পদ্মা সেতুর সুফল পেতে শুরু করেছে বাগেরহাটবাসী

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বাগেরহাট
প্রকাশিত: ০৬:১৭ পিএম, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২

পদ্মা সেতু চালুর আগে থেকেই জেলার পর্যটন শিল্পকে ঘিরে নানা স্বপ্ন ও আশার আলো দেখছিলেন বাগেরহাটবাসী। সেই স্বপ্ন এখন অনেকটাই বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করছে। এরই মধ্যে পদ্মা সেতুর সুফল পেতে শুরু করেছেন বাগেরহাটের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িতরা। জেলার পর্যটন শিল্পের অপার সম্ভাবনাকে ঘিরে নেওয়া হয়েছে সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগ।

বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যের মধ্যে দুটিই বাগেরহাটে অবস্থিত। এর মধ্যে একটি হলো ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং অপরটি বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। এ দুটি ছাড়াও বাগেরহাটে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। ভ্রমনপিপাসুদের অন্যতম আগ্রহের জেলা বাগেরহাট। কিন্তু অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নানাবিধ প্রতিকূলতার কারণে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীদের সেখানে যেতে অনেক ভোগান্তিতে পড়তে হতো। তবে সম্প্রতি পদ্মা সেতু চালুর পর থেকে এই প্রতিকূলতা কাটতে শুরু করেছে। সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে উন্নতমানের হোটেল-মোটেল চালু হচ্ছে। অনেকেই নতুন করে সাজাচ্ছেন ব্যবসা-বাণিজ্য। সব মিলিয়ে পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই নতুন আশার আলো দেখছেন বাগেরহাটের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা।

পর্যটন শিল্পের সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাগেরহাটে প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য যাতায়াতের প্রধান ব্যবস্থা হচ্ছে সড়কপথ। আর এই সড়কপথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় যাতায়াতে মাওয়া ঘাটে যানজট, প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকাসহ নানা বিড়ম্বনায় পড়তে হতো। তবে পদ্মা সেতু চালুর মধ্য দিয়ে সেই চিত্র পাল্টাতে শুরু করেছে। ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে দক্ষিণের জেলা বাগেরহাটের পর্যটন শিল্পসহ বিভিন্ন পেশার ব্যবসায়ীরা।

পদ্মা সেতুর সুফল পেতে শুরু করেছে বাগেরহাটবাসী

তারা আরও বলছেন, পদ্মা সেতু চালুর ফলে সুন্দরবনের বিভিন্ন পয়েন্টের অবকাঠামো ও যাতায়াত ব্যবস্থা দিনদিন উন্নতি হচ্ছে। বাগেরহাটে আগের চেয়ে কয়েকগুণ দর্শনার্থী বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তসহ অনেক প্রবাসী দর্শনার্থীরাও সুন্দরবন, ষাটগম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলী মাজারসহ বাগেরহাটের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ঘুরতে আসছেন।

এ বিষয়ে ষাটগম্বুজ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আক্তারুজ্জামান বাচ্চু বলেন, পদ্মা সেতু চালু হওয়ায় বাগেরহাটসহ গোটা দক্ষিণাঞ্চলে সমৃদ্ধি ফিরতে শুরু করছে। পদ্মা সেতুকে ঘিরে বিশ্ব ঐতিহ্য ষাটগম্বুজ মসজিদ, খান জাহান আলী মাজার, সুন্দরবনকে ঘিরে পর্যটন শিল্পে যে অপার সম্ভাবনা তা ফিরতে শুরু করছে।

পদ্মা সেতুর সুফল পেতে শুরু করেছে বাগেরহাটবাসী

তিনি আরও বলেন,পদ্মা সেতুকে ঘিরে শুধু সুন্দরবন ও ষাটগম্বুজ মসজিদ নয় মোংলা বন্দরেরও ব্যাপক উন্নয়ন শুরু হয়েছে। ফলে দেশের মানুষের অর্থনৈতিক উন্নয়নের পাশাপাশি এই অঞ্চলের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে অনেক লাভবান হচ্ছে।

