পেট্রলবোমার আতঙ্কে এখনও আঁতকে ওঠেন তারা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ১১:২২ এএম, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
পেট্রলবোমায় দগ্ধ সাইফুল ইসলাম, সাজেদুল ইসলাম সুজন ও জোসনা বেগম

‘বাস চলছিল, আমি সামনের দিকে তাকিয়েছিলাম। হঠাৎ রাস্তার ডান দিক থেকে একটি বোতল উড়ে এসে বাসের পেছনের দিকে ঢোকে। সাথে সাথেই বাসে আগুন লেগে যায়। মুহূর্তেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুরো বাসে। ততক্ষণে কয়েকজনের গায়ে আগুন লেগে গেছে। আমি বড় ভাই ও ভাবিকে নামিয়ে দেয়ার জন্য ধাক্কা দেয়ার পর আর কিছু বলতে পারি না। পরে চোখ খুলে দেখি হাসপাতালে।’

কথাগুলো বলছিলেন ২০১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি বিএনপি-জামায়াতের অনির্দিষ্টকালের ডাকা অবরোধের সময় গাইবান্ধা সদর উপজেলার সাহাপাড়া ইউনিয়নের তুলশীঘাট গ্রামে ঢাকাগামী চলন্ত বাসে পেট্রলবোমা হামলায় আহত গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের উজান বোচাগাড়ী গ্রামের সাইফুল ইসলাম।

সেদিনের ঘটনায় আটজন নিহত এবং ৩২ জন দগ্ধ হন। দগ্ধ এসব ব্যক্তিরা ভুলতে পারেননি সেদিনের ঘটনা। মনে হলে এখনো ভয়ে আঁতকে ওঠেন তারা। সেই হামলার বিচার চান এসব পরিবারের সদস্যরা।

পেট্রলবোমা হামলায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজন ও আগুনে দগ্ধ ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের পাঁচপীর বাজার থেকে ঢাকাগামী নাপু এন্টার প্রাইজের একটি বাস পুলিশ পাহারায় যাওয়ার পথে রাত সাড়ে ১০টার দিকে গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কের তুলশীঘাট গ্রামে বাসটিতে পেট্রলবোমা ছোড়ে দুর্বৃত্তরা। বাসে থাকা ৬০ জন যাত্রীর মধ্যে প্রায় ৪০ জন আগুনে দগ্ধ হন। সুস্থ হলেও এখনো রোদে কোনো কাজ করতে পারেন না এসব দগ্ধ ব্যক্তিরা।

সাইফুল ইসলামের বড় ভাই সাজেদুল ইসলাম সুজন বলেন, আমরা দুইভাই আগে থেকেই ঢাকা ও গাজীপুরে গার্মেন্টেসে কাজ করতাম। পরে আমার স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পথে পেট্রলবোমা হামলার ঘটনা ঘটে। এতে আমরা তিনজন গুরুতর আহত হই। আমি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তিন মাস, ছোটভাই সাইফুল ইসলাম ২০ দিন ও আমার স্ত্রী জোসনা বেগম ২৬ দিন ভর্তি ছিলাম। এখন সুস্থ হলেও রোদে কোনো কাজ করতে পারি না। অল্পতেই মাথা গরম হয়ে যায়। এজন্য সরকারের কাছে আমি ও আমার ভাইয়ের চাকরি চাই।

Gaibandha-Photo-01

পেট্রলবোমায় দগ্ধ তারা মিয়া ও তার মেয়ে তানজিলা

একই গ্রামের মনজুরুল ইসলাম বলেন, আগুনে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার পর এখন আর ঠিকমতো কোনো কাজ করতে পারি না। রোদে বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। মাথা ঝিমঝিম করে। এখন সামান্য ব্যবসা করে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে কষ্ট করে দিন কাটাচ্ছি। একটা চাকরির ব্যবস্থা করলে ভালো হতো।

একই ইউনিয়নের ফারাজিপাড়া গ্রামের দিনমজুর তারা মিয়া বলেন, আমি ঢাকায় দিনমজুরের কাজ করতাম। আমার স্ত্রী অন্যের বাড়িতে কাজ করতো। বড় ছেলে-মেয়ে দুটো গার্মেন্টেসে কাজ করতো। আর ছোট ছেলে-মেয়ে দুটো পড়াশোনা করতো। সেদিন ঢাকায় যেতে পথে পেট্রলবোমা হামলায় আমার স্ত্রী সোনাভান বেগম ও ছোট ছেলে সুজন মিয়া আগুনে পুড়ে মারা যায়। আমি ও আমার ছোট মেয়ে তানজিনা আক্তার আগুনে পুড়ে দগ্ধ হই। এরপর থেকে রোদে কোনো কাজ করতে পারি না। মাথা ঝিমঝিম করে, শরীর ঘেমে যায়। আমাদের জন্য একটা চাকরির ব্যবস্থা করলে ভালো হয়।

চলন্ত বাসে পেট্রলবোমা হামলার এই ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতের ৩২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত ৩০ জনকে আসামি করে মামলা হয়। পরবর্তীতে ৭৭ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শফিকুল ইসলাম শফিক বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন হয়েছে। আগামী ৭ তারিখে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হবে। আশা করি ২০১৮ সালেই মামলাটি নিষ্পত্তি করতে পারব।

তিনি আরও বলেন, নাশকতার এই মামলায় গাইবান্ধা জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি আনিসুজ্জামান খান বাবু, গাইবান্ধা সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান মো. আব্দুল করিমসহ আরও অনেকে আসামি রয়েছেন এই মামলায়। বর্তমানে এই মামলায় উচ্চ আদালত থেকে সবাই আসামি জামিনে রয়েছেন।

রওশন আলম পাপুল/আরএআর/জেআইএম

আপনার মতামত লিখুন :