দলের সদস্য না করায় তৃতীয় লিঙ্গের নেত্রীকে বেধড়ক মারধর

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ
প্রকাশিত: ১০:০৩ পিএম, ২১ মার্চ ২০২১

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলায় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে মহুয়া আক্তার স্বর্ণালী (৩০) নামের তৃতীয় লিঙ্গের এক নেত্রীর গলায় রশি পেঁচিয়ে টেনেহিঁচড়ে নির্যাতন করার অভিযোগ উঠেছে। পরে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে সদর হাসপাতালের ৬ তলায় মহিলা সার্জারি ৬০৪ নম্বরের ৩০ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি।

শনিবার (২০ মার্চ) দিবাগত রাতে তাহিরপুর উপজেলার লাউড়েরগড় হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানার পাশে এই ঘটনাটি ঘটে। এই ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছেন স্বর্ণালীর স্বজনরা।

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্বর্ণালী তাহিরপুর উপজেলার বড়ছড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত হাজি আলী আহমদের সন্তান। তিনি তৃতীয় লিঙ্গের হওয়ায় নিজ ইচ্ছায় পরিবার থেকে আলাদা হয়ে একই উপজেলার লাউড়েরগড় হযরত শাহ আরেফিন (রহ.) আস্তানার পাশে নিজস্ব বাড়ি তৈরি করে বসবাস করে আসছিলেন। একপর্যায়ে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নিয়ে একটি সংগঠনও তৈরি করেন। ওই সংগঠনে সদস্য হতে চেয়েছিলেন স্থানীয় হারিছ উল্লাহ ও অন্যান্যরা। কিন্তু স্বর্ণালী তাদের সংগঠনের সদস্য করেননি। এতে ক্ষুদ্ধ হয় হারিছ উল্লাহ গংরা।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, শনিবার রাতে হারিছ গংরা যাদুকাটা নদী থেকে অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলন করতে কোম্পানী কমান্ডারের কাছে সুপারিশ করতে স্বর্ণালীকে বলেন। স্বর্ণালী এতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এসময় ১০-১৫ জন উত্তেজিত হন স্বর্ণালীর ওপর। একপর্যায়ে মারপিটের পাশাপাশি তার গলায় রশি বেঁধে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে দূরে ফেলে দেন। পরে স্থানীয়রা দৌড়ে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন এবং সুনামগঞ্জে সদর হাসপাতালে নিয়ে আসেন।

স্থানীয়রা আরও জানান, যারা স্বর্ণালীকে মারধর করেছেন তাদের মধ্যে হারিছ উল্লাহ, মনির হোসেন, জমাতুল, ইকবাল, বিল্লাল, হাবিবুর, জলিল, রব মিয়াসহ অনেকেই ভুয়া তৃতীয় লিঙ্গের লোক। গলায় রশি পেঁচিয়ে টেনেহিঁচড়ে মারধর করেছেন ১৫-২০ জন।

সদর হাসপাতালে সরজমিন গিয়ে দেখা যায়, হাসপাতালের বেডে শুয়ে ব্যথায় ছটফট করছেন স্বর্ণালী। তার গলায় রশি পেঁচিয়ে টেনেহিঁচড়ে নেয়ার দাগ দৃশ্যমান রয়েছে। কথা বলতে পারছেন না ঠিকমতো।

স্বর্ণালীর স্বজনরা জানান, তার কোমরে, হাতে এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় মারাত্মক আঘাতের দাগ রয়েছে।

উত্তর বড়দল ইউনিয়নের রামেশ্বরপুর গ্রামের বাসিন্দা নবী নুর জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমিও ছিলাম ঘটনাস্থলে। স্বর্ণালীকে গলায় রশি পেঁচিয়ে বেধড়ক মারপিট করায় আমি প্রতিবাদ করি। এসময় হারিছ উল্লাহ গংরা ক্ষুদ্ধ হয়ে একটি ঘরে তালাবদ্ধ করে আটকে রাখেন আমাকে। পরে স্থানীয়রা গিয়ে আমাকে উদ্ধার করেন।’

তৃতীয় লিঙ্গের মাসুক নামের একজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘হারিছ গংরা শাড়ি, ব্লাউজ ও কানে দুল পরে যাদুকাটা নদী থেকে বালু-পাথর উত্তোলন করেন। এদের প্রায় সবাই ভুয়া হিজরা। অবৈধ বালু-পাথর উত্তোলনে আমরা সবসময় প্রতিবাদ করি। ওইদিনও এসব নিয়ে কথা কাটাকাটি হয়েছে। পরে স্বর্ণালীকে বেধড়ক মারপিট করে তারা।’ একই কথা বলেন সঙ্গে থাকা তৃতীয় লিঙ্গের পারভেজ আহমদও।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য (মেম্বার) মোস্তফা মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ‘হারিছ উল্লাহ, মনির হোসেন, জমাতুল, ইকবাল, বিল্লালসহ আরও কয়েকজন স্বর্ণালীকে বেধড়ক মারধর করেন। তাকে মারধর করার পর আমরা সবাই বসে চিকিৎসার জন্য বলি এবং পরে সালিশে বিষয়টি দেখার জন্য উভয় পক্ষকে বলেছি।’

তাহিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল লতিফ তরফদার জাগো নিউজকে বলেন, ‘ঘটনা শুনার পর পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো অভিযোগ হয়নি। অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

লিপসন আহমেদ/এসআর/এমকেএইচ

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]