‘হাওরের প্রাণে’ পানির জন্য হাহাকার

লিপসন আহমেদ লিপসন আহমেদ , সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি সুনামগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৮:৪৩ পিএম, ০৭ ডিসেম্বর ২০২১

অডিও শুনুন

তীব্র পানি সংকটে ভুগছেন হাওরের প্রাণ খ্যাত সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী বড়গোপ টিলার বাসিন্দারা। এখানে এক কলস পানি বিক্রি হয় ৩০ টাকায়। আর এক ড্রাম (৩৫ লিটার) পানির জন্য গুনতে হয় দেড়শ টাকা। যাদের টাকা দিয়ে পানি কিনে খাওয়ার সামর্থ্য নেই তাদের ভোগান্তির শেষ নেই। অন্তত পাঁচশ ফুট উঁচু টিলায় ছড়িয়ে থাকা পাথরের এবড়ো-থেবড়ো পথ পাড়ি দিয়ে আনতে হয় পানি।

স্থানীয়রা পাহাড়ি ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করেন। বাসিন্দারা খাবার ও গৃহস্থালি কাজে এ পানি ব্যবহার করেন। শুষ্ক মৌসুমে ঝরনার পানি সরবরাহ কমে যায়। বর্ষায় টিলার এবড়ো-থেবড়ো পথে ওঠানামা আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। টিলার মাটি শুষ্ক আবার পানির ব্যবস্থাও নেই। এজন্য বেশিরভাগ ফসলই জন্মায় না টিলায়।

jagonews24

তাহিরপুর উপজেলার ভারত সীমান্ত সংলগ্ন বড়গোপ টিলায় ৪৩টি পরিবারের বসবাস। টিলার পূর্বপাশে যাদুকাটা নদী। তবুও পানির জন্য বছরজুড়ে হাহাকার চলে টিলায়। কয়েক যুগ ধরে এ অবস্থা চললেও পানি সমস্যা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৪২ সালে বড়গোপ টিলায় ১৩টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী পরিবারের বসবাস ছিল। বর্তমানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ৩৩টি ও বাঙালি ১০টি পরিবারের বসবাস এখানে। ২০০৮ সালে বড়গোপ টিলায় একটি নলকূপ স্থাপন করলেও প্রথম থেকেই এটি অকেজো। বড়গোপ টিলা সংলগ্ন ভারত সীমান্তের মেঘালয় পাহাড়ের বাসিন্দাদের জন্য বৈদ্যুতিক মোটরের সাহায্যে পানির ব্যবস্থা করেছে ওই রাজ্যের সরকার। কিন্তু মেঘালয় ঘেঁষে বাংলাদেশ সীমান্তে অবস্থিত বড়গোপ টিলার বাসিন্দারা আজও পাননি পানির সুবিধা।

jagonews24

সরজমিন বড়গোপ টিলায় গিয়ে দেখা যায়, পানির জন্য সেখানে হাহাকার চলছে। পুরুষ থেকে শুরু করে নারীরা ছুটছেন পানির সন্ধানে। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা ও উঁচুনিচু পথে পানি নিয়ে উঠতে হচ্ছে অনেক কষ্ট করে। তবে যাদের বাড়িতে মোটর লাগানো আছে তারা এক কলসি পানি বিক্রি করছেন ৩০ টাকায়। পুরো টিলায় এক টুকরো শাকসবজির বাগান নেই। গোসল কিংবা কাপড় ধুতে হয় সপ্তাহে একদিন, তাও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে।

বড়গোপ টিলার বাসিন্দা মমতা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, ‘স্বামী দিনমজুরি করেন। পানি কিনে খাওয়ার মতো টাকা আমাদের নেই। তাই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পানিভর্তি দুই কলস নিয়ে টিলা বেয়ে ওপরে উঠি।’

jagonews24

টিলার বাসিন্দা মহিমা আজিম বলেন, ১৯৪২ সাল থেকে এ টিলায় বসবাস করছি। ২০০৮ সালে রোমান ক্যাথলিক চার্চে একটি নলকূপ স্থাপন করা হলেও পানি না আসায় প্রথম থেকেই এটি অকেজো হয়ে আছে।

পানি সংকটের কারণে টিলায় শাকসবজিসহ কোনো রকমের চাষাবাদ হয় না বলে জানালেন মনিরা আজিম। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক।

মনিরা আজিম জাগো নিউজকে বলেন, ‘দিন দিন বড়গোপ টিলায় যেমন জনসংখ্যা বাড়ছে তেমনি পানির জন্য হাহাকারও বাড়ছে। অনেক সময় এতদূর থেকে পানি আনা সম্ভব হয় না। ফলে সেদিন এক কলস পানি ৩০ টাকা আর ৩৫ লিটারের এক ড্রাম পানি দেড়শ টাকা দিয়ে কিনে আনতে হয়।’

jagonews24

টিলার বাসিন্দা রীতি বনোয়ারী জাগো নিউজকে বলেন, বর্ষায় পানি নিয়ে টিলায় ওঠানামা আরও কষ্টকর হয়ে পড়ে। হেমন্তে ঝরনার পানি অনেক কমে যায়। তারপরও অনেক কষ্টে যে পানি পাওয়া যায় তা ছেঁকে নিয়ে ব্যবহার করতে হয়।

ক্ষোভ প্রকাশ করে রহমত মিয়া নামের একজন জাগো নিউজকে বলেন, ‘বড়গোপ টিলায় জন্ম নেওয়াটা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় পাপ। জন্মের পর থেকে আমরা পানির জন্য কষ্ট করছি। আমরা কি বাংলাদেশের নাগরিক না? আমরা কি সরকারের সুযোগ-সুবিধা পেতে পারি না? প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি জানাই আমাদের পানির কষ্ট থেকে মুক্ত করুন।’

jagonews24

টিলার বাসিন্দা জাকির মিয়া জাগো নিউজকে বলেন, ৫০০ ফুট উচুুঁ টিলায় ওঠানামা করে পানি সংগ্রহ আমাদের জন্য অনেক কষ্টকর। পানির যে কত মূল্য সেটা আমরা বুঝতে পারছি।

jagonews24

এ বিষয়ে সুনামগঞ্জ জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর নির্বাহী কর্মকর্তা আবুল কাশেম জাগো নিউজকে বলেন, ‘আসলে পাহাড়ি এলাকায় গভীর নলকূপ স্থাপন করা যায় না। তারপরও পাহাড়ি এলাকার পাদদেশে আমরা কিছু টিউবওয়েল স্থাপন করেছি। তবে বড়গোপ টিলায় পানির যে সমস্যা দেখা দিয়েছে সে সদস্যা নিরসনে আমরা খুব দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবো।

লিপসন আহমেদ/এসআর/এএসএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]