পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্বিষহ জীবন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি রাঙ্গামাটি
প্রকাশিত: ০৫:২৭ পিএম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
পাহাড়ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের দুর্বিষহ জীবন

আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ার পরও মানবেতর পরিস্থিতিতে দুর্বিষহ জীবন কাটছে রাঙ্গামাটিতে ১৩ জুনের ভয়াল পাহাড়ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের।

ঘটনার পর টানা আড়াই মাসের অধিক আশ্রয়কেন্দ্রে দুর্বিষহ দিন কাটছে তাদের। ৭ সেপ্টেম্বর বন্ধ করে দেয়া হয়েছে আশ্রয়কেন্দ্রগুলো। এরপর আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে এখন আরও দুঃসহ মানবেতর দিন কাটছে তাদের। কোথাও যাওয়ার নেই। তাই এখনও অনেকে পড়ে রয়েছেন আশ্রয়কেন্দ্রে।

অথচ সরকারিভাবে বন্ধ আশ্রয়কেন্দ্র। অনেকে গেছেন আত্মীয় বাড়ি, ভাড়া বাসায়, আবার কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ ভিটায় ফিরে বাস করছেন বাড়িঘর মেরামত করে। সরেজমিন এসব তথ্যচিত্র পাওয়া যায়।

১৩ জুন পাহাড়ধসের ঘটনায় শহরসহ জেলায় সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ১২৩১ এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ৯ হাজার ৫৩৭। প্রাণহানি ঘটে ১২০ জনের।

জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, ১৩ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্তদের আশ্রয়ে সরকারিভাবে খোলা হয় ১৯ আশ্রয়কেন্দ্র। শুরুর দিকে এসব কেন্দ্রে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন স্বজন ও বাড়িঘর হারা প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মানুষ। পরে অনেকে চলে যাওয়ায় সর্বশেষ চালু রাখা হয়েছিল ৬ আশ্রয়কেন্দ্র।

গত ৭ সেপ্টেম্বর সেগুলো গুটিয়ে বন্ধ করে দেয়া হয়। বিদায় বেলা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রত্যেক পরিবারকে নগদ ৬ হাজার টাকা, ২ বান্ডেল ঢেউটিন ও ৩০ কেজি চাল এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে প্রত্যেক পরিবারকে নগদ ১ হাজার টাকা ও ২০ কেজি করে চাল বিতরণ করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সর্বশেষ ত্রাণ সহায়তা নিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে চলে গেছেন অনেকে আত্মীয় বাড়ি, ভাড়া বাসায় এবং কেউ কেউ পরিত্যক্ত স্থাপনায়। আবার কেউ কেউ ক্ষতিগ্রস্ত ভিটায় ফিরে বাস করছেন বাড়িঘর মেরামত করে। এ ছাড়া যাওয়ার কোথাও উপায় না থাকায় মোনঘর ভাবনা কেন্দ্রে এখনও পড়ে রয়েছেন ৬০ পরিবারের ২১০ জন।

rangamati

জিমনেসিয়াম কেন্দ্রে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়ায় সর্বশেষ অবস্থান নেয়া ১৩ পরিবারের মানুষ বুধবার সকালে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হন বলে জানা গেছে।

ক্ষতিগ্রস্ত সর্বহারা এসব মানুষ আজও দুঃসহ বেদনায় মানবেতর জীবন দিন পার করছেন। আজও নতুন করে ঘর বাঁধতে পারেননি তারা। সরকারের তরফ থেকে পুনর্বাসনের আশ্বাস দেয়া হলেও তা আজও অনিশ্চিত।

শুক্রবার সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, শহরের রূপনগর এলাকার ক্ষতিগ্রস্ত অনেকে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়ার পর মাথাগোঁজার ঠাঁইটুকু করে নিয়েছেন পরিত্যক্ত স্থাপনা এবং আশেপাশের আত্মীয়ের বাড়ি ও ভাড়া বাসায়।

সেখানে পরিত্যক্ত একটি জরাজীর্ণ ভবনে আশ্রয় নিয়েছেন তিনটি পরিবার। তাদের মধ্যে এ প্রতিবেদক কথা বলেন রমিজের স্ত্রী নার্গিস (৩০), চান মিয়ার স্ত্রী খুরশিদা বেগম (৩০) ও কামরুলের স্ত্রী পারভীনের (২৯) সঙ্গে।

এ সময় তারা বলেন, তাদের ভিটাবাড়ি ছিল রূপনগরে। ১৩ জুনের পাহাড়ধসের ঘটনায় মাটির নিচে বিলীন হয়ে সব নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। ঘটনার পর থেকে দীর্ঘ আড়াই মাস ছিলেন আশ্রয়কেন্দ্রে।

আশ্রয়কেন্দ্র বন্ধ করে দেয়ায় চলে আসতে হয়েছে। কিন্তু যাওয়ার তো জায়গা কোথাও নেই এখন। বাসা ভাড়া নেয়ার জন্য হাতে কোনো টাকা পয়সা নেই।

তাই এ ভাঙা ভবনে আশ্রয় নিয়েছি এখন। দুই বান্ডেল করে ঢেউটিন দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিধ্বস্ত ভিটায় নতুন করে ঘর বানানোর সুযোগ নেই। টিনগুলো ফেলে রেখেছি। সরকারের তরফ থেকে পুনর্বাসনের কথা বলা হয়েছে। আমরা এখনও তার অপেক্ষায় দিন গুনছি। আশেপাশের অন্য ক্ষতিগ্রস্তরাও একই দশায়। নতুন ঘর বানাতে পারেননি কেউ।

এদিকে দেখা যায়, সদরের রেডিও সেন্টারের আশেপাশে কেউ কেউ ঝুঁকিপূর্ণ ভিটায় ফিরে বাস করছেন বাড়িঘর মেরামত করে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ত্রাণের ঢেউটিন দিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামত করে বাস করছেন কেউ কেউ। অথচ প্রশাসন থেকে বিধ্বস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ ভিটায় নতুন করে ঘর বানিয়ে বাস করতে নিষেধ করে দেয়া হয়েছে।

কিন্তু নজরদারি না থাকায় অনেকে আবার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গিয়ে বসবাস শুরু করেছেন। তবে এসব ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মেরামত করা একাধিক বাড়িঘর গিয়ে কথা বলার জন্য মালিক কাউকে পাওয়া যায়নি।

সুশীল চাকমা/এএম/জেআইএম