খেজুরের গুড় তৈরি করে ২ লাখ টাকা আয় গাছি রমজেদের

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কুড়িগ্রাম
প্রকাশিত: ০৬:৫১ পিএম, ২৭ নভেম্বর ২০২১

রাজশাহীর বাঘা উপজেলার চন্ডীপুর ইউনিয়নের চন্ডীপুর গ্রামের বাসিন্দা রমজেদ আলী (৬৫)। শীত আসলেই ব্যস্ত হয়ে পড়েন খেজুরের গুড় তৈরিতে। দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে বাপ-দাদার রেখে যাওয়া এ মৌসুমি পেশা ধরে রেখেছেন। তবে ছয় বছর ধরে কুড়িগ্রামে ভাড়ায় নেওয়া খেজুর গাছের রস থেকে গুড় তৈরি করছেন। তার সঙ্গে আছেন আরও কয়েকজন গাছি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছোটবেলায় বাবা মারা গেলে অর্থের অভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি রমজেদ আলী। অভাব অনটনের সংসারে খাদ্যের জোগান দিতেই দিনমজুরের কাজের পাশাপাশি মৌসুমি খেজুরের গুড় তৈরির কাজ শুরু করেন।

প্রথমে নিজস্ব জমিতে বাবার রেখে যাওয়া দেড়শ খেজুরের গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরি করতেন। পরে প্রতি বছর মৌসুম এলেই তিনি নিজ রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকার গাছের মালিকদের সঙ্গে চুক্তিতে খেজুরের রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরির কাজ করেন। ছয় বছর ধরে কুড়িগ্রাম জেলায় এ কার্যক্রম শুরু করেন। কুড়িগ্রামে গাছি সংকট ও স্বল্প মূল্যে খেজুরের রস সংগ্রহ করা যায় বলে তিনি এ জেলাকেই আয়ের উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেন।

jagonews24

প্রতি বছরের আশ্বিন থেকে কার্তিক মাসে তিনি কুড়িগ্রামে এসে গাছের মালিকদের সঙ্গে চুক্তি করেন। এক মৌসুমের রস সংগ্রহের জন্য তিনি প্রতিটি গাছ ১০০ টাকা দরে চুক্তি নেন। টানা চার মাস তিনি খেজুরের রস দিয়ে গুড় তৈরি করে ক্রেতাসহ স্থানীয় বাজারে বিক্রি করে লাভবান হয়ে আসছেন।

গাছি রমজেদ আলী বলেন, আমরা এ মৌসুমে রাজশাহীর বাঘা উপজেলা থেকে চারজনের একটি দল কুড়িগ্রামে এসেছি। দলে আমার ছোট ভাই আমজেদও আছে। আমরা কুড়িগ্রামের বেলগাছা ইউনিয়ন ও টুপামারী দুটি এলাকায় বিভক্ত হয়ে রস সংগ্রহের পর গুড় তৈরির কাজ করছি। বেলগাছা ইউনিয়নের হামিদ চেয়ারম্যানের ১৫০টি খেজুরের গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করছে ছোট ভাই আমজেদ এবং আরেক গাছি। টুপামারী এলাকায় ১০০টি খেজুরের গাছ থেকে রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করছি আমি ও আরেক গাছি আব্দুল কুদ্দুস।

jagonews24

তিনি আরও বলেন, আমরা দুটি এলাকার ২৫০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে প্রতিদিন গড়ে ৪০ কেজি করে গুড় তৈরি করি। এতে প্রতি মৌসুমে ১৪০ মণ গুড় তৈরি করে বিক্রি করতে পারি আমরা। আমাদের তৈরি করা গুড়ের বেশিরভাগই স্থানীয় ক্রেতারা কিনে নেন, যা অবশিষ্ট থাকে তা বাজারে গিয়ে বিক্রি করি। এতে আমাদের গুড় অবিক্রীত থাকে না। প্রতি কেজি গুড় পাইকারি ১৪০ টাকা আর খুচরা ১৫০ টাকা দরে বিক্রি করছি। প্রতি মৌসুমে গাছিদের বেতনসহ আমার আনুষঙ্গিক ব্যয় হয় আনুমানিক তিন লাখ টাকা। আমার ব্যক্তিগত আয় হয় মৌসুমে ২ লাখ টাকা।

আরেক গাছি আব্দুল কুদ্দুস বলেন, আমার বাড়ি রাজশাহীর বাঘা উপজেলার গড়গড়ি এলাকায়। আমি এ মৌসুমে তাদের সঙ্গে নতুন যোগ দিয়েছি। এ পেশায় অনেক পরিশ্রম। কিন্তু অল্প পুঁজিতে বেশি লাভবান হওয়া যায়। আমাদের সারাদিনই এ কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। আশা রাখি ছয় মাসে এ পেশা থেকে সংসারের কিছু উন্নয়ন করতে পারবো।

jagonews24

স্থানীয়রা জানান, রাজশাহী থেকে আসা এ গাছিরা অত্যন্ত পরিশ্রমী। শীত উপেক্ষা করে ভোর থেকেই রস সংগ্রহ করে। এরপর গুড় তৈরির কাজ করেন। বাজারের গুড় ভেজালযুক্ত ও দাম বেশি। তাই এ গাছিদের তৈরি গুড় নির্ভেজাল ও প্রাকৃতিক হওয়ায় স্থানীয়রা প্রতিদিন ভিড় করছেন।

উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের মোল্লারহাট এলাকার গুড় ক্রেতা জিয়াউর রহমান ও আহাদ আলী বলেন, আমরা খেজুরের গুড় কিনতে প্রতি বছর এ গাছিদের কাছে আসি। এদের তৈরি গুড় ভেজালমুক্ত, স্বাদে পরিপূর্ণ এবং বাজারের গুড়ের থেকে অনেক সাশ্রয়ী।

মো. মাসুদ রানা/এসজে/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]