ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কায় বাগেরহাটের যৌনপল্লির নারীরা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি বাগেরহাট
প্রকাশিত: ০৯:১৮ পিএম, ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩

‘আমার বয়স যখন ১৫ বছর তখন এখানে আসি। সেই থেকে এখানে পড়ে আছি। অনেকবার ভেবেছি এখান থেকে চলে যাবো কিন্তু কোথায় যাবো? যাওয়ার মতো কোনো জায়গা নেই আমার। এখন বয়স হয়েছে, আয়-ইনকাম নেই। আমার জীবন চলবে কীভাবে?’

হতাশার সুরে এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন বাগেরহাট শহরের ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডের কর্মকারপট্টিতে অবস্থিত জেলার একমাত্র যৌনপল্লির বাসিন্দা চামেলি আক্তার (ছদ্মনাম)। শুধু তিনি নন, তার মতো অন্তত ২০ যৌনকর্মী তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। এদের সবারই বয়স পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে।

আর্থিক টানাপড়েন, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, নিম্নমানের স্যানিটেশন ব্যবস্থা, চিকিৎসার অভাব, কর্ম না থাকা, সরকারি সহযোগিতার অভাব, পুনর্বাসনসহ নানা সমস্যার মধ্যে জীবন অতিবাহিত করছেন এখানকার যৌনকর্মীরা।

চামেলি আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, ‘এখন প্রায়ই অসুস্থ থাকি কিন্তু চিকিৎসা করানোর টাকা নেই। সপ্তাহে একদিন পরিবার পরিকল্পনা থেকে ফ্রি চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। তবে সেজন্যও ১০ টাকা করে দিতে হয়।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কমারপট্টির এ যৌনপল্লিতে বসবাসরত ৩৮ যৌনকর্মী মধ্যে পঞ্চাষোর্ধ রয়েছেন অন্তত ২০ জন। এদের মধ্যে কিছুসংখ্যক বয়স্ক ভাতা পেলেও বিধবাসহ কোনো ভাতাই পান না। সরকারি তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধাও মেলে না।

যৌনকর্মী শিউলি (ছদ্মনাম) বলেন, ‘এখানকার পরিবেশ খুব খারাপ। বিশেষ করে ড্রেনেজ সিস্টেম যাচ্ছেতাই। বৃষ্টির সময় এখানে হাঁটু পর্যন্ত পানি উঠে যায়। এমনকী ঘরের মধ্যেও পানি উঠে যায় কখনো কখনো। বারবার বলেও কোনো কাজ হয়নি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সন্তানদের বাবার পরিচয় গোপন করে স্কুলে ভর্তি করানো হয়। যখন জেনে যায় যে তার মা একজন যৌনকর্মী তখন স্কুল থেকে বের করে দেয়। এজন্য আমাদের ছেলেমেয়েরা লেখাপড়াও করতে পারছে না।’

সরকারিভাবে যে সাহায্য-সহযোগিতা আসে তা খুবই অপ্রতুল বলে জানালেন যৌনকর্মী ছন্দা। এখানকার স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। অনেকটা হতাশ হয়ে ছন্দা বলেন, ‘আমাদের জীবন টিস্যু পেপারের মতো, ব্যবহারের পর ফেলে দেয়। এ জীবন আর ভালো লাগে না। আমাদের জন্য কারও দয়া-ভালোবাসা নেই। অথচ আমরাও তো মানষ।’

এখানকার যৌনকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা যা আয় করেন তা তাদের প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। যা আয় হয় তা দিয়ে নিজে চলতে ও পরিবারকে পাঠাতে অনেক কষ্ট হয়। বড় কোনো সমস্যা হলে কেউ তাদের পাশে থাকেন না। অসুখ হলে লোন করে, সুদে টাকা নিয়ে চিকিৎসা করতে হয়।

বাগেরহাট যৌনকর্মীদের সংগঠন ‘জীবনের অধিকার সংঘ’। এর সভানেত্রী নাসরিন আক্তার জাগো নিউজকে বলেন, সন্ধ্যার পর কোনো কাস্টমার আসা এক প্রকার বন্ধ। অথচ কাস্টমার মূলত বেশি হয় রাতের বেলায়। এজন্য আগের তুলনায় কাস্টমার অনেক কমে গেছে। আগে ২৪ ঘণ্টায় কাজ করা যেতো। এখানে যাতে ২৪ ঘণ্টা স্বাধীনভাবে কাজ করা যায় সে দাবি জানান তিনি।

বাগেরহাট পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার তালুকদার আব্দুল বাকী বলেন, বাগেরহাটের যৌনপল্লিটি দীর্ঘদিন ধরে এখানে আছে। তবে আমরা সরকার থেকে যতটুকু সহযোগিতা পাই তা দেওয়ার চেষ্টা করি।

যৌনকর্মীদের পুনর্বাসনের বিষয় জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এজন্য আমরা চেষ্টা করছি। তবে শুধু পুনর্বাসন করলে হবে না তাদের স্থায়ী ইনকামের সুযোগ করে দিতে হবে। যাতে পুনরায় এ ধরনের নেতিবাচক কাজ করা না লাগে।’

এ বিষয়ে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান রিজিয়া পারভিন বলেন, আমরা এরই মধ্যে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে তাদের বিকল্প কর্মসংস্থানের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেছি। বয়স্ক নারী এবং যারা ভূমিহীন তাদের তালিকা করে ঘর দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান।

এসআর/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।