খানজাহান আলী (র.) মাজার এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী মো. কামরুজ্জামান বলেন, যাতায়াতের ভোগান্তির কারণে এতদিন বাগেরহাটে পর্যটকদের আনাগোনা কম ছিল। ফলে হোটেল ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হতেন। পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই পর্যটকদের আনাগোনা বাড়তে শুরু করছে বাগেরহাটে। নতুন নতুন হোটেল-মোটেল তৈরি হচ্ছে ও অনেক তরুণরা ব্যবসায় উৎসাহিত হচ্ছেন।

পদ্মা সেতুর সুফল পেতে শুরু করেছে বাগেরহাটবাসী

বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. বেলায়েত হোসেন বলেন, সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জের দুটি বাগেরহাট জেলায়। শরণখোলা ও চাঁদপাই। এখানে পর্যটকদের আকর্ষণের শেষ নেই। পদ্মা সেতু খুলে দেওয়ার পর স্বাভাবিকভাবেই চাপ বাড়ছে বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবনে। এ কারণে পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও পশ্চিম সুন্দরবনে তৈরি করা হচ্ছে চারটি নতুন পর্যটন স্পট। নতুন এ পর্যটন স্পটগুলোতে দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সুন্দরবনের রূপ-বৈচিত্র্য উপভোগ করতে পারবেন।

তিনি আরও বলেন, পর্যটন শিল্পের বিকাশের পূর্ব শর্ত হচ্ছে উন্নত ও সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় সুন্দরবনে দর্শনার্থীদের আগমন কম ছিল। তবে পদ্মা সেতু চালুর পর থেকেই এ সমস্যা কাটতে শুরু করছে। এখন দেশি-বিদেশি পর্যটকরা সহজে সুন্দরবনে আসতে পারবেন। এ কারণ পর্যটকদের চাপ সামাল দিতে সুন্দরবনে চারটি নতুন ট্যুরিস্ট স্পট তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া বর্তমানে যে ট্যুরিস্ট স্পটগুলো রয়েছে সে গুলোতে ওয়াচ টাওয়ার, ফুট ট্রেইলার, গোল ঘর ও পাবলিক টয়লেটসহ অবকাঠামোগত নানা উন্নয়নের কাজ চলছে।

পদ্মা সেতুর সুফল পেতে শুরু করেছে বাগেরহাটবাসী

বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, কেবলমাত্র ষাটগম্বুজ মসজিদ বা সুন্দরবন নয়, বাগেরহাটে দেখার মতো অসংখ্য স্থাপনা রয়েছে। ইউনেস্কো বাগেরহাটকে মসজিদের শহর ঘোষণা করেছে। দীর্ঘদিন যোগাযোগ বিড়ম্বনার কারণে বাগেরহাট ভ্রমণে দর্শনার্থীদের আগ্রহ কিছুটা কম ছিল। এখন পদ্মা সেতু সেই সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে দিয়েছে। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাগেরহাটকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এরই মধ্যে পর্যটন করপোরেশনের অর্থায়নে ১২ কোটি ৭৭ লাখ ৬ হাজার টাকা ব্যয়ে একটি তিন তারকা মানের হোটেল নির্মাণের কাজ প্রায় ৮০ ভাগ শেষ হয়েছে। ষাটগম্বুজ মসজিদের সামনে বিশ্রামাগার নির্মাণ, মসজিদ সংলগ্ন ঘোড়াদিঘীকে নান্দনিক করতে ওয়াকওয়ে তৈরি করা-সহ নানা কাজ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক আরও বলেন, ১০০ জনকে ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া, ব্যক্তি উদ্যোগে দৃষ্টিনন্দন হোটেল-মোটেলসহ পর্যটন শিল্পের নানা স্থাপনা তৈরিতে অনেকে আগ্রহী হচ্ছেন। ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। ফলে এখানকার মানুষের জীবন-জীবিকার মান দিন দিন আরও উন্নত হবে। এজন্য বাগেরহাটের ঐতিহ্য দেশি-বিদেশি মানুষের কাছে আরও পরিচিত করতে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

এমআরআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।