সবজি চাষে কোটিপতি আমির হোসেন

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি গাইবান্ধা
প্রকাশিত: ০৪:১০ এএম, ০২ জুন ২০১৯

চলতি বছরে ধানের দাম নেই। হতাশায় ধানক্ষেতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে দেশে আলোচনার ঝড় তুলেছেন কৃষকরা। অনেক কৃষক আবার ধানের বস্তা নিয়ে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে মিছিল, মিটিং, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসুচি পালন করছেন।

কিন্তু ধান চাষে নয়, বরং সবজি চাষে কোটিপতি হয়েছেন গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার মুক্তিনগর ইউনিয়নের পুটিমারী গ্রামের কৃষক আমীর হোসেন। ৬ শতাংশ জমিতে সবজি চাষ করে কোটি টাকার ওপরে সম্পদ অর্জন করেছেন তিনি।

সবজি চাষ করে নিজ প্রচেষ্টায় ভাগ্য পরিবর্তনে শূন্য থেকে কোটিপতি হওয়ার সফলতায় বিভিন্ন সময়ে তিনি পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত থেকে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পদক পাওয়ায় আমির হোসেনের বেড়ে যায় কাজের অনুপ্রেরণা। এখন নিজের বসতবাড়ির চারপাশে বর্গাসহ মোট ১৬ বিঘা জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন তিনি।

শুধু সবজি নয়, মালটা চাষেও সফলতার আলো ছড়াচ্ছেন তার বাগান থেকে। ফসল উৎপাদনে বাজারের কোনো রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার করেন না আমির হোসেন। এর পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেন নিজের তৈরি কীটনাশক ও কম্পোস্ট সার ।

southeast

আমির হোসেন যখন ৬ষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র, তখনই তার দিনমজুর পিতা মোজাহার ব্যাপারীর মৃত্যু হয়। ফলে অসহায় দরিদ্র পরিবারের সন্তান আমির হোসেন বাধ্য হয়ে লেখাপড়া ছেড়ে একটি হোটেলে কাজ নেন। কিন্তু তাতেও ভাগ্যের পরিবর্তন হয় না, পেটে জোটে না দুই বেলার খাবার।

ধার-দেনা করে থেকে ৫ হাজার টাকা লোন নিয়ে ১৯৯৬ সালের শেষের দিকে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ৫ শতক জমিতে ১০০টি পেঁপের চারা লাগান আমির হোসেন। ওই জমিতেই সাথী ফসল হিসেবে চাষ করেন আদা। ছয় থেকে সাত মাসের চেষ্টায় পেঁপে ও আদা বিক্রি করে তার আয় হয় ১৫ হাজার টাকা। এভাবে বছর খানেক চলার পর সবজি বিক্রির টাকা জমিয়ে ১ বিঘা জমি কিনে নেন। সেখানেও একই পদ্ধতিতে চাষাবাদ করেন তিনি। অক্লান্ত পরিশ্রম ও মেধা খাটিয়ে চাষে সফল চাষী হিসেবে এভাবেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। প্রতি বছর খরচ বাদে তার আয় হয় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা।

আমির হোসেন জানান, বর্তমানে তিনি দুই বিঘা জমিতে পেঁপে ও সাথী ফসল হিসেবে হলুদ, কলা আড়াই বিঘা, হলুদ ও লেবু ১০ শতক, কচু ১৬ শতক, মরিচ ১৬ শতক, ধান ২ বিঘা, গেন্ডারি আঁখ ১৬ শতক, আদা ২ বিঘা, নেপিয়ার ঘাস ১০ শতক, ৬৩ শতকে কুমড়া ও সাথী ফসল শসা, ১০ শতকে ধনচে, ১৬ শতকে পটল ও সাথী ফসল হিসেবে আদা চাষ করছেন। এছাড়া বৃদ্ধ বয়সে কখনো যদি কৃষি কাজ করতে সমস্যা হয়, সে জন্য তিনি ১ একর জমিতে উন্নত জাতের মালটা চাষ করছেন। আর এর সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে মালটার বাগানে আছে মুখ কচু।

