গ্রামগঞ্জে আবার দেখা মিলছে ‘হারিয়ে যাওয়া’ ফেরিওয়ালা

এন কে বি নয়ন এন কে বি নয়ন ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৫:০১ পিএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২১

স্ত্রী, দুই সন্তান আর মাকে নিয়ে সংসার রাশেদ আহমেদের (৪০)। তার আয়ের একমাত্র মাধ্যম দুই চাকার বাইসাইকেল। সাইকেলে প্লাস্টিকের ছোট মগ, খাবার ঢাকনা, মসলাদানি, শিশুদের খেলনা, বাঁশি, বালতি, কলমদানি, ছোট গামলা, সাবান কেস, ডিব্বা, ফলঝুড়ি, ছাকনি, টিফিন বক্স, চালুনি, সুজি ছাকনিসহ বাহারি সব পণ্য সাজিয়ে গ্রামে গ্রামে বিক্রি করেন। ২০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করেন এসব পণ্য। ভোরে পণ্য নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। সারাদিনে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয়। এ দিয়েই চলে যাচ্ছে রাশেদ আহমেদের সংসার।

তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কী আর করবো? অন্য ভারী কাজ করতে পারি না। তাই সাইকেলে প্লাস্টিকের তৈরি জিনিসপত্র বিক্রি করি। দিনে যা আয় হয় তা দিয়ে পাঁচজনের আহারের ব্যবস্থা হচ্ছে। আল্লাহর রহমতে ভালোই আছি।’

রাশেদের মতো ফরিদপুরে আরও অনেকে আছেন যারা ফেরি করে পণ্য বিক্রি করে সংসার চালান। মধুখালী উপজেলার মেকচামী এলাকার এমনই এক ফেরিওয়ালা করিম।

তিনি বলেন, সাইকেলে ঘুরে গজ কাপড়, বালিশের কভার, বিছানার চাদর বিক্রি করি। এতে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চলে যায়।

jagonews24

সালথা উপজেলায় গ্রামে গ্রামে হেঁটে ‘লেইস ফিতা, লেইস ফিতা, চুড়ি-খাড়ু-রঙিন সুতা’ বলে হাঁক দিচ্ছিলেন আকিদুল ইসলাম। তার বাড়ি পাশের উপজেলা নগরকান্দায়। আকিদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, সালথা, নগরকান্দা, সদরপুর এলাকার প্রায় ২০-৩০ জন এ পেশায় রয়েছেন। এর মধ্যে কেউ নতুন আবার কেউ অনেক পুরোনো।

ফেরিওয়ালা উসমান শেখ জাগো নিউজকে বলেন, বাড়িতে তার স্ত্রী এবং দুই মেয়ে ও এক ছেলে রয়েছে। সন্তানরা লেখাপড়া করে। তিনি প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০-৬০০ টাকা (কখনো কখনো এক থেকে দেড় হাজার) টাকার পণ্য বিক্রি করেন।

সালথা, বোয়ালমারী, আলফাডাঙ্গা, মধুখালী এলাকার গৃহবধূ মনিতারা, সাদিয়া বেগম, রূপালী জাহান, শিখা মণ্ডল, করুণা বিশ্বাস, স্নেহ বিশ্বাস, মালতি রানী, লাকি দাসসহ অনেকে জানান, এসব ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে তারা ন্যাপথালিন, সেফটিপিন, সুঁই-সুতা, নকশার উপকরণ, সুগন্ধী তেল, চুলের ক্লিপ, সাবানসহ প্রয়োজনীয় গৃহস্থালি বিভিন্ন পণ্য কেনেন।

jagonews24

ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে কেনা পণ্য গুণেমানে ভালো বলেও জানান তারা। গৃহবধূদের ভাষ্যমতে, অনেক সময় বাড়ির কাজকর্ম রেখে বাজারের দোকানপাটে এসব পণ্য কিনতে যাওয়ার সময় তাদের থাকে না। অনেক বাড়ির কর্তাদের এসব জিনিসপত্র কিনে আনতে বললেও তারা আনেন না। তাই ঘরে বসে এসব জিনিসপত্র কেনা তাদের জন্য সুবিধাজনক।

বোয়ালমারী উপজেলার বাসিন্দা ও সাংস্কৃতিক কর্মী সুমন খান জাগো নিউজকে বলেন, ছোটবেলায় এসব ফেরিওয়ালার কাছ থেকে মা-চাচি, খালা-ফুপুদের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য কিনতে দেখেছি। মাঝে এদের একেবারেই দেখা যেতো না। এখন চলার পথে অল্প কয়েকজনকে চোখে পড়ে।

jagonews24

শেখর এলাকার মহিলা মেম্বার নাজমা বেগম বলেন, আগের দিনে প্রতিদিনই ফেরিওয়ালাদের কেউ না কেউ গ্রামে বাড়িতে বাড়িতে আসতো। মাঝে একেবারেই দেখা যেতো না। এখন আবার দেখা যাচ্ছে।

বোয়ালমারী উপজেলার চতুল ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মো. শরীফ সেলিমুজ্জামান বলেন, একসময় হারিয়ে গেলেও এখন আবার গ্রামগুলোতে ফেরিওয়ালাদের দেখা মিলছে। এসব অল্প পুঁজির ফেরিওয়ালাদের টিকিয়ে রাখতে সরকারি-বেসরকারি ক্ষুদ্র ঋণসহ সুযোগ-সুবিধা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বোয়ালমারী উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা প্রকাশ কুমার বিশ্বাস জাগো নিউজকে বলেন, এসব ব্যবসা করতে বেশি পুঁজির দরকার হয় না। তবে কারও লোন কিংবা কোনো প্রকার সাহায্য-সহযোগিতার প্রয়োজন হলে তাদের সহযোগিতা করা হবে।

এন কে বি নয়ন/এসআর/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]