পত্রিকার হকার থেকে জনপ্রতিনিধি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি পাবনা
প্রকাশিত: ০৩:৪৭ পিএম, ৩০ নভেম্বর ২০২১

পাবনার চাটমোহর উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) মেম্বার (সদস্য) নির্বাচিত হয়েছেন জান্নাতুল সরকার চম্পা (৩৫)। রোববার (২৮ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত তৃতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে তিনি উপজেলার পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের ৩, ৪ ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত (২) নারী মেম্বার পদে নির্বাচিত হন। তিনি পেশায় একজন পত্রিকার হকার।

জান্নাতুল মোট দুই হাজার ২৮৫ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। এর আগে পরপর দুইবার ইউপি নির্বাচনে নারী সদস্য হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরেছেন তিনি।

ভোটারদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে চম্পা বলেন, ‘পরপর দুইবার ভোটে হেরে আমি দমে যাইনি। মানুষের মন জয় করার চেষ্টা করেছি। নিজের জীবনের সংগ্রাম দেখেই বুঝেছি একজন নারীর কতো ধরনের সমস্যা। তাই এবারও ভোটে দাঁড়িয়েছি। মানুষ ভালোবেসে আমাকে বিজয়ী করেছেন। আমি অবহেলিত নারীদের নিয়ে কাজ করতে চাই।’

চম্পা উপজেলার পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের মল্লিক বাইন গ্রামের সাবেক ইউপি মেম্বার মৃত ইসাহাক আলী সরকারের মেয়ে। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করে পত্রিকা বিক্রি করা শুরু করেন তিনি। গত আট বছর ধরে সাইকেল চালিয়ে পত্রিকা বিক্রি করছেন।

২০০২ সালে ঈশ্বরদীতে আলহাজ টেক্সটাইল মিলে নিরাপত্তা বিভাগের হাবিলদার হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন চম্পা। চাকরির তিন বছরের মাথায় ২০০৫ সালে উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের কাঁটাখালী গ্রামে তার বিয়ে হয়। কিছুদিন বেশ ভালোই চলছিল দাম্পত্য জীবন। তাই বিয়ের পর চাকরিটা ছেড়ে দেন। পরে একটি বীমা কোম্পানিতে চাকরি নেন চম্পা। তবে বছর না পার হতেই তাদের দাম্পত্য জীবনে বিচ্ছেদ ঘটে। চলে আসেন বাবার বাড়ি।

২০১০ সালে পার্শ্বডাঙ্গা ইউপি নির্বাচনে সংরক্ষিত নারী মেম্বার পদে নির্বাচন করেন চম্পা। তবে মাত্র ৭০ ভোটে হেরে যান তখন। এসময় নির্বাচন করতে গিয়ে অভাবে পড়ে যান। অভাবের তাড়নায় একটি কোম্পানির মাঠ পর্যায়ের মার্কেটিং কর্মী হিসেবে যোগ দেন। চাকরিটা ছিল দোকানে দোকানে গিয়ে সিগারেট বিক্রি করা। তবে একজন মেয়ে হয়ে এভাবে সিগারেট বিক্রি করাটা তার খারাপ লাগতো। তারপরও সংসারের কথা চিন্তা করে চাকরিটা চালিয়ে যান। ২০১১ সালের শেষের দিকে কোম্পানি তাকে সিরাজগঞ্জ জেলায় বদলি করলে তিনি মা-ভাইয়ের কথা চিন্তা করে চাকরিটা ছেড়ে দেন।

jagonews24

জমিজমা যা ছিল বাবা বিক্রি করে গেছেন আগেই। বড় বোনের বিয়ে হয়েছে। বড় ও মেজ ভাই পৃথক। এরই মধ্যে বাবা মারা যান। এরপরই নতুন জীবনযুদ্ধ শুরু হয় চম্পার। রোজগারের কোনো পথ খুঁজে না পেয়ে প্রায় নিরুপায় হয়ে ২০১২ সালে খবরের কাগজের বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজ শুরু করেন চাটমোহর পৌর শহরে। প্রতিদিন ভোর ৬টায় ঘুম থেকে উঠে ৪০ মিনিটের পথ সাইকেল চালিয়ে আসেন পৌর শহরের মির্জা মার্কেটে। পরে এজেন্টের কাছ থেকে পত্রিকা নিয়ে বিক্রি করা শুরু করেন।

চম্পা বলেন, ‘বাড়ি থেকে প্রতিদিন সকালে খাবার নিয়ে আসি। দুপুরে যেকোনো হোটেলে বসে দুপুরের খাবার খেয়ে নেই। সারাদিন বিক্রি ও বিল সংগ্রহ শেষে বিকেল ৪টার দিকে আবার বাড়ি ফিরে আসি।’

অশ্রুসিক্ত নয়নে নবনির্বাচিত এ জনপ্রতিনিধি বলেন, ‘আমি কোনো কাজকে ছোট করে দেখি না। প্রথম দিকে অনেকে আমাকে কটূক্তি করেছে। প্রথম প্রথম খারাপ লাগতো। কিন্তু এখন আর খারাপ লাগে না। কেননা, আমি না খেয়ে থাকলে আমাকে কেউ সাহায্য করবে না। আর আমিতো কারো কাছে হাত পাতছি না। অন্যকিছুও করছি না। কাজ করে খাচ্ছি।’

চাটমোহরের সংবাদপত্র এজেন্ট অজয় পাল জাগো নিউজকে বলেন, ‘চম্পা এবার জীবনযুদ্ধে সফল হয়েছেন। তিনি ইউপি মেম্বার পদে নির্বাচিত হওয়ায় অন্যদের মতো আমিও খুশি।’

পাবনার বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা বেইলি বেগম বলেন, ‘সমাজপতিদের কটূক্তি ও রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে চম্পা আজ একজন স্বাবলম্বী নারী। তিনি দুই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন চেষ্টা থাকলে নারীরাও যেকোনো ক্ষেত্রে সফল হতে পারে।’

আমিন ইসলাম জুয়েল/এসআর/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]