দেশভাগের আগেই ভাষা সংগ্রামের বীজ রোপিত হয় যশোরে
যশোরে ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপিত হয় দেশভাগের আগেই। ইতিহাস সাক্ষ্য দিলেও কালের গহ্বরে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই আন্দোলনমুখর ঘটনাপ্রবাহ। ভাষা আন্দোলন নিয়ে একাধিক গবেষকের গবেষণায় সেই ইতিহাস উঠে এসেছে।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৪৭ সালের ৩ জুন বৃটিশ সরকারের পক্ষে মাউন্ট ব্যাটেন ঘোষণা করেন ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ সালের মধ্যে তারা ভারতের শাসনভার ত্যাগ করবেন। ১৪ আগস্ট নতুন রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হলো। যার একাংশ পূর্ব পাকিস্তান আরেক অংশ পশ্চিম পাকিস্তান। এই পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভাষা বাংলা।
যশোরের ভাষা আন্দোলনের গবেষক কবি সাইদ হাফিজ বলেন, ভাষা আন্দোলনের শুরুর দিকে ঢাকার আগে যশোরে প্রথম আন্দোলন গড়ে ওঠে। ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে ‘দৈনিক আজাদ’ পত্রিকায় বাংলা ভাষাবিরোধী একটি লেখার প্রতিবাদে মাইকেল মধুসূদন (এম.এম.) কলেজের ছাত্র ফেডারেশনের কর্মী হামিদা রহমান একটি পত্র লেখেন।
১০ জুলাই ‘পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ শিরোনামে কলকাতা থেকে প্রকাশিত ‘স্বাধীনতা’ পত্রিকায় লেখাটি প্রকাশিত হয়। এর মধ্য দিয়েই যশোরে ভাষা আন্দোলনের বীজ রোপিত হয়। তখনও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়নি।
‘যশোরের ভাষা আন্দোলন’ গ্রন্থে প্রয়াত কবি ও খ্যাতিমান সাংবাদিক ফখরে আলমও এই তথ্য উল্লেখ করে লিখেছেন, বিচারপতি কেএম সোবহান ১৯৮৮ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ‘সংবাদে’ প্রকাশিত ‘একুশের চিন্তা’ প্রবন্ধে হামিদা রহমানের এই চিঠি সম্পর্কে লিখেছেন ‘ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত বলা যায় এখান থেকেই’।
১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি যশোর মাইকেল মধুসূদন কলেজের (এম.এম. কলেজের পুরাতন হোস্টেল) এলভি মিত্র হলে সভা করে ঢাকার ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’এর মতো যশোরে একটি সংগঠন গড়ে তোলা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২ মার্চ এম.এম. কলেজে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। ৭ মার্চ পুনরায় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ১১ মার্চ’র কেন্দ্রীয় ছাত্র ধর্মঘটের সমর্থনে যশোরে ৮ ও ৯ মার্চ মিছিল মিটিং অনুষ্ঠিত হয়।
১০ মার্চ জেলা প্রশাসক শহরে ১৪৪ ধারা জারি করেন। ছাত্র নেতৃবৃন্দ কলেজে জরুরি বৈঠক করে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ ও মিছিল মিটিং করার আহ্বান জানান। ১১ মার্চ শহরে মিছিল ও ধর্মঘট পালিত হয়। সেই দিনই পুলিশ ৩৪ জন নেতাকে গ্রেফতার করে।
‘যশোরের ভাষা আন্দোলন’ গ্রন্থে কবি সাংবাদিক ফখরে আলম লিখেছেন, ১১ মার্চ বেশিরভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ক্লাস বর্জন করে রাজপথে নেমে আসে। কিন্তু পিটিআই, যশোর জিলা স্কুল ও মোমিন গার্লস স্কুলের শিক্ষার্থীরা ছাত্র ধর্মঘটে অংশগ্রহণ করতে চাইলেও স্কুল কর্তৃপক্ষ ও সরকারি কর্মকর্তাদের সন্তানরা বাধা দেয়। এতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা আরো বেশি ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। সকালে মাইকেল মধুসূদন কলেজ থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। এক পর্যায়ে মিছিলটি মোমিন গার্লস স্কুলে আসে। মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন আলমগীর সিদ্দিকী, আফসার আহম্মেদ সিদ্দিকী, সৈয়দ আফজাল হোসেন, হামিদা রহমান।
মোমিন গার্লস স্কুলে লেখাপড়া করতো ডিস্ট্রিক ম্যাজিস্ট্রেট ইএ নোমনীর মেয়ে। সে শিক্ষার্থীদের ধর্মঘটে যোগ দিতে বাধা দিয়েছিল। হামিদা রহমান বীরদর্পে স্কুলে ঢুকে নোমানীর মেয়েকে সিঁড়ির ওপর থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দেন। তার ঠোঁট কেটে রক্ত ঝরে পড়ে। এমনকি একটি দাঁতও ভেঙে যায়। এ ঘটনায় স্কুলের মেয়েরা করতালি বাজিয়ে মিছিলে স্বতঃস্ফুর্তভাবে অংশ নেয়। এরপর মিছিল ষষ্ঠীতলা পাড়ার পিটিআই স্কুলে এসে পৌঁছায়।
এখানকার প্রধান শিক্ষক বাধা দিলেও সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্লাস বাদ দিয়ে মিছিলে অংশ নেয়। যশোর জিলা স্কুলের ছাত্ররাও একইভাবে মিছিলে যোগ দেয়। এক্ষেত্রে ওই স্কুলের কয়েকজন শিক্ষার্থী খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
জিলা স্কুল থেকে মিছিল উকিল বারের সামনে আসার সঙ্গে সঙ্গে আইনজীবীরা রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই বলে স্লোগান দিতে থাকেন। আওয়ামী লীগ নেতা তরুণ আইনজীবী মসিয়ূর রহমান উকিল বার থেকে মিছিলে এসে যোগ দেন। এক মাইল দীর্ঘ এই মিছিলটি যশোরের একটি ঐতিহাসিক মিছিলে পরিণত হয়। মিছিলটি ট্রেডিং ব্যাংক (বর্তমান টিঅ্যান্ডটি অফিস) মাঠে এসে শেষ হয়। মিছিল শেষে এই মাঠে অনুষ্ঠিত হয় ছাত্র-জনতার এক বিরাট সমাবেশ।
অ্যাডভোকেট মসিয়ূর রহমানের সভাপতিত্বে এই সমাবেশ বক্তব্য রাখেন আলমগীর সিদ্দিকী, হামিদা রহমান, রঞ্জিত মিত্র, সৈয়দ আফজাল হোসেন, এসএমএইচ জিন্নাহ। নেতৃবৃন্দ বাংলা ভাষার স্বীকৃতির জন্য আন্দোলন অব্যাহত রাখার শপথ নেন।
মিলন রহমান/এফএ/জেআইএম