আমির হোসেনের জমিতে প্রতিদিন ২ জন নারী ও ২ জন পুরুষ শ্রমিক মাসিক সাড়ে ৭ হাজার টাকা বেতনে কাজ করেন। এছাড়া তিনি ৫০ শতক জমিতে বসতবাড়ি করে ঘরের চারপাশে বিভিন্ন জাতের ফল ও ঔষধি গাছ লাগিয়েছেন।

আমির হোসেনের স্ত্রী করিমন বেগম একজন আদর্শ গৃহিণী। তাদের এক ছেলে ও দুই মেয়ে। সবার বড় ছেলে আয়নুর রহমান স্নাতক পাসের পর বর্তমানে গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডে কর্মরত। বড় মেয়ে লিপি বেগম এইচএসসি পর্যন্ত পড়ার পর বিয়ে হয়েছে। ছোট মেয়ে আরাফা আক্তার এ বছর বগুড়ায় স্নাতকে অধ্যায়নরত।

southeast

সন্তানদের বড় করতে আমির হোসেনের যে অর্থ প্রয়োজন হয়েছে, তার সবই রোজগার হয়েছে সবজি বিক্রির টাকা থেকেই। এছাড়া তিনি ইরি-বোরো ও আমন ধান চাষ করে অধিক ফসল উৎপাদনেও সাফল্য অর্জন করেছেন।

ফসল উৎপাদনে বিভিন্ন গাছের রস মিশিয়ে নিজেই কীটনাশক উদ্ভাবন করেছেন আমির হোসেন। ১৫ লিটার পানিতে ১৫ ফোঁটা কেরোসিন তেল ও বিষকাঁটালি নামের এক প্রকার গাছের রস মিশিয়ে ক্ষেতে স্প্রে করে পোকা দমন করেন। এই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তিনি সফলও হয়েছেন। এছাড়া রাসায়নিক সারের পরিবর্তে তিনি ব্যবহার করেন কেঁচো, গরুর গোবর, কচুরিপানা। পরিত্যাক্ত জমিতে ধনচে চাষ করে বিশেষ কায়দায় এর চারা জমিতে মিশিয়ে তা থেকে তৈরি করা হয় কম্পোস্ট ও জৈব সার।

সফলতার কথা বর্ণনা করতে গিয়ে আমির হোসেন জানান, অধিক লাভের আশার ধান চাষ করতে গিয়ে কৃষকরা দিন দিন পুঁজি হারাচ্ছে। তাই প্রয়োজনের বেশি ধান চাষ নয়, বরং সবজি চাষেই কৃষকরা দেখতে পারবে সফলতার মুখ।

southeast

সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও ধনারুহা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ফজলুল করিম জাগো নিউজকে জানান, একটি জমিতে একসঙ্গে ৪টি ফসল চাষের সফলতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করায় কৃষক আমির হোসেনের ভাগ্যে মিলেছে বিভিন্ন পুরস্কার। কৃষিক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার। ২০১৭ সালের ১৬ জুলাই ঢাকার ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু জাতীয় কৃষি পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে তার হাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পুরস্কার তুলে দেন। এছাড়া বাংলাদেশ একাডেমি অব এগ্রিকালচার থেকে সম্মাননা ক্রেস্ট এবং জেলা ও উপজেলা কৃষি বিভাগ থেকে বহু সনদ পেয়েছেন। তার কৃষি উৎপাদন চিন্তা মুগ্ধ করেছে বলে জানান এই মুক্তিযোদ্ধা।

মুক্তিনগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আরশাদ আজিজ রোকন জানান, কৃষক আমির হোসেন আমার ইউনিয়নের গর্ব। তার সাক্ষাৎকার নিতে বিভিন্ন গণমাধ্যম কর্মীরা আসায়, এ ইউনিয়নটি ক্রমেই দেশ-বিদেশে পরিচিত হয়েছে ।

সাঘাটা উপজেলা কৃষি অফিসার মাবিনুজ্জামান জানান, নিয়মিত কৃষি বিভাগ থেকে আমির হোসেনকে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হয়। এছাড়া কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করার জন্য বিভাগের বিভিন্ন সভা সমাবেশে দৃষ্টান্ত হিসেবে তাকে উপস্থিত করা হয়।

জাহিদ খন্দকার/এমএসএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]