ভিক্ষা করে মদ খায় দুই বন্ধু

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি নারায়ণগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৭:৪৯ পিএম, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮

ভিক্ষাবৃত্তি নতুন কিছু নয়। সুস্থ কি অসুস্থ হাত পাতলেই টাকা পাওয়া যায়। তাই কর্মক্ষম, অসুস্থদের সঙ্গে হাত পাতেন সুস্থরাও। ফলে অনেক সময় প্রকৃত ভিক্ষুকেরা দান-খয়রাত থেকে বঞ্চিত হন।

চোখের সামনে আহত হয়ে বা হাত-পা কাটা কোনো মানুষ যদি রাস্তায় বসে হাত পাতেন তখন অনেক পথচারী বিষয়টি এড়িয়ে যান না। একটু বেশিই দেয়ার চেষ্টা করেন। মানুষের এই সহানুভূতিকে পূঁজি করে একশ্রেণির প্রতারক হাতিয়ে নিচ্ছেন হাজার হাজার টাকা। নিজের হাত-পা নিজে কেটে রাস্তায় বসছেন কেউ কেউ।

দুঃখজনক হলেও সত্য, দিন শেষে যা আয় হয় তা দিয়ে ওই ভিক্ষুকেরা রাতের আঁধারে হারিয়ে যান নেশার জগতে। এবার এমন দুই প্রতারক ভিক্ষুক ধরা পড়েছেন।

দুলাল ও মোকলেছ নামের দুই ভিক্ষুক বন্ধু। থাকেন নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া রেলস্টেশনে। শহরের ব্যস্ততম পয়েন্ট চাষাঢ়া শহীদ মিনার অথবা সমবায় মার্কেটের সামনের ফুটপাতে ভিক্ষা করেন তারা।

তবে এক স্থানে বেশিদিন নিয়মিত থাকেন না। কারণ একজন মানুষ তো আর প্রতিদিন একজনকে ভিক্ষা দেন না। তাই তারা স্থান পরিবর্তন করেন। এর মধ্যে দুলালের একটি পায়ের মাংস উঠে গর্ত হয়ে গেছে। যে কেউ দেখলে আঁতকে উঠবে। এমন চিত্র দেখে পথচারীরা অন্য আট-দশজন ভিক্ষুকের চেয়ে দুলালকে ৫-১০ টাকা বেশি দেয়।

একই অবস্থা মোকলেছের। অবাক করা বিষয় হলো পায়ের ক্ষত স্থান যাতে শুকিয়ে না যায় এ জন্য একটা মেডিসিন ব্যবহার করেন তারা। কারণ ক্ষত স্থান শুকিয়ে গেলে মানুষ ভিক্ষা দিতে চায় না। এমনটা বলেছেন দুলাল ও মোকলেছ।

জানা গেছে, নিজেরা পা কেটে এমন অবস্থা তৈরি করেছেন। আশ্চর্যজনক হলো ভিক্ষার সময় তারা লাঠিতে ভর করে চলাফেরা করলেও ভিক্ষা শেষে আর লাঠির প্রয়োজন হয় না। দীর্ঘদিন ধরে প্রতারণার মাধ্যমে পথচারীদের কাছ থেকে এভাবেই টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন দুই প্রতারক বন্ধু।

দুলাল বলেন, অসহায় হয়ে এই পথ বেছে নিয়েছি। আমার মা মারা গেছে। আমার কেউ নাই। আমার এক্সিডেন্ট হয়েছিল। সেই থেকে আমার এই অবস্থা। টাকার অভাবে ডাক্তার দেখাতে পারি না। আমার জায়গা-জমি সব লুট হয়েছে। নদীর ওপার বন্দরের লাঙ্গলবদ এলাকায় আমার ১০০ কোটি টাকার সম্পদ লুট হয়ে যায়।

drug1

পুলিশ কিংবা জনপ্রতিনিধিদের কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করেননি কেন এমন প্রশ্নের জবাবে দুলাল বলেন, যেখানেই যাই টেকা লাগে। পুলিশের কাছে গেলেও টেকা লাগে।

মোকলেছও তার বন্ধুর মতো একই কাহিনি শুনালেন। বলেন, আমার কেউ নাই। সব মইরা গেছে। মুন্সিগঞ্জে বাড়ি ছিল আমার। এক্সিডেন্ট হইয়া আমার এই অবস্থা। ঢাকার পঙ্গু হাসপাতালে গেছিলাম। তারা বলছে পায়ের ওপরের মাংস কেটে এখানে লাগাতে হবে। টাকা নাই, টাকা হলে ডাক্তার দেখামু।

