয় সাফল্য এসছে।
মুজিবুর রহমান ভুইয়া/এফএ/এমএস