কিন্তু পথচারী ও স্থানীয় দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে পাওয়া গেল ভিন্ন তথ্য। একাধিক পথচারী ও দোকানি বলেন, অর্থ উপার্জনের জন্য নিজেরাই নিজেদের পা কেটে রাস্তায় নেমেছেন তারা।

স্থানীয় জুয়েলারি ও কসমেটিক বিক্রেতা সজিব বলেন, এই সড়কে বসা সবগুলো ভিক্ষুককে আমি চিনি। একজনেরও কিছু হয়নি। সবগুলো নিজের পা কেটে এমন করেছে। আর ওই দুইটা হলো সবার গুরু। বহুদিন ধরে ভিক্ষার নামে ব্যবসা করছে। সারারাত ইয়াবা-মদ খায় আর দিনের বেলায় ভিক্ষা করে। নিজের পায়ের ঘা শুকালে আবার নিজেই ঘা বানায়। কয়েকদিন আগে এক মহিলা এসে দুলালরে বলেছিল, আমি ডাক্তার দেখামু। সব খরচ আমার। কিন্তু রাজি হয়নি দুলাল। ওই মহিলাকে দুলাল বলে দেয়, ডাক্তার আমি দেখাইতে পারমু, আপনি পারলে কয়টা টাকা দিয়ে যান। পরে ওই মহিলা টাকা দিয়ে চলে যায়।

স্থানীয় মুদি দোকানি ইলিয়াস আলী বলেন, ওই দুইটা বড় শয়তান। পুলিশও মানে না। পা কাটার পর সেই স্থান কিছুদিনের মধ্যেই শুকিয়ে যায়। আবার নিজেরাই ঘা করে পথে এসে বসে। রাতে নেশা করে অজ্ঞান থাকে। সকালে ভিক্ষা করে। এভাবেই চলছে। পুরাই ভিক্ষার নামে প্রতারণা।

জানা গেছে, পায়ের ঘা না শুকানোর জন্য একটা মেডিসিন ব্যবহার করে তারা। যা ব্যবহারে ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই তাদের ক্ষত স্থান আগের রূপ নেয়। যা দেখিয়ে চলে তাদের প্রতারণা।

narayangonj1

সরেজমিনে দেখা যায়, দুই বন্ধুর প্লেটে ১০ টাকা ৫ টাকার নিচে কোনো নোট নেই। টাকা রাখার জন্য মানিব্যাগ ব্যবহার করে তারা। সেই সঙ্গে আছে টাকা রাখার বাক্স। যে বাক্সে খুচরা টাকা রাখে তারা।

স্থানীয় ফল বিক্রেতা সজিব হোসেন বলেন, সকাল থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত এখানেই বসে তারা। দৈনিক এক হাজারের বেশি উপার্জন হয়। সন্ধ্যায় যাওয়ার আগে আশেপাশের দোকানদার থেকে খুচরা টাকা দিয়ে হাজার, পাঁচশ টাকার নোট বানিয়ে নিয়ে যায়। এরা প্রতিদিন এক জায়গায় বসে না। এক জায়গায় প্রতিদিন দেখলে কি মানুষ টাকা দেবে? দেবে না। বেশিরভাগ সময় সমবায় মার্কেটের সামনের ফুটপাতে বসে। কিছু টাকা চাঁদাও দেয় তারা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুলাল ও মোকলেছের ঠিকানা নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া রেলওয়ে স্টেশন। তবে সেখানে তারা ঠিকমতো থাকে না। স্টেশনে থাকার সুবাদে ছোটখাটো ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক আছে। ফটোকপি মেশিনের দোকান মারজানা ট্রেডার্সের কর্মচারীদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেছে তারা। ভিক্ষা করে এসে সেখানে বসেই চলে তাদের মাদক সেবন।

নারায়ণগঞ্জ রেলওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির এসআই এমদাদুল হক বলেন, আমরা প্রায়ই অভিযান চালাই। পিটাইয়া এসব ভিক্ষুকদের উঠিয়ে দিই। তারপরও বসে। খুব দ্রুত আমরা আবার অভিযানে নামব।

এএম